ঢাকা ০৮:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

২২ দিনের লড়াই শেষে থেমে গেল শিশু সাফওয়ানের জীবন, শোকে স্তব্ধ মা

Live News Bangla71
  • আপডেট সময় : ০৮:২৪:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬ ২৭ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

চলতি মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ ভয়াবহভাবে বেড়েছে। একইসঙ্গে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সেই হামে আক্রান্ত হয়ে ২২ দিনের লড়াই শেষে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় চার মাস বয়সী আবদুল্লাহ আল সাফওয়ানও বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিকেলে মারা গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দেড় বছর আগে বিয়ে হওয়া জান্নাতুল ফেরদৌস ও আবদুল্লাহ মো. রাসেলের সংসারে চার মাস আগে জন্ম নেয় সাফওয়ান। সীমিত আয়ের এই পরিবারে নতুন অতিথিকে ঘিরে আনন্দের কোনো কমতি ছিল না। সন্তানের হাসি, কান্না, ছোট ছোট নড়াচড়া-সবই স্মার্টফোনে ধারণ করতেন মা। ভবিষ্যতে বড় হয়ে এসব দেখাবেন-এমন স্বপ্নেই দিন কাটছিল তার।

জানা যায়, জান্নাতুল ফেরদৌসের শ্বশুরবাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার চরতী ইউনিয়নের তালুকদারপাড়া এলাকায়।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২২ দিন আগে জ্বর ও কাশি শুরু হয় শিশু সাফওয়ানের। মা তাকে স্থানীয় পল্লিচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। চার দিন পরও কোনো উন্নতি হয়নি। পরে গত ১৯ এপ্রিল বিকেলে সাফওয়ানকে উপজেলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। এদিন সন্ধ্যায় তার সারা শরীরে লাল ফুসকুড়ি দেখা দেয়। চিকিৎসক জানান, এসব হামের লক্ষণ। হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা তুলনামূলক ব্যয়বহুল। দরিদ্র পরিবারটির সেই খরচ বহন করার সক্ষমতা ছিল না।

ওই দিন রাতেই সাফওয়ানকে সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরের দিন স্বজনদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে সন্তানকে উপজেলার আগের বেসরকারি হাসপাতালটিতে নিয়ে যান জান্নাতুল ফেরদৌস। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শিশুটিকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

জানা যায়, গত ২১ এপ্রিল রাত আড়াইটার দিকে শিশুটিকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান জান্নাতুল ফেরদৌস। অবস্থার অবনতি হলে দুই দিন পর তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। সেখানে স্বামী রাসেলকে নিয়ে সন্তানকে বাঁচাতে লড়াই শুরু করেন। একদিকে সন্তানকে বাঁচানোর আকুতি, অন্যদিকে হাতে কানাকড়িও নেই। ছেলের খেয়াল রাখার পাশাপাশি চিকিৎসা খরচ জোগাতে অনেকের কাছে ধার ও সাহায্য চান জান্নাতুল ফেরদৌস। সহযোগিতা চেয়ে পরিচিতজনদের দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করান। চট্টগ্রাম মেডিকেলের একজন চিকিৎসক তাঁকে তিন হাজার টাকা দেন, ফেসবুকে দেওয়া বিকাশ নম্বরে অন্য একজন দেন দুই হাজার টাকা। ধার করেন প্রায় ৮০ হাজার টাকা।

পরে বৃহস্পতিবার বিকেলে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪ মাস ১০ দিন বয়সী সাফওয়ান মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ওই দিনই এশার নামাজের পর জানাজা শেষে সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।

জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘আমার বাবুর হাসিমাখা মুখ কখনো ভুলতে পারব না। আমার সব অভাব ভুলিয়ে দিয়েছিল সে। তার ভিডিও করে রাখতাম বড় হলে তাকে দেখাব বলে। কিন্তু আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গেল।’

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, গত ২৯ এপ্রিল থেকে শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৩৩ জন ভর্তি ছিল। যার মধ্যে ২৩০ জনই নগরের হাসপাতালগুলোতে। জেলায় এ পর্যন্ত ১০৪ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। হামে মৃত্যু একজনের। সন্দেহজনক হামের রোগী ১ হাজার ৮৮, সুস্থ হয়ে ফিরেছে ৮৫৫ জন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

২২ দিনের লড়াই শেষে থেমে গেল শিশু সাফওয়ানের জীবন, শোকে স্তব্ধ মা

আপডেট সময় : ০৮:২৪:৪২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৯ মে ২০২৬

চলতি মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ ভয়াবহভাবে বেড়েছে। একইসঙ্গে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সেই হামে আক্রান্ত হয়ে ২২ দিনের লড়াই শেষে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় চার মাস বয়সী আবদুল্লাহ আল সাফওয়ানও বৃহস্পতিবার (৭ মে) বিকেলে মারা গেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দেড় বছর আগে বিয়ে হওয়া জান্নাতুল ফেরদৌস ও আবদুল্লাহ মো. রাসেলের সংসারে চার মাস আগে জন্ম নেয় সাফওয়ান। সীমিত আয়ের এই পরিবারে নতুন অতিথিকে ঘিরে আনন্দের কোনো কমতি ছিল না। সন্তানের হাসি, কান্না, ছোট ছোট নড়াচড়া-সবই স্মার্টফোনে ধারণ করতেন মা। ভবিষ্যতে বড় হয়ে এসব দেখাবেন-এমন স্বপ্নেই দিন কাটছিল তার।

জানা যায়, জান্নাতুল ফেরদৌসের শ্বশুরবাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার চরতী ইউনিয়নের তালুকদারপাড়া এলাকায়।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ২২ দিন আগে জ্বর ও কাশি শুরু হয় শিশু সাফওয়ানের। মা তাকে স্থানীয় পল্লিচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। চার দিন পরও কোনো উন্নতি হয়নি। পরে গত ১৯ এপ্রিল বিকেলে সাফওয়ানকে উপজেলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। এদিন সন্ধ্যায় তার সারা শরীরে লাল ফুসকুড়ি দেখা দেয়। চিকিৎসক জানান, এসব হামের লক্ষণ। হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা তুলনামূলক ব্যয়বহুল। দরিদ্র পরিবারটির সেই খরচ বহন করার সক্ষমতা ছিল না।

ওই দিন রাতেই সাফওয়ানকে সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরের দিন স্বজনদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে সন্তানকে উপজেলার আগের বেসরকারি হাসপাতালটিতে নিয়ে যান জান্নাতুল ফেরদৌস। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শিশুটিকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন।

জানা যায়, গত ২১ এপ্রিল রাত আড়াইটার দিকে শিশুটিকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছান জান্নাতুল ফেরদৌস। অবস্থার অবনতি হলে দুই দিন পর তাকে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। সেখানে স্বামী রাসেলকে নিয়ে সন্তানকে বাঁচাতে লড়াই শুরু করেন। একদিকে সন্তানকে বাঁচানোর আকুতি, অন্যদিকে হাতে কানাকড়িও নেই। ছেলের খেয়াল রাখার পাশাপাশি চিকিৎসা খরচ জোগাতে অনেকের কাছে ধার ও সাহায্য চান জান্নাতুল ফেরদৌস। সহযোগিতা চেয়ে পরিচিতজনদের দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করান। চট্টগ্রাম মেডিকেলের একজন চিকিৎসক তাঁকে তিন হাজার টাকা দেন, ফেসবুকে দেওয়া বিকাশ নম্বরে অন্য একজন দেন দুই হাজার টাকা। ধার করেন প্রায় ৮০ হাজার টাকা।

পরে বৃহস্পতিবার বিকেলে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৪ মাস ১০ দিন বয়সী সাফওয়ান মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ওই দিনই এশার নামাজের পর জানাজা শেষে সামাজিক কবরস্থানে দাফন করা হয় তাকে।

জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘আমার বাবুর হাসিমাখা মুখ কখনো ভুলতে পারব না। আমার সব অভাব ভুলিয়ে দিয়েছিল সে। তার ভিডিও করে রাখতাম বড় হলে তাকে দেখাব বলে। কিন্তু আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের ছেড়ে চলে গেল।’

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, গত ২৯ এপ্রিল থেকে শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ২৩৩ জন ভর্তি ছিল। যার মধ্যে ২৩০ জনই নগরের হাসপাতালগুলোতে। জেলায় এ পর্যন্ত ১০৪ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। হামে মৃত্যু একজনের। সন্দেহজনক হামের রোগী ১ হাজার ৮৮, সুস্থ হয়ে ফিরেছে ৮৫৫ জন।