ঢাকা ১০:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

মাথাপিছু আয়ের রেকর্ড কেন ছুঁতে পারছে না সাধারণ মানুষ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:১২:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ৬৯ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশ এখন আনুষ্ঠানিকভাবে মাথাপিছু তিন হাজার ডলার আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই আয় প্রথমবারের মতো ৩ হাজার ২০ ডলারে পৌঁছেছে। তবে প্রবৃদ্ধি হিসাবের সংশোধিত তথ্য ও বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, অর্থনৈতিক গতিপথ কিছুটা শ্লথ। যেখানে শুরুতে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল, সেখানে তা বর্তমানে ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশে নেমে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশের ঘরে আটকে থাকতে পারে। গড় আয়ের এই উল্লম্ফন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আনতে পারছে না, বরং ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া ও মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। এ যেন এক উল্টোপাল্টা খেলা—মাথাপিছু আয় বাড়ে, অথচ দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও বাড়ে; প্রবৃদ্ধি থমকে যায়, অথচ রাষ্ট্রের ঋণ থামে না। আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে, আর জিডিপি প্রবৃদ্ধি নামতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশে। জুনে বিদ্যুতের খুচরা দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেড়ে ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা ৬৩ পয়সা হয়েছে; অক্টোবরে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দামও বেড়েছে। খেটে খাওয়া মানুষ সেই ধাক্কা সামলান পাত ছোট করে, সঞ্চয় ভেঙে, ধারদেনা করে। পাশাপাশি ক্রমাগত ভারী হচ্ছে রাষ্ট্রের ঋণও। শর্ত নিয়ে দর-কষাকষি যেকোনো দেশের সার্বভৌম অধিকার, সেই চর্চাই এখন চলছে। প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের তিনটি মানদণ্ড—মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক পূরণ করে। ৫০১ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে আট বছরে দ্বিগুণ করতে হলে ডলারের হিসাবে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৯ শতাংশ হারে বাড়তে হবে, অথচ প্রকৃত প্রবৃদ্ধি এখন ৪ শতাংশের নিচে।

দারিদ্র্যের চিত্রটি উন্নয়নের এই বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করছে। ২০১৬ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০২২ সালে কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছিল। একে দেড় দশকের বড় অর্জন হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টানা চার বছর দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২০২৬ সালে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। শুধু গত অর্থবছরই প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন, যার বড় কারণ দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা। এর মধ্যে দেশের ৬২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ এখনো সরকারি সামাজিক সুরক্ষার আওতাভুক্ত হতে পারেনি। কিন্তু বাজারের থলে হাতে দাঁড়িয়ে থাকা গৃহিণী কিংবা দিন শেষে মজুরি গুনতে থাকা নির্মাণশ্রমিকের কাছে এই অঙ্কের কোনো অর্থ নেই। এত বিপুল অর্থ আটকে থাকায় ব্যাংক নতুন উদ্যোক্তাকে ঋণ দিতে পারছে না; বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নামার পেছনে এটিও বড় কারণ।

কাজের বাজারেও অস্থিরতা স্পষ্ট। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন বলছে, দেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের সংখ্যা ২০ লাখ ৩২ হাজার, যা মোট বেকারের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ। এছাড়া উচ্চশিক্ষিত বেকার রয়েছেন ৮ লাখ ৮৫ হাজার। শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণও ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে, যার ১৭০টিই বস্ত্র ও পোশাক খাতের। উদ্যোক্তাদের হিসাবমতে, পোশাক খাতেই কাজ হারিয়েছেন প্রায় দেড় লাখ মানুষ। কাজের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দামের চাপ।

পণ্যের দামের তুলনায় আয় না বাড়ায় জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী। সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ থাকলেও মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। জ্বালানি তেলের দামের তিন দফা সমন্বয় করা হয়েছে সাত মাসে, যার ফলে ডিজেল লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রল ১৬০ ও অকটেন ১৬৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বিপিসির মার্চ থেকে আগস্ট মাসের লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা হলেও, এর প্রভাব গিয়ে পড়েছে পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। সরকারের যুক্তি, বিশ্ববাজারে দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও দেশে পুরো সমন্বয় করা হয়নি; তারপরও মার্চ-আগস্টে বিপিসির লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। কিন্তু জ্বালানির বাড়তি খরচ সেচ আর পরিবহন হয়ে শেষ পর্যন্ত গিয়ে বসে চাল, ডাল, সবজি আর মাছের দামে।

অর্থনীতির সংকট ব্যাংক খাতেও গভীর। জুন ২০২৬ পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বা ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। সরকারি ঋণের বোঝা ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্নকে জটিল করে তুলছে। ২০২৪ সালের জুনে সরকারের মোট ঋণ ছিল ১৮ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা, যা বর্তমান সরকারের সাড়ে সাত মাসে প্রায় ৭৯ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ এবং পূর্ববর্তী সময়ের হিসাবসহ ২৩ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। চলতি বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধেই ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে অর্থনীতির গভীরতম ক্ষতটি ব্যাংক খাতে।

উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এখন অপরিহার্য। আইএমএফের ৫৫০ কোটি ডলারের কর্মসূচির আওতায় ৩৬৪ কোটি ডলার পাওয়া গেছে এবং নতুন কর্মসূচির জন্য আলোচনা চলছে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হলেও, এই অতিরিক্ত সময়কে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ব্যবহার করা জরুরি। প্রতি বছর ৯ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি ছাড়া ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানো কঠিন চ্যালেঞ্জ। ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি যে কারণে অবাস্তব নয়। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার পথে বাধা কোথায়। সরকারের অনুরোধে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি) ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানোর সুপারিশ করেছে; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে সাধারণ পরিষদের চলতি অধিবেশনে। ২০২১ সালে দ্বিতীয়বার মানদণ্ড পূরণের পর সিডিপি উত্তরণের সুপারিশ করে। তবে করোনা মহামারির প্রেক্ষাপটে সাধারণ তিন বছরের বদলে পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল দিয়ে ২০২৬ সালকে উত্তরণের সময় নির্ধারণ করা হয়। এই সময় যদি সংস্কার, উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা বাড়াতে কাজে না লাগে—যদি নিম্নমধ্যম আয়ের বৃত্ত ভেঙে উচ্চমধ্যম আয় ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির পথে সত্যিকারের যাত্রা শুরু না হয়; তবে তিন বছর পর একই সংকট আরও বড় হয়ে ফিরবে।

প্রতিবেশী ভারতের ন্যায়সংকট থাকা সত্ত্বেও প্রথম প্রান্তিকে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৪ শতাংশের আশেপাশে রাখার মতো উদাহরণ সামনে রয়েছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ স্থবিরতা, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা এবং কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে হবে। সমাধান হিসেবে জ্বালানির জন্য স্বয়ংক্রিয় মূল্যসূত্র প্রবর্তন, বাজার ও পরিবহনে অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবনে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। পরিবার কার্ড ও নগদ সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে আরও সাড়ে ২৮ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে তোলার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তাঁরা কষছেন অন্য হিসাব—আয় যতটুকু বাড়ছে, খরচ বাড়ছে তার চেয়ে দ্রুত। কিন্তু মনে রাখা দরকার, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির বাজেট সহায়তা অনেকাংশে আইএমএফের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

মাথাপিছু আয়ের রেকর্ড কেন ছুঁতে পারছে না সাধারণ মানুষ

আপডেট সময় : ০৮:১২:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশ এখন আনুষ্ঠানিকভাবে মাথাপিছু তিন হাজার ডলার আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই আয় প্রথমবারের মতো ৩ হাজার ২০ ডলারে পৌঁছেছে। তবে প্রবৃদ্ধি হিসাবের সংশোধিত তথ্য ও বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, অর্থনৈতিক গতিপথ কিছুটা শ্লথ। যেখানে শুরুতে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল, সেখানে তা বর্তমানে ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশে নেমে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশের ঘরে আটকে থাকতে পারে। গড় আয়ের এই উল্লম্ফন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আনতে পারছে না, বরং ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া ও মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। এ যেন এক উল্টোপাল্টা খেলা—মাথাপিছু আয় বাড়ে, অথচ দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও বাড়ে; প্রবৃদ্ধি থমকে যায়, অথচ রাষ্ট্রের ঋণ থামে না। আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে উঠতে পারে, আর জিডিপি প্রবৃদ্ধি নামতে পারে ৩ দশমিক ২ শতাংশে। জুনে বিদ্যুতের খুচরা দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেড়ে ইউনিটপ্রতি ১০ টাকা ৬৩ পয়সা হয়েছে; অক্টোবরে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দামও বেড়েছে। খেটে খাওয়া মানুষ সেই ধাক্কা সামলান পাত ছোট করে, সঞ্চয় ভেঙে, ধারদেনা করে। পাশাপাশি ক্রমাগত ভারী হচ্ছে রাষ্ট্রের ঋণও। শর্ত নিয়ে দর-কষাকষি যেকোনো দেশের সার্বভৌম অধিকার, সেই চর্চাই এখন চলছে। প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের তিনটি মানদণ্ড—মাথাপিছু জাতীয় আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি সূচক পূরণ করে। ৫০১ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিকে আট বছরে দ্বিগুণ করতে হলে ডলারের হিসাবে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৯ শতাংশ হারে বাড়তে হবে, অথচ প্রকৃত প্রবৃদ্ধি এখন ৪ শতাংশের নিচে।

দারিদ্র্যের চিত্রটি উন্নয়নের এই বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করছে। ২০১৬ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০২২ সালে কমে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে এসেছিল। একে দেড় দশকের বড় অর্জন হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টানা চার বছর দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২০২৬ সালে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। শুধু গত অর্থবছরই প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন, যার বড় কারণ দৈনিক ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা। এর মধ্যে দেশের ৬২ শতাংশ দরিদ্র মানুষ এখনো সরকারি সামাজিক সুরক্ষার আওতাভুক্ত হতে পারেনি। কিন্তু বাজারের থলে হাতে দাঁড়িয়ে থাকা গৃহিণী কিংবা দিন শেষে মজুরি গুনতে থাকা নির্মাণশ্রমিকের কাছে এই অঙ্কের কোনো অর্থ নেই। এত বিপুল অর্থ আটকে থাকায় ব্যাংক নতুন উদ্যোক্তাকে ঋণ দিতে পারছে না; বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নামার পেছনে এটিও বড় কারণ।

কাজের বাজারেও অস্থিরতা স্পষ্ট। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন বলছে, দেশে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের সংখ্যা ২০ লাখ ৩২ হাজার, যা মোট বেকারের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ। এছাড়া উচ্চশিক্ষিত বেকার রয়েছেন ৮ লাখ ৮৫ হাজার। শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণও ২০২২ সালের ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে বর্তমানে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে নেমে এসেছে। শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দুই বছরে ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে, যার ১৭০টিই বস্ত্র ও পোশাক খাতের। উদ্যোক্তাদের হিসাবমতে, পোশাক খাতেই কাজ হারিয়েছেন প্রায় দেড় লাখ মানুষ। কাজের সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দামের চাপ।

পণ্যের দামের তুলনায় আয় না বাড়ায় জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী। সেপ্টেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ থাকলেও মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। জ্বালানি তেলের দামের তিন দফা সমন্বয় করা হয়েছে সাত মাসে, যার ফলে ডিজেল লিটারপ্রতি ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রল ১৬০ ও অকটেন ১৬৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বিপিসির মার্চ থেকে আগস্ট মাসের লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা হলেও, এর প্রভাব গিয়ে পড়েছে পরিবহন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। সরকারের যুক্তি, বিশ্ববাজারে দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও দেশে পুরো সমন্বয় করা হয়নি; তারপরও মার্চ-আগস্টে বিপিসির লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা। কিন্তু জ্বালানির বাড়তি খরচ সেচ আর পরিবহন হয়ে শেষ পর্যন্ত গিয়ে বসে চাল, ডাল, সবজি আর মাছের দামে।

অর্থনীতির সংকট ব্যাংক খাতেও গভীর। জুন ২০২৬ পর্যন্ত বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বা ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। সরকারি ঋণের বোঝা ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্নকে জটিল করে তুলছে। ২০২৪ সালের জুনে সরকারের মোট ঋণ ছিল ১৮ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা, যা বর্তমান সরকারের সাড়ে সাত মাসে প্রায় ৭৯ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ এবং পূর্ববর্তী সময়ের হিসাবসহ ২৩ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। চলতি বাজেটে শুধু সুদ পরিশোধেই ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে অর্থনীতির গভীরতম ক্ষতটি ব্যাংক খাতে।

উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্ক এবং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এখন অপরিহার্য। আইএমএফের ৫৫০ কোটি ডলারের কর্মসূচির আওতায় ৩৬৪ কোটি ডলার পাওয়া গেছে এবং নতুন কর্মসূচির জন্য আলোচনা চলছে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের সময়সীমা ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হলেও, এই অতিরিক্ত সময়কে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ব্যবহার করা জরুরি। প্রতি বছর ৯ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি ছাড়া ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানো কঠিন চ্যালেঞ্জ। ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি যে কারণে অবাস্তব নয়। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার পথে বাধা কোথায়। সরকারের অনুরোধে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি) ২০২৯ সাল পর্যন্ত সময় বাড়ানোর সুপারিশ করেছে; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে সাধারণ পরিষদের চলতি অধিবেশনে। ২০২১ সালে দ্বিতীয়বার মানদণ্ড পূরণের পর সিডিপি উত্তরণের সুপারিশ করে। তবে করোনা মহামারির প্রেক্ষাপটে সাধারণ তিন বছরের বদলে পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল দিয়ে ২০২৬ সালকে উত্তরণের সময় নির্ধারণ করা হয়। এই সময় যদি সংস্কার, উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা বাড়াতে কাজে না লাগে—যদি নিম্নমধ্যম আয়ের বৃত্ত ভেঙে উচ্চমধ্যম আয় ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির পথে সত্যিকারের যাত্রা শুরু না হয়; তবে তিন বছর পর একই সংকট আরও বড় হয়ে ফিরবে।

প্রতিবেশী ভারতের ন্যায়সংকট থাকা সত্ত্বেও প্রথম প্রান্তিকে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৪ শতাংশের আশেপাশে রাখার মতো উদাহরণ সামনে রয়েছে। বাংলাদেশে বিনিয়োগ স্থবিরতা, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা এবং কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে হবে। সমাধান হিসেবে জ্বালানির জন্য স্বয়ংক্রিয় মূল্যসূত্র প্রবর্তন, বাজার ও পরিবহনে অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং বন্ধ কারখানা পুনরুজ্জীবনে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। পরিবার কার্ড ও নগদ সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে আরও সাড়ে ২৮ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে তোলার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তাঁরা কষছেন অন্য হিসাব—আয় যতটুকু বাড়ছে, খরচ বাড়ছে তার চেয়ে দ্রুত। কিন্তু মনে রাখা দরকার, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির বাজেট সহায়তা অনেকাংশে আইএমএফের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।