নিরামিষ নাকি মাংসাশী: সুস্থ থাকতে বিজ্ঞানের পরামর্শ কী
- আপডেট সময় : ০৭:৩০:৫৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই মানুষের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে নানা বিতর্ক দেখা যায়। মানুষ কি প্রকৃতিগতভাবে নিরামিষাশী, নাকি মাংসাশী—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকেই নানা ধরনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কেউ কেউ দাবি করেন প্রাণিজ আমিষ বা মাছ-মাংস একেবারেই বর্জন করা উচিত, আবার অনেকে উচ্চমাত্রায় মাংস ও চর্বি গ্রহণের পক্ষে মত দেন। এই পরস্পরবিরোধী মতামতের ভিড়ে সাধারণ মানুষ প্রায়শই বিভ্রান্তিতে পড়েন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের খাদ্যাভ্যাস ও চিকিৎসাভিত্তিক জীবনযাপন নিয়ে আলোচনা। কেউ অসুস্থ হলে তো কথাই নেই—একজন রোগীকে ঘিরে সবাই যেন চিকিৎসক হয়ে ওঠেন। আমাদের সামাজিক আচরণের এ প্রবণতা পরিচিত।
বিজ্ঞান বলছে, মানুষ আসলে সর্বভুক প্রাণী। মানুষের শরীর উদ্ভিজ্জ ও প্রাণিজ উভয় উৎস থেকেই প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণের উপযোগী। মানুষের বিবর্তনীয় ইতিহাস এবং শারীরবৃত্তীয় গঠন এর প্রমাণ দেয়। মানুষের দাঁত ও চোয়াল বিভিন্ন ধরনের খাবার চিবানোর উপযোগী এবং পরিপাকতন্ত্রও দুই ধরনের খাবার হজম করতে সক্ষম। লালারসে থাকা অ্যামাইলেজ এনজাইম শ্বেতসার ভাঙতে সাহায্য করে, অন্যদিকে পাকস্থলীর হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড ও এনজাইম প্রোটিন হজমে ভূমিকা রাখে। তবে সর্বভুক হওয়ার মানেই যে প্রচুর মাংস খেতে হবে, তা নয়; বরং সুপরিকল্পিত উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যাভ্যাসও স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ উপকারী হতে পারে।
মানুষের নিরামিষাশী বা মাংসাশী হওয়ার দাবি নিয়ে যেসব যুক্তি দেওয়া হয়, তার অনেকগুলোই বৈজ্ঞানিকভাবে ভিত্তিহীন। লালার অম্লত্ব, পাকস্থলীর অ্যাসিডের মাত্রা, ইউরিক অ্যাসিডের কারণ, অন্ত্রের দৈর্ঘ্য বা ঘাম—এসব বিষয় দিয়ে মানুষকে নির্দিষ্ট কোনো খাদ্যশ্রেণিতে ফেলা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, মানুষের পাকস্থলীর অ্যাসিড প্রোটিন হজমের উপযোগী। এছাড়া শরীরে ইউরিক অ্যাসিড শুধু মাংস থেকে তৈরি হয় না, বরং শরীরের নিজস্ব পিউরিন বিপাক থেকেও এটি উৎপন্ন হয়। এটি কোনো প্রাণীর খাদ্যশ্রেণি নির্ধারণের মাপকাঠি নয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যকর উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমাতে সক্ষম। ২০২৩ সালের একটি মেটা-অ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যকর উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ এবং সব ধরনের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকির একটি ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণাটির ফলাফল বলছে, এই ধরনের খাদ্যাভ্যাস টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রায় ১৮ শতাংশ, হৃদ্রোগের ঝুঁকি ১০ শতাংশ এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি ১৬ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। গবেষণাটিতে ঝুঁকি কমার হার যথাক্রমে প্রায় ১৮, ১০ ও ১৬ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শরীরের এই সক্ষমতা থেকে কোন খাদ্যাভ্যাস সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর, তা এককভাবে নির্ধারণ করা যায় না। অর্থাৎ শরীরের এক-দুটি বৈশিষ্ট্য দেখে খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও শাকসবজি, ফল, ডাল, বাদাম ও পূর্ণশস্য সমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাসের ওপর গুরুত্বারোপ করে। এই খাবারগুলোতে থাকা খাদ্য-আঁশ অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সাহায্য করে, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমাতে সহায়তা করে। এছাড়া শাকসবজি ও ফলে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কার্যকরী। তবে শুধু মাংস বর্জন করলেই শরীর সুস্থ হয়ে যায় না, বরং মাংসের বিকল্প হিসেবে কী গ্রহণ করা হচ্ছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাল মাংসের বদলে ডাল বা ছোলা গ্রহণ করলে যেমন উপকার পাওয়া যায়, তেমনি মাছ-মাংসের বদলে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত বা ভাজাপোড়া খাবার খেলে কোনো লাভ হয় না।
সম্পূর্ণ ভেগান বা নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে বিশেষ কিছু পুষ্টি উপাদানের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। বিশেষ করে ভিটামিন বি১২, আয়রন, ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের ঘাটতি যেন না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষত ভিটামিন বি১২ নির্ভরযোগ্যভাবে পাওয়ার জন্য ফোর্টিফায়েড খাবার বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি নিরামিষাশীদের পুষ্টি পরিকল্পনা সচেতনভাবে করা বাঞ্ছনীয়।
বাংলাদেশে সুলভ অনেক দেশি খাবারই পুষ্টির চমৎকার উৎস হতে পারে। মসুর ডাল, মুগ ডাল, ছোলা ও রাজমা প্রোটিন ও আঁশের জোগান দেয়। লালশাক, পালংশাক, পুঁইশাক, লাউ ও কুমড়াসহ মৌসুমি সবজি এবং পেয়ারা, পেঁপে, কলা ও আমের মতো ফল খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনে। লাল চাল ও আটার রুটি থেকে পাওয়া যায় পর্যাপ্ত আঁশ। মনে রাখা প্রয়োজন, প্রতিটি মানুষের বয়স, শারীরিক গঠন, কাজের ধরন ও স্বাস্থ্য অনুযায়ী পুষ্টির চাহিদা ভিন্ন হয়। তাই ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাসের জন্য একটি সহজ নিয়ম হতে পারে—প্রতিদিনের প্লেটের অর্ধেক শাকসবজি ও ফল, এক-চতুর্থাংশ শস্য এবং বাকি এক-চতুর্থাংশ ডাল রাখা।


























