প্রেমের খোঁজে জেন-জিরা কেন ভরসা করছেন জাদুবিদ্যা ও ট্যারো কার্ডে?
- আপডেট সময় : ০৮:৫০:০৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
ভালোবাসার মানুষ খুঁজে পেতে বা সম্পর্কের টানাপোড়েন কমাতে জেন-জি প্রজন্মের মধ্যে আধ্যাত্মিক পদ্ধতি অনুসরণের প্রবণতা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডেটিং নিউজ-এর করা এক জরিপে উঠে এসেছে যে, দেশটির ১ হাজার ১৩ জন প্রাপ্তবয়স্ক জেন-জি তরুণের মধ্যে ৬৪ শতাংশই অন্তত একবার তাদের প্রেমজীবন উন্নত করতে বিভিন্ন সাইকিক, জাদুবিদ্যাসংশ্লিষ্ট বা আধ্যাত্মিক পদ্ধতির শরণাপন্ন হয়েছেন। তবে অনলাইন সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়া এই প্রবণতা তরুণ প্রজন্মের প্রেম ও সম্পর্ক নিয়ে ভাবনার একটি নতুন দিক তুলে ধরছে। ডেটিং অ্যাপে হতাশা, জাদুবিদ্যায় বাড়তি আগ্রহ। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের গবেষকদের ২০১৬ সালের একটি গবেষণাও প্রাসঙ্গিক।
জরিপ অনুযায়ী, জেন-জিদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো ম্যানিফেস্টেশন বা স্ক্রিপ্টিং, যা ২৯ শতাংশ তরুণ নিয়মিত চর্চা করেন। জেন–জিরা প্রেমের খোঁজে কেউ ম্যানিফেস্টেশন করছেন, কেউ ট্যারো কার্ডের সাহায্য নিচ্ছেন, আবার কেউ অনলাইনে খুঁজছেন লাভ স্পেল বা ভালোবাসার জাদুমন্ত্র। ম্যানিফেস্টেশন হলো নিজের কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক চিন্তা করা এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়া। প্রেমের ক্ষেত্রে কেউ কেমন জীবনসঙ্গী চান, সম্পর্কের মধ্যে কী ধরনের অনুভূতি ও বোঝাপড়া আশা করেন, সেসব লিখে রাখেন। এই প্রক্রিয়ার একটি পরিচিত ধরন স্ক্রিপ্টিং। এতে নিজের কাঙ্ক্ষিত সম্পর্কটি বাস্তবে তৈরি হয়েছে, এমনভাবে মনের ভাবনা লিখে রাখেন অনেকে। কিন্তু মনের কথা বোঝা কিংবা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া সহজ হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটু আশ্বাস পেতে চান অনেকেই। পছন্দের মানুষটি ফিরবেন কি না, নতুন কেউ জীবনে আসবেন কি না কিংবা চলমান সম্পর্কটি টিকবে কি না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, সেই আচার অন্য কারও অনুভূতি বা সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে। অন্যদিকে ২৯ শতাংশের অভিজ্ঞতা ছিল আংশিক সফলতার। তাঁর গবেষণা বলছে, শুধু কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের স্বপ্নে ডুবে থাকলে লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রচেষ্টা কমে যেতে পারে। প্রেমের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কেমন সঙ্গী চান, তা জানা যেমন প্রয়োজন, তেমনি নিজের প্রত্যাশা স্পষ্ট করা, পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রে খোলামেলা যোগাযোগও জরুরি।
এছাড়া ২৫ শতাংশ সাইকিকের পরামর্শ নিয়েছেন, ১৭ শতাংশ ট্যারো কার্ড রিডারের কাছে গেছেন এবং ১৬ শতাংশ নির্ভর করেছেন রাশিচক্র বা অ্যাস্ট্রোলজির ওপর। অন্যদিকে ১৪ শতাংশ দৈনিক রাশিফল, ১০ শতাংশ সাইকিক বা ট্যারো রিডারের পরামর্শ এবং ৮ শতাংশ লাভ স্পেলের ওপর আস্থা রাখার কথা জানিয়েছেন।
এমনকি ১৯ শতাংশ তরুণ লাভ স্পেল বা বিশেষ রিচুয়ালের জন্য অর্থও ব্যয় করেছেন। তবে গবেষকরা জানাচ্ছেন, এই চর্চাগুলো মূলত মনের অস্থিরতা কমিয়ে মানসিক স্বস্তি পাওয়ার একটি মাধ্যম মাত্র।
আধুনিক ডেটিং অ্যাপের যুগে যোগাযোগের সুযোগ বাড়লেও সম্পর্কের জটিলতা কমছে না। মেসেজের উত্তর না পাওয়া, অকারণে সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া বা সঙ্গীর আবেগ বুঝতে না পারার অনিশ্চয়তা থেকে তরুণরা এই ধরনের আচারের দিকে ঝুঁকছেন। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, প্রিয়জন হারানোর শোকে কিংবা সম্পর্কের সংকটে মানুষ প্রতীকী রিচুয়াল পালন করে নিজের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলে মনে করতে চায়, যা সাময়িক মানসিক প্রশান্তি দেয়। কখনো মেসেজের উত্তর আসে না, কখনো সম্পর্কের নাম দেওয়া যায় না, আবার কখনো দীর্ঘদিনের সম্পর্কও ভেঙে যায় কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই। মনোবিজ্ঞানের গবেষণাতেও অনিশ্চয়তার সময়ে প্রতীকী আচার বা রিচুয়ালের প্রতি মানুষের আকর্ষণের একটি ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এমনকি প্রথম ডেটের মতো পরিস্থিতিতেও মানসিক চাপ সামলাতে প্রতীকী ভূমিকা রাখতে পারে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৪৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের অভিজ্ঞতায় এই পদ্ধতিগুলো কোনো না কোনোভাবে কাজে এসেছে, যদিও এর পেছনে বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। অনেক সময় ঘটনার আকস্মিক মিলকে মানুষ কার্যকারণ বলে ভুল করেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, কেবল ইতিবাচক কল্পনা বা জাদুমন্ত্র দিয়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। মনোবিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েলে ওটিঙ্গেনের মতে, শুধু স্বপ্নের পেছনে না ছুটে বাস্তব বাধাগুলো দূর করার চেষ্টা করাই বেশি কার্যকর। শুধু স্বপ্ন দেখলেই কি মিলবে ভালোবাসা।
প্রেক্ষাপট ও গবেষণাসূত্র
- DatingNews (৬ অক্টোবর ২০২৬): ১,০১৩ জন মার্কিন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর পরিচালিত জরিপ, যা জেন-জির আধ্যাত্মিক চর্চার প্রবণতা তুলে ধরেছে।
- Harvard Business School (২০১৪): মাইকেল নর্টন ও ফ্রান্সেসকা জিনোর গবেষণায় দেখা গেছে, রিচুয়াল শোক ও মানসিক কষ্ট কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
- Harvard ও UC Berkeley (২০১৬): গবেষক দলের মতে, নির্দিষ্ট কিছু আচার মানসিক উদ্বেগ কমিয়ে পারফরম্যান্স ভালো করতে সহায়তা করে।
- Gabriele Oettingen (২০১৬): কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের কল্পনার পাশাপাশি বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে করা গবেষণা।
- Pew Research Center (২০২৫): ৯,৫৯৩ জনের ওপর চালানো জরিপ অনুযায়ী, অধিকাংশ মানুষ বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে অ্যাস্ট্রোলজি ও ট্যারো কার্ড ব্যবহার করেন।
সবশেষে, জেন-জিদের মধ্যে থেরাপির প্রতি আগ্রহ এখনো সবচেয়ে বেশি।
ডেটিং নিউজ-এর তথ্যানুযায়ী, ৩৮ শতাংশ জেন-জি পেশাদার থেরাপির ওপর আস্থা রাখেন।
আর মাত্র ৮ শতাংশ লাভ স্পেলের ওপর ভরসা করেন।
মূলত ভালোবাসার অনিশ্চয়তায় একটু ভরসা পাওয়ার প্রচেষ্টাই এই নতুন ঘরানার চর্চায় ফুটিয়ে তুলছে তরুণ প্রজন্ম।
সুস্থ সম্পর্কের জন্য দুজনের সমান সম্মতি, আবেগ ও পারস্পরিক বোঝাপড়াই প্রধান চাবিকাঠি।
কোনো জাদুমন্ত্র দিয়ে অন্যের অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- Harvard Business School, ২০১৪: Michael I. Norton ও Francesca Gino-এর Rituals Alleviate Grieving for Loved Ones, Lovers, and Lotteries গবেষণা। PubMed+1।
- Harvard ও UC Berkeley-এর গবেষক দল, ২০১৬: Don”t Stop Believing: Rituals Improve Performance by Decreasing Anxiety। faculty.haas.berkeley.edu।
- Gabriele Oettingen, ২০১৬: The Power of Prospection: Mental Contrasting and Behavior Change। Wiley Online Library।


















