ঢাকা ০৪:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

গাজায় ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ ভাইরাস, ভেঙে পড়ার মুখে স্বাস্থ্যব্যবস্থা

Live News Bangla71
  • আপডেট সময় : ০৬:৪৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬ ৯৪ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

গাজা উপত্যকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে একটি ভয়ংকর শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস। এই ভাইরাস ইতোমধ্যে বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এতে করে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বলে সতর্ক করেছেন জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

গাজা সিটির আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সের মেডিকেল ডিরেক্টর মোহাম্মদ আবু সালমিয়া সোমবার (১৯ জানুয়ারি) আনাদোলুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ভাইরাসজনিত এই সংক্রমণে হাসপাতালে মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, শিশু, বয়স্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে এই ভাইরাস আক্রমন করছে।আবু সালমিয়া বলেন, ‘আমরা এক অভূতপূর্ব স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি। পরিস্থিতি এমন গতিতে অবনতি হচ্ছে, যা আমরা আগে কখনো দেখিনি।’

তিনি জানান, ভাইরাসটি ইনফ্লুয়েঞ্জা বা করোনাভাইরাসের কোনো ধরন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অপুষ্টি, দীর্ঘদিনের মানসিক ট্রমা এবং টিকাদানের প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতির কারণে সব বয়সী মানুষের মধ্যে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

আবু সালমিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের মধ্যে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী তীব্র জ্বর, মারাত্মক জয়েন্ট ও হাড়ের ব্যথা, প্রচণ্ড মাথাব্যথা এবং বমির মতো উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এটি তীব্র নিউমোনিয়ায় রূপ নিচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে তাবুতে বসবাসরত বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি মারাত্মক। শীত, আর্দ্রতা ও অতিরিক্ত ভিড় থেকে কোনো সুরক্ষা না থাকায় এসব জটিলতা প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।’

চরম সংকটে হাসপাতালগুলো

আবু সালমিয়া জানান, ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধবিরতির ১০০ দিনের বেশি সময় পার হলেও স্বাস্থ্যব্যবস্থার পতন আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোতে ন্যূনতম চিকিৎসা সামগ্রীরও চরম ঘাটতি রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘অপারেশন থিয়েটারে জীবাণুমুক্ত গজ নেই, অ্যান্টিবায়োটিক প্রায় শেষ। ক্যানসারের ওষুধ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। কিডনি ডায়ালাইসিস রোগী ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেই।’

এছাড়া মানসিক স্বাস্থ্য সংকটও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে জানান তিনি। মানসিক রোগীদের চিকিৎসাকেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই, যা রোগী ও সমাজ—উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।

আবু সালমিয়া আরও বলেন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণের অভাবে গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ মেডিকেল ল্যাবরেটরি অচল হয়ে পড়েছে। ফলে সাধারণ পরীক্ষাও করা সম্ভব হচ্ছে না।চিকিৎসা সহায়তা প্রবেশে বাধা

আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সের পরিচালক অভিযোগ করেন, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে গাজায় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশে বাধা দিচ্ছে—এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের সুপারিশকৃত সামগ্রীও আটকে রাখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও সরঞ্জাম ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না, অথচ সফট ড্রিংকস, স্ন্যাকস ও মোবাইল ফোনের মতো অপ্রয়োজনীয় জিনিস ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে।’

এটিকে তিনি পরিকল্পিতভাবে ক্ষতি সাধনের একটি নীতি বলে উল্লেখ করেন। তিনি অবিলম্বে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, গাজায় যেন নির্বিঘ্নে ওষুধ, ল্যাব উপকরণ ও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

আবু সালমিয়া জোর দিয়ে বলেন, গাজার সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হলো অ্যান্টিবায়োটিক, ক্যানসারের চিকিৎসা, ডায়ালাইসিস সামগ্রী, দীর্ঘমেয়াদি ও মানসিক রোগের ওষুধ এবং মৌলিক চিকিৎসা উপকরণ।তিনি বলেন, ‘এই সরঞ্জামগুলো না পেলে এমন অনেক জীবন হারাতে হবে, যেগুলো রক্ষা করা সম্ভব ছিল। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক ও চিকিৎসা বিপর্যয় ঠেকানোর প্রশ্ন।’

উল্লেখ্য, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হাসপাতাল, চিকিৎসাকেন্দ্র, ওষুধের গুদাম এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা বারবার হামলার শিকার হয়েছে। পাশাপাশি কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে চিকিৎসা সহায়তা প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, অক্টোবর ২০২৩ থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু, এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

অক্টোবরে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৬৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং প্রায় ১,২৮৭ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

গাজায় ছড়িয়ে পড়েছে ভয়াবহ ভাইরাস, ভেঙে পড়ার মুখে স্বাস্থ্যব্যবস্থা

আপডেট সময় : ০৬:৪৩:৩৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬

গাজা উপত্যকায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে একটি ভয়ংকর শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস। এই ভাইরাস ইতোমধ্যে বহু মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। এতে করে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বলে সতর্ক করেছেন জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

গাজা সিটির আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সের মেডিকেল ডিরেক্টর মোহাম্মদ আবু সালমিয়া সোমবার (১৯ জানুয়ারি) আনাদোলুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ভাইরাসজনিত এই সংক্রমণে হাসপাতালে মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, শিশু, বয়স্ক এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে এই ভাইরাস আক্রমন করছে।আবু সালমিয়া বলেন, ‘আমরা এক অভূতপূর্ব স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি। পরিস্থিতি এমন গতিতে অবনতি হচ্ছে, যা আমরা আগে কখনো দেখিনি।’

তিনি জানান, ভাইরাসটি ইনফ্লুয়েঞ্জা বা করোনাভাইরাসের কোনো ধরন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অপুষ্টি, দীর্ঘদিনের মানসিক ট্রমা এবং টিকাদানের প্রায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিতির কারণে সব বয়সী মানুষের মধ্যে এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

আবু সালমিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের মধ্যে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী তীব্র জ্বর, মারাত্মক জয়েন্ট ও হাড়ের ব্যথা, প্রচণ্ড মাথাব্যথা এবং বমির মতো উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এটি তীব্র নিউমোনিয়ায় রূপ নিচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে তাবুতে বসবাসরত বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য পরিস্থিতি মারাত্মক। শীত, আর্দ্রতা ও অতিরিক্ত ভিড় থেকে কোনো সুরক্ষা না থাকায় এসব জটিলতা প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।’

চরম সংকটে হাসপাতালগুলো

আবু সালমিয়া জানান, ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধবিরতির ১০০ দিনের বেশি সময় পার হলেও স্বাস্থ্যব্যবস্থার পতন আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোতে ন্যূনতম চিকিৎসা সামগ্রীরও চরম ঘাটতি রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘অপারেশন থিয়েটারে জীবাণুমুক্ত গজ নেই, অ্যান্টিবায়োটিক প্রায় শেষ। ক্যানসারের ওষুধ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। কিডনি ডায়ালাইসিস রোগী ও দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেই।’

এছাড়া মানসিক স্বাস্থ্য সংকটও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে জানান তিনি। মানসিক রোগীদের চিকিৎসাকেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই, যা রোগী ও সমাজ—উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।

আবু সালমিয়া আরও বলেন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরণের অভাবে গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ মেডিকেল ল্যাবরেটরি অচল হয়ে পড়েছে। ফলে সাধারণ পরীক্ষাও করা সম্ভব হচ্ছে না।চিকিৎসা সহায়তা প্রবেশে বাধা

আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সের পরিচালক অভিযোগ করেন, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে গাজায় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশে বাধা দিচ্ছে—এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের সুপারিশকৃত সামগ্রীও আটকে রাখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও সরঞ্জাম ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না, অথচ সফট ড্রিংকস, স্ন্যাকস ও মোবাইল ফোনের মতো অপ্রয়োজনীয় জিনিস ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে।’

এটিকে তিনি পরিকল্পিতভাবে ক্ষতি সাধনের একটি নীতি বলে উল্লেখ করেন। তিনি অবিলম্বে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, গাজায় যেন নির্বিঘ্নে ওষুধ, ল্যাব উপকরণ ও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

আবু সালমিয়া জোর দিয়ে বলেন, গাজার সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন হলো অ্যান্টিবায়োটিক, ক্যানসারের চিকিৎসা, ডায়ালাইসিস সামগ্রী, দীর্ঘমেয়াদি ও মানসিক রোগের ওষুধ এবং মৌলিক চিকিৎসা উপকরণ।তিনি বলেন, ‘এই সরঞ্জামগুলো না পেলে এমন অনেক জীবন হারাতে হবে, যেগুলো রক্ষা করা সম্ভব ছিল। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক ও চিকিৎসা বিপর্যয় ঠেকানোর প্রশ্ন।’

উল্লেখ্য, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হাসপাতাল, চিকিৎসাকেন্দ্র, ওষুধের গুদাম এবং স্বাস্থ্যকর্মীরা বারবার হামলার শিকার হয়েছে। পাশাপাশি কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে চিকিৎসা সহায়তা প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, অক্টোবর ২০২৩ থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত, যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু, এবং ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

অক্টোবরে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৪৬৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং প্রায় ১,২৮৭ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।