মেয়াদের শেষে ট্রাম্পের বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনা
- আপডেট সময় : ০৮:১৪:৩০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে
মার্কিন প্রেসিডেন্টের মেয়াদের শেষ দুই বছরে যখন কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হাতছাড়া হয়, জনপ্রিয়তা হ্রাস পায় এবং নিজ দল নতুন নেতৃত্বের সন্ধানে ব্যস্ত থাকে, তখন ওভাল অফিসের ক্ষমতার কেন্দ্রে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে আসে। বিশেষ করে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দ্বিদলীয় ঐকমত্যের অভাব অভ্যন্তরীণ আইন প্রণয়নের পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ করে দিয়েছে। তবে ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মেয়াদের অন্তিম সময়ে প্রেসিডেন্টরা নিজেদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে বিশ্বের ওপর প্রভাব খাটানোর দিকে বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে দ্বিদলীয় সহযোগিতার ছিটেফোঁটাও না থাকা এই যুগে অভ্যন্তরীণ আইন প্রণয়নের কাজ সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে। এই তিন নেতারই মূল লক্ষ্য বিশ্বের পরিচালনাব্যবস্থাকে বদলে দেওয়া, মূলত সমগ্র বিশ্বকে নিজ নিজ প্রভাববলয়ে বিভক্ত করে ফেলা। দুই বছর ধরে আমরা পশ্চিমা বিশ্বের পতন নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি, আর এ মুহূর্ত যেন সেই সব ভয়কেই বাস্তবে রূপ দেওয়ার মতো এক সন্ধিক্ষণ।
ইতিহাসের নজির হিসেবে ১৯৯২ সালের কথা উল্লেখ করা যায়। প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ তাঁর মেয়াদের শেষ সপ্তাহে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় সোমালিয়ায় ২৮ হাজার মার্কিন সেনা পাঠিয়েছিলেন। অন্যদিকে বিল ক্লিনটন চেষ্টা করেছিলেন ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিরসনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে, যদিও সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। একইভাবে বারাক ওবামা মেয়াদের শেষ লগ্নে কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এবং ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদনের মতো ঐতিহাসিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। বিল ক্লিনটনের ক্ষেত্রে তা ছিল ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত অবসানের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার একটি একনিষ্ঠ কিন্তু ব্যর্থ প্রচেষ্টা। মধ্যপ্রাচ্যে এক দায়িত্বজ্ঞানহীন যুদ্ধ এবং ইউরোপে তোষণনীতির পাশাপাশি মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা, যা ট্রাম্প তাঁর মেয়াদের শেষ বছরগুলোতে নির্মমভাবে ত্বরান্বিত করবেন। বুশ হয়তো দাবি করতে পারেন যে সোমালিয়ায় তাঁর প্রাথমিক হস্তক্ষেপ দুর্ভিক্ষ লাঘব করেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা চরম অপমানে গিয়ে ঠেকেছিল। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় ছিল, দলিলটিতে যা লেখা হয়নি তা। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের অংশে এটি কীভাবে শুরু হয়েছিল, তার কোনো উল্লেখ ছিল না, কিংবা পুতিনকে পরাজিত করা উচিত বলেও কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি; বরং যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ইউরোপ ও রাশিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক পুনর্গঠনে সহায়তা করতে পারে, সেদিকেই নজর দেওয়া হয়েছিল। পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় গণতন্ত্রের প্রতি মার্কিন সমর্থনকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অনধিকার চর্চা’ হিসেবে দেখে এসেছেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর মেয়াদের ঠিক এমন এক পড়ন্ত বিকেলে বা গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়ে আছেন। মাত্র ১০ দিনের মধ্যে তিনি ক্ষমতা হস্তান্তরের পূর্ববর্তী চরম অস্থির সময়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের নিয়ন্ত্রণ হারানো তাঁর জন্য প্রায় নিশ্চিত, আর ডেমোক্রেটিক নিয়ন্ত্রিত সিনেটের মুখোমুখি হওয়া তাঁর জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। অভ্যন্তরীণ নীতি বাস্তবায়নের পথ বন্ধ হওয়ায় তাঁকে এখন বিভিন্ন তদন্তের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা তাঁকে অভিশংসনের ঝুঁকিতে ফেলেছে। অভ্যন্তরীণ নীতি পাসের যেকোনো আশা একেবারেই মিলিয়ে যাবে।
তবে বিশ্বমঞ্চে ট্রাম্পের উদ্দেশ্যগুলো পূর্বসূরিদের চেয়ে ভিন্ন ও অধিকতর জটিল। তাঁর প্রথম দুই বছরের বিপর্যয় কাটিয়ে শেষ দুই বছরে তিনি আরও আগ্রাসী ভূমিকা নিতে পারেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষে ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন করে কোনো সামরিক সংঘাতের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। এরই মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়া শুরু হয়েছে এবং ওই অঞ্চল থেকে মার্কিন কূটনীতিকদের সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে বামমুখী হাওয়া। অপর দিকে ইউক্রেনকে রাশিয়ার হাতে বিকিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াও পুরোদমে চলছে।
ইউক্রেন ইস্যুতেও ট্রাম্পের অবস্থান বেশ স্পষ্ট। রাশিয়ার প্রতি তাঁর নমনীয় আচরণ এবং ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার যুক্তিকে সমর্থন জানানো বিশ্বব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। আগামী মাসে চীনে সি চিন পিং, পুতিন এবং ট্রাম্পের মধ্যে একটি শীর্ষ সম্মেলনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এমন একটি নজিরবিহীন সম্মেলন যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বিশ্বব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে প্রভাববলয়ে বিভক্ত করে ফেলতে পারে। গত সপ্তাহেই ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছেন, ‘রাশিয়া সত্যি বলতে ইউক্রেন ইস্যুতে ঠিকই আছে।’। একটি মাত্র শীর্ষ সম্মেলন একটি ধারণাকে হয়তো রাতারাতি বাস্তবে রূপ দেবে না, তবে এটি আমাদের এক অত্যন্ত বিপজ্জনক পথের দিকে ঠেলে দেবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে বরাবরই ইউরোপীয় ও এশীয় মিত্রদের সমালোচনা করা হয়েছে, অথচ চীন ও রাশিয়ার প্রতি নমনীয়তা লক্ষণীয়। তাইওয়ানের নিরাপত্তার কথা বললেও দলিলগুলোতে চীনের নাম এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। পুতিনের দীর্ঘদিনের লক্ষ্য ছিল পূর্ব ইউরোপে মার্কিন প্রভাব কমিয়ে আনা, আর ট্রাম্পের বর্তমান নীতিতে তিনি সেই সুযোগই দেখছেন। একদিকে ট্রাম্পের রাশিয়া প্রীতি এবং অন্যদিকে সি চিন পিংয়ের সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষা বিশ্ব ভূরাজনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সেখানে রাশিয়া ও চীন দুই দেশই সরাসরি সমালোচনা থেকে রক্ষা পেয়েছিল। উল্টো নথির অন্যত্র চীনের প্রশংসা করে বলা হয়েছে।
বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত সাপ্লাই চেইন নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ে এই তিন দেশের জোট ইউরোপ ও বিশ্বের অপরাপর দেশগুলোকে চাপের মুখে ফেলতে পারে। যদিও ন্যাটো, জি-৭ এবং জি-২০ সম্মেলনগুলো এখনো টিকে আছে, তবুও মার্কিন অর্থনীতির প্রবীণ বিশ্লেষক মার্ক কার্নির ভাষায়, স্নাযয়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা এখন এক মহাবিপর্যয়ের সম্মুখীন। সবাই এখন কেবল ট্রাম্পের মেয়াদের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি দেখার প্রতীক্ষায় আছে। মার্কিন অর্থনীতিবিদ মার্ক কার্নি বিশ্বব্যবস্থার এক ‘মহাবিপর্যয়ের’ কথা বলেছেন এবং সতর্ক করেছেন যে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী পুরোনো বিশ্ব আর ফিরে আসবে না।
পরিশেষে, প্রেসিডেন্টদের মেয়াদের শেষ দিনগুলোতে নেওয়া বৈদেশিক নীতিগুলো সবসময় কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনে না।
এহুদ বারাক ও ইয়াসির আরাফাতকে নিয়ে ক্লিনটনের ক্যাম্প ডেভিড আলোচনা বা বুশের সোমালিয়া মিশন—এ সবই শেষ পর্যন্ত অপূর্ণতা বা বিতর্কিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি ভিন্ন হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।
একজন ৮০ বছর বয়সী ‘খোঁড়া হাঁস’ বা ক্ষমতাচ্যুতপ্রায় নেতা হিসেবে তিনি এখন দুর্নীতিসহ বিভিন্ন বিশৃঙ্খল তদন্তের মুখে কোণঠাসা। একজন ৮০ বছর বয়সী ‘খোঁড়া হাঁস’ নেতা, যাঁর কোনো আইন পাস করার ক্ষমতা নেই এবং যিনি তাঁর কথিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে অন্তত দুই বছরের বিশৃঙ্খল তদন্তের মুখে কোণঠাসা হয়ে কোনোমতে শেষ রেখা অতিক্রম করার প্রহর গুনছেন। তাঁর বিপরীতে বসে থাকবেন ১৯৭০-এর দশকের শুরুর দিকের দুজন কর্তৃত্ববাদী শাসক, যাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁদের আরও দুই দশক দেশ শাসন করার পথে একমাত্র বাধা হতে পারে স্বয়ং মৃত্যু।
এমন পরিস্থিতিতে তাঁর গৃহীত যেকোনো সিদ্ধান্ত কেবল মার্কিন রাজনীতি নয়, বরং পুরো বিশ্বের স্থিতিশীলতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।






















