ঢাকা ০৮:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

কিশোরগঞ্জে পানি বৃদ্ধি: ৯ হাজার হেক্টর ধান তলিয়ে দিশেহারা ৩০ হাজার কৃষক

Live News Bangla71
  • আপডেট সময় : ০৩:০৩:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ মে ২০২৬ ৪৪ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে তলিয়ে গেছে প্রায় ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমির পাকা ও আধা-পাকা বোরো ধান। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন জেলার অন্তত ৩০ হাজার কৃষক।

শনিবার (০২ মে) সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এরই মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে একদিকে যেমন নদী ও হাওরের পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যদিকে ধান শুকাতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষকরা। পাশাপাশি বৃষ্টির মধ্যেই ধান কেটে ঘরে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কৃষকরা। বছরের একমাত্র ফসল চোখের সামনে তলিয়ে যেতে দেখে কৃষকদের মাঝে এখন হাহাকার বিরাজ করছে।

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দেওয়া তথ্যমতে, জেলার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পানির উচ্চতা বেড়েছে এর মধ্যে ইটনা পয়েন্ট ধনু-বৌলাই নদীর পানি ৫ সেন্টিমিটার বেড়ে বর্তমানে ৩.০৬ মিটারে অবস্থান করছে, চামড়াঘাট পয়েন্ট মেঘনা নদীর পানি ১০ সেন্টিমিটার বেড়ে ২.৭৩ মিটারে দাঁড়িয়েছে, অষ্টগ্রাম পয়েন্ট কালনী নদীর পানি ১৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ২.৪৫ মিটারে পৌঁছেছে। তবে এর ব্যতিক্রম দেখা গেছে ভৈরব বাজার পয়েন্টে। সেখানে মেঘনা নদীর পানি ৭ সেন্টিমিটার কমে ১.৮০ মিটারে অবস্থান করছে।

পাউবো জানিয়েছে, নদীগুলোর পানি এখনও বিপৎসীমার ১০৯ থেকে ৪০০ সেন্টিমিটার নিচে থাকলেও ঢল অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায়। মাঠের পর মাঠ কাঁচা ও আধা-পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের চোখে-মুখে এখন শুধু হাহাকার।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে কেবল হাওড়ের তিনটি উপজেলাতেই (ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম) আবাদ হয়েছে ১ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে। চলতি বছর জেলায় প্রায় ১১ লাখ মেট্রিক টন বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৫৮ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ধনু, ঘোড়াউত্রা ও কালনীসহ প্রধান নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়ায় নিচু এলাকার জমিগুলো প্লাবিত হচ্ছে। ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায় ক্ষতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। বৃষ্টির কারণে একদিকে যেমন ধান কাটতে শ্রমিকের সংকট দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে কাটা ধান শুকানোর জায়গা (খলা) না থাকায় ধানে পচন ধরার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নিকলী উপজেলার কৃষক রহমত আলী আক্ষেপ করে বলেন, “কোমর সমান পানির নিচে ডুবে ধান কাটছি, কিন্তু রোদ না থাকায় ধান শুকাতে পারছি না। সব তো পচে যাবে।”

মিঠামইন এলাকার কিষাণী মরিয়ম বেগম জানান, বৃষ্টির কারণে ধান সেদ্ধ বা শুকানোর কোনো উপায় নেই, এমনকি ঘরে পানি ওঠায় চুলা জ্বালাতেও সমস্যা হচ্ছে।

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষকদের সতর্ক করা হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, “ইটনা ও অষ্টগ্রামে ক্ষতির পরিমাণ বেশি। আমরা কৃষকদের দ্রুত ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছি। বৃষ্টিপাত না বাড়লে বড় ধরনের ক্ষতির শঙ্কা কমে আসতে পারে।”

উল্লেখ্য, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একটি বড় অংশই এনজিও ঋণ ও বর্গা চাষের ওপর নির্ভরশীল। ফসল হারিয়ে এখন ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এই প্রান্তিক পরিবারগুলো।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

কিশোরগঞ্জে পানি বৃদ্ধি: ৯ হাজার হেক্টর ধান তলিয়ে দিশেহারা ৩০ হাজার কৃষক

আপডেট সময় : ০৩:০৩:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ মে ২০২৬

টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে তলিয়ে গেছে প্রায় ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমির পাকা ও আধা-পাকা বোরো ধান। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন জেলার অন্তত ৩০ হাজার কৃষক।

শনিবার (০২ মে) সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এরই মধ্যে প্রায় ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে একদিকে যেমন নদী ও হাওরের পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যদিকে ধান শুকাতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষকরা। পাশাপাশি বৃষ্টির মধ্যেই ধান কেটে ঘরে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন কৃষকরা। বছরের একমাত্র ফসল চোখের সামনে তলিয়ে যেতে দেখে কৃষকদের মাঝে এখন হাহাকার বিরাজ করছে।

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দেওয়া তথ্যমতে, জেলার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পানির উচ্চতা বেড়েছে এর মধ্যে ইটনা পয়েন্ট ধনু-বৌলাই নদীর পানি ৫ সেন্টিমিটার বেড়ে বর্তমানে ৩.০৬ মিটারে অবস্থান করছে, চামড়াঘাট পয়েন্ট মেঘনা নদীর পানি ১০ সেন্টিমিটার বেড়ে ২.৭৩ মিটারে দাঁড়িয়েছে, অষ্টগ্রাম পয়েন্ট কালনী নদীর পানি ১৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ২.৪৫ মিটারে পৌঁছেছে। তবে এর ব্যতিক্রম দেখা গেছে ভৈরব বাজার পয়েন্টে। সেখানে মেঘনা নদীর পানি ৭ সেন্টিমিটার কমে ১.৮০ মিটারে অবস্থান করছে।

পাউবো জানিয়েছে, নদীগুলোর পানি এখনও বিপৎসীমার ১০৯ থেকে ৪০০ সেন্টিমিটার নিচে থাকলেও ঢল অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায়। মাঠের পর মাঠ কাঁচা ও আধা-পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের চোখে-মুখে এখন শুধু হাহাকার।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৬২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে কেবল হাওড়ের তিনটি উপজেলাতেই (ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম) আবাদ হয়েছে ১ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে। চলতি বছর জেলায় প্রায় ১১ লাখ মেট্রিক টন বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৫৮ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ধনু, ঘোড়াউত্রা ও কালনীসহ প্রধান নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়ায় নিচু এলাকার জমিগুলো প্লাবিত হচ্ছে। ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলায় ক্ষতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। বৃষ্টির কারণে একদিকে যেমন ধান কাটতে শ্রমিকের সংকট দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে কাটা ধান শুকানোর জায়গা (খলা) না থাকায় ধানে পচন ধরার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নিকলী উপজেলার কৃষক রহমত আলী আক্ষেপ করে বলেন, “কোমর সমান পানির নিচে ডুবে ধান কাটছি, কিন্তু রোদ না থাকায় ধান শুকাতে পারছি না। সব তো পচে যাবে।”

মিঠামইন এলাকার কিষাণী মরিয়ম বেগম জানান, বৃষ্টির কারণে ধান সেদ্ধ বা শুকানোর কোনো উপায় নেই, এমনকি ঘরে পানি ওঠায় চুলা জ্বালাতেও সমস্যা হচ্ছে।

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষকদের সতর্ক করা হয়েছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, “ইটনা ও অষ্টগ্রামে ক্ষতির পরিমাণ বেশি। আমরা কৃষকদের দ্রুত ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছি। বৃষ্টিপাত না বাড়লে বড় ধরনের ক্ষতির শঙ্কা কমে আসতে পারে।”

উল্লেখ্য, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একটি বড় অংশই এনজিও ঋণ ও বর্গা চাষের ওপর নির্ভরশীল। ফসল হারিয়ে এখন ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এই প্রান্তিক পরিবারগুলো।