ঢাকা ০৮:২৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতিই চ্যালেঞ্জ

Live News Bangla71
  • আপডেট সময় : ০৫:২৮:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ ৭৪ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

>দোটানায় অগোছালো আওয়ামী ভোটাররা
>নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ে ভয়
>অভিজাত এলাকার যানবাহন বিড়ম্বনা
>ঝুঁকিপূর্ণ ৪১ শতাংশ কেন্দ্র

দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। শেষ সময়ে মরিয়া হয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে প্রার্থীরা। নিজেদের পক্ষে সমর্থন বাড়াতে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতিও। পাড়া-মহল্লায় সর্বত্র শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ব্যানার।

ক্রমেই ভোটের সমীকরণে জয়-পরাজয় হিসাব মেলাতে আলোচনায় সরগরম কেন্দ্র থেকে প্রান্ত। প্রার্থী থেকে ভোটার—সবারই ভোটের হিসাব নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ; কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে কেন্দ্রে কাঙ্ক্ষিত ভোটার উপস্থিতিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। নেতা-নেতৃত্বহীন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত অগোছালো আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। আর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইত্যাদিও ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে ফ্যাক্টর হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তাঁরা বলছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ভোটারদের কেন্দ্রে উপস্থিতিই বড় চ্যালেঞ্জ। এরই মধ্যে সারা দেশে নির্বাচনী সহিংসতা দেখা যাচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে ৪১ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। শহরাঞ্চলে অনেক ভোটার এক এলাকায় বসবাস করলেও তিনি অন্য এলাকার ভোটার, তাঁদেরও সমস্যায় পড়তে হবে।

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থকরা এখনো ভোট নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন। হিন্দু ভোটারদের মনে এখনো সংশয় কাটেনি। নারী ভোটারদের অনেকেই নানা কারণে এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন। সূত্র জানায়, দেশে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনকে সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি ছিল ৫৫.৪৫ শতাংশ।

১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপস্থিতি ছিল ৭৪.৯৬ শতাংশ, ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপস্থিতি ছিল ৭৫.৫৯ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি ছিল ৮৭.১৩ শতাংশ।
তবে গত রবিবার এক অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ৫৫ শতাংশ ভোট পড়েছিল। আমার মনে হয়, এবার নির্বাচনে ৫৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়বে।’ তিনি আরো বলেন, ‘কো‌নো নির্বাচনই শা‌ন্তিপূর্ণভা‌বে করা যায়‌নি। কোনো না কোনো ঝা‌মেলা ছিল। এবার এখন পর্যন্ত কিছু ঘটনা ঘ‌টে‌ছে এবং সেগু‌লোর বিষ‌য়ে ব্যবস্থা নেওয়া হ‌য়ে‌ছে।’ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে পুলিশ সারা দেশে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তাঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ১৭ হাজার ৫৫৬টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা মোট কেন্দ্রের প্রায় ৪১ শতাংশ। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার দুই হাজার ১৩১টি কেন্দ্রের মধ্যে ৬৯৫টি অর্থাৎ ৩৩ শতাংশ অতি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ৮৫ শতাংশের বেশি কেন্দ্র কোনো না কোনো ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ছয় কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন, নারী ভোটার ছয় কোটি ২৮ লাখ সাত হাজার ৯৪২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার এক হাজার ২৩৪ জন। এবার এক হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

গত সোমবার প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পরদিন থেকে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশে ২৭৪টি সহিংস ঘটনা এবং পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের কারণেই সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এমন সংঘর্ষের সংখ্যা ৮৯টি। ভীতি প্রদর্শন বা আক্রমণাত্মক আচরণের ঘটনা ঘটেছে ১৬টি, প্রার্থীর ওপর সরাসরি হামলার ঘটনা ১৫টি। এ ছাড়া অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা পাওয়া গেছে তিনটি। নির্বাচনী প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ২৯টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অফিস বা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ২০টি। অবরোধ ও বিক্ষোভের ঘটনা ছিল ১৭টি। এ ছাড়া হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ৯টি, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা একটি এবং অন্যান্য ক্যাটাগরিতে সহিংসতার ঘটনা ৭০টি।

নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অতীতে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার নজির রয়েছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি বেশি। ভোটের মাঠে বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র এবারের নির্বাচনকে আরো চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছে। প্রচারকালীন সংঘর্ষ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা ভোটের দিন পরিস্থিতি জটিল করে তুলতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। কর্মীদের রেখে বিভিন্ন দেশে পালিয়ে গেছেন অনেক নেতা। আবার কেউ কেউ কারাগারে আছেন। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে সরকার। তারা আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়নি। এমন পরিস্থিতিতে অগোছালো দলটির কনক্রিট জনসমর্থন নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। তার পরও একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার রয়েছে দলটির। কিন্তু তারা কতটা কেন্দ্রে যাবে, তাদেরকে কিভাবে ভোটকেন্দ্রমুখী করা সম্ভব হবে, তারা আদৌ কেন্দ্রে যাবে কি না—সব প্রশ্ন সামনে এসেছে। জানা যায়, বিভিন্নভাবে আওয়ামী সমর্থকদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে রাজনৈতিক দলগুলো। কোথাও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাদের দলে ভেড়ানো, কোথাও মামলা প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা, কোথাও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। তবে এ কাজগুলো অনেকটাই নীরবে করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত জোটের পক্ষ থেকে এ কাজগুলো করা হচ্ছে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা হচ্ছে—আওয়ামী ভোটারদের অনেকেই এখনো ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে দোটানায় রয়েছেন। এ ছাড়া হিন্দু ভোট সাধারণত আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক বলে পরিচিত। তাঁদের অনেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত মোট ৭২ ঘণ্টা মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে। আর ট্যাক্সি ক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকবে ১১ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত থেকে ভোটের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত।

সাধারণত রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, বিভিন্ন ডিওএইচএস এলাকা, নিকুঞ্জ, নিকেতন, ধানমণ্ডিসহ বেশ কিছু এলাকাকে অভিজাত হিসেবে ধরা হয়। এ ছাড়া রাজধানীসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরের অনেক বাসিন্দা ব্যক্তিগত যানবাহনে চলাচল করেন। কিন্তু ভোটের দিন যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এসব ভোটারের সবাই কেন্দ্রে উপস্থিত হবেন কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ ছাড়া কোনো কেন্দ্রে যদি সহিংসতা বা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা শোনা যায়, তাহলে ওই কেন্দ্রে নারী ভোটারদের উপস্থিতি নিয়েও সংশয় রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পর্যাপ্ত নিরাপত্তার আশ্বাস না পেলে প্রত্যাশিত ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। এটা মূলত নির্বাচনের তিন-চার দিন আগে বোঝা যাবে। এই সময় নির্বাচন কমিশন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতার ওপর ভোটার উপস্থিতি অনেকটা নির্ভর করছে। এ ছাড়া প্রার্থীদের নেটওয়ার্কের কারণে ভোটাররা কেন্দ্রে আসবেন। আর প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত বেশি হবে, তত ভোট বেশি পড়বে।’

আওয়ামী ভোটারদের ব্যাপারে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমার মনে হয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একটা দলীয় নির্দেশনা থাকবে। সেই অনুযায়ী তাঁরা ভোট দেবেন। তবে যাঁরা আওয়ামী লীগের সাধারণ সমর্থক ছিলেন, তাঁরা ওই নির্দেশনা ফলো করবেন না। তাঁরা বিদ্যমান পরিস্থিতি ও প্রার্থীদের সঙ্গে তাঁদের বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করে ভোট দেবেন।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতিই চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় : ০৫:২৮:৫১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

>দোটানায় অগোছালো আওয়ামী ভোটাররা
>নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ে ভয়
>অভিজাত এলাকার যানবাহন বিড়ম্বনা
>ঝুঁকিপূর্ণ ৪১ শতাংশ কেন্দ্র

দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। শেষ সময়ে মরিয়া হয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে প্রার্থীরা। নিজেদের পক্ষে সমর্থন বাড়াতে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতিও। পাড়া-মহল্লায় সর্বত্র শোভা পাচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ব্যানার।

ক্রমেই ভোটের সমীকরণে জয়-পরাজয় হিসাব মেলাতে আলোচনায় সরগরম কেন্দ্র থেকে প্রান্ত। প্রার্থী থেকে ভোটার—সবারই ভোটের হিসাব নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ; কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে কেন্দ্রে কাঙ্ক্ষিত ভোটার উপস্থিতিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। নেতা-নেতৃত্বহীন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত অগোছালো আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। আর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইত্যাদিও ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে ফ্যাক্টর হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

তাঁরা বলছেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ভোটারদের কেন্দ্রে উপস্থিতিই বড় চ্যালেঞ্জ। এরই মধ্যে সারা দেশে নির্বাচনী সহিংসতা দেখা যাচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পক্ষ থেকে ৪১ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র চিহ্নিত করা হয়েছে। শহরাঞ্চলে অনেক ভোটার এক এলাকায় বসবাস করলেও তিনি অন্য এলাকার ভোটার, তাঁদেরও সমস্যায় পড়তে হবে।

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থকরা এখনো ভোট নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন। হিন্দু ভোটারদের মনে এখনো সংশয় কাটেনি। নারী ভোটারদের অনেকেই নানা কারণে এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন। সূত্র জানায়, দেশে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনকে সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি ছিল ৫৫.৪৫ শতাংশ।

১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপস্থিতি ছিল ৭৪.৯৬ শতাংশ, ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উপস্থিতি ছিল ৭৫.৫৯ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি ছিল ৮৭.১৩ শতাংশ।
তবে গত রবিবার এক অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে ৫৫ শতাংশ ভোট পড়েছিল। আমার মনে হয়, এবার নির্বাচনে ৫৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়বে।’ তিনি আরো বলেন, ‘কো‌নো নির্বাচনই শা‌ন্তিপূর্ণভা‌বে করা যায়‌নি। কোনো না কোনো ঝা‌মেলা ছিল। এবার এখন পর্যন্ত কিছু ঘটনা ঘ‌টে‌ছে এবং সেগু‌লোর বিষ‌য়ে ব্যবস্থা নেওয়া হ‌য়ে‌ছে।’ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে পুলিশ সারা দেশে ভোটকেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তাঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ১৭ হাজার ৫৫৬টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা মোট কেন্দ্রের প্রায় ৪১ শতাংশ। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার দুই হাজার ১৩১টি কেন্দ্রের মধ্যে ৬৯৫টি অর্থাৎ ৩৩ শতাংশ অতি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ৮৫ শতাংশের বেশি কেন্দ্র কোনো না কোনো ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ছয় কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন, নারী ভোটার ছয় কোটি ২৮ লাখ সাত হাজার ৯৪২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার এক হাজার ২৩৪ জন। এবার এক হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।

গত সোমবার প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পরদিন থেকে ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশে ২৭৪টি সহিংস ঘটনা এবং পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের কারণেই সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এমন সংঘর্ষের সংখ্যা ৮৯টি। ভীতি প্রদর্শন বা আক্রমণাত্মক আচরণের ঘটনা ঘটেছে ১৬টি, প্রার্থীর ওপর সরাসরি হামলার ঘটনা ১৫টি। এ ছাড়া অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা পাওয়া গেছে তিনটি। নির্বাচনী প্রচারে বাধা দেওয়ার অভিযোগে ২৯টি ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট অফিস বা প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে ২০টি। অবরোধ ও বিক্ষোভের ঘটনা ছিল ১৭টি। এ ছাড়া হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ৯টি, সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা একটি এবং অন্যান্য ক্যাটাগরিতে সহিংসতার ঘটনা ৭০টি।

নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অতীতে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার নজির রয়েছে এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি বেশি। ভোটের মাঠে বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র এবারের নির্বাচনকে আরো চ্যালেঞ্জে ফেলে দিয়েছে। প্রচারকালীন সংঘর্ষ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা ভোটের দিন পরিস্থিতি জটিল করে তুলতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। কর্মীদের রেখে বিভিন্ন দেশে পালিয়ে গেছেন অনেক নেতা। আবার কেউ কেউ কারাগারে আছেন। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে সরকার। তারা আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়নি। এমন পরিস্থিতিতে অগোছালো দলটির কনক্রিট জনসমর্থন নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। তার পরও একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ভোটার রয়েছে দলটির। কিন্তু তারা কতটা কেন্দ্রে যাবে, তাদেরকে কিভাবে ভোটকেন্দ্রমুখী করা সম্ভব হবে, তারা আদৌ কেন্দ্রে যাবে কি না—সব প্রশ্ন সামনে এসেছে। জানা যায়, বিভিন্নভাবে আওয়ামী সমর্থকদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে রাজনৈতিক দলগুলো। কোথাও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাদের দলে ভেড়ানো, কোথাও মামলা প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা, কোথাও নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। তবে এ কাজগুলো অনেকটাই নীরবে করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত জোটের পক্ষ থেকে এ কাজগুলো করা হচ্ছে। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা হচ্ছে—আওয়ামী ভোটারদের অনেকেই এখনো ভোটকেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে দোটানায় রয়েছেন। এ ছাড়া হিন্দু ভোট সাধারণত আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক বলে পরিচিত। তাঁদের অনেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে রয়েছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন চলাচলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত মোট ৭২ ঘণ্টা মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে। আর ট্যাক্সি ক্যাব, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকবে ১১ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাত থেকে ভোটের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত।

সাধারণত রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা, বিভিন্ন ডিওএইচএস এলাকা, নিকুঞ্জ, নিকেতন, ধানমণ্ডিসহ বেশ কিছু এলাকাকে অভিজাত হিসেবে ধরা হয়। এ ছাড়া রাজধানীসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরের অনেক বাসিন্দা ব্যক্তিগত যানবাহনে চলাচল করেন। কিন্তু ভোটের দিন যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় এসব ভোটারের সবাই কেন্দ্রে উপস্থিত হবেন কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ ছাড়া কোনো কেন্দ্রে যদি সহিংসতা বা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা শোনা যায়, তাহলে ওই কেন্দ্রে নারী ভোটারদের উপস্থিতি নিয়েও সংশয় রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পর্যাপ্ত নিরাপত্তার আশ্বাস না পেলে প্রত্যাশিত ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। এটা মূলত নির্বাচনের তিন-চার দিন আগে বোঝা যাবে। এই সময় নির্বাচন কমিশন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতার ওপর ভোটার উপস্থিতি অনেকটা নির্ভর করছে। এ ছাড়া প্রার্থীদের নেটওয়ার্কের কারণে ভোটাররা কেন্দ্রে আসবেন। আর প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যত বেশি হবে, তত ভোট বেশি পড়বে।’

আওয়ামী ভোটারদের ব্যাপারে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আমার মনে হয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে একটা দলীয় নির্দেশনা থাকবে। সেই অনুযায়ী তাঁরা ভোট দেবেন। তবে যাঁরা আওয়ামী লীগের সাধারণ সমর্থক ছিলেন, তাঁরা ওই নির্দেশনা ফলো করবেন না। তাঁরা বিদ্যমান পরিস্থিতি ও প্রার্থীদের সঙ্গে তাঁদের বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করে ভোট দেবেন।’