রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র দুর্বল, নেতৃত্বে পরিবারতন্ত্র: টিআইবি
- আপডেট সময় : ০৪:৫৮:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে
দেশের ১০টি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে পরিবারতন্ত্রের প্রভাব এবং দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে একক ব্যক্তির প্রাধান্য বিদ্যমান বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক এক গবেষণায় এই তথ্য তুলে ধরেছে। গত রোববার ধানমন্ডিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। গবেষণায় ৪২টি দলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ৩২টি দলের তথ্য পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ), বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাগপা ও বাংলাদেশ জাস্টিস পার্টির নেতৃত্বে পরিবারতন্ত্রের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি শেখ হাসিনা সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দলীয় নেতৃত্বে ছিলেন। টিআইবি জানায়, ১২টি দলের প্রধান অন্তত এক দশক ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ছাড়া আর কোনো দলের গঠনতন্ত্রে দলীয় প্রধানের মেয়াদের কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই। ১২টি দলের প্রধান অন্তত ১০ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন।
দলগুলোর সর্বোচ্চ ফোরাম হিসেবে কাউন্সিলে নিয়ম থাকলেও বাস্তবে ১৬টি দলের কাউন্সিল অনিয়মিত। নেতৃত্ব নির্বাচনে গোপন ব্যালটের বদলে কণ্ঠভোটের চর্চা এবং পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তের অনুমোদনের প্রবণতা দেখা গেছে। একমাত্র সিপিবি ও আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিতেই শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী দেখা গেছে। একই সঙ্গে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে তৃণমূলের প্রস্তাব উপেক্ষা করে দলীয় প্রধানের মতের গুরুত্ব বেশি দেওয়া হয়। বিশেষ করে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে বড় ধরনের মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। নেতৃত্ব নির্বাচনে সাংগঠনিক দক্ষতার চেয়ে পরিবার, অর্থ ও তারকাখ্যাতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এসব কাউন্সিলে অনেক ক্ষেত্রে আগে থেকে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুমোদন করা হয়।
নারীর অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মাত্র দুটি দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ৩৩ শতাংশ বা তার বেশি নারী সদস্য রয়েছে। এমনকি জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় কমিটিতে কোনো নারী প্রতিনিধি নেই। এছাড়া নেতা-কর্মীদের আচরণবিধি, নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের তদন্তে আপিল প্রক্রিয়ার অভাবও দলগুলোকে দুর্বল করে তুলেছে। একই সঙ্গে আর্থিক স্বচ্ছতা, বার্ষিক বাজেট ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও টিআইবি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়েও প্রতিবেদনে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭৪৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৪৬ হাজার ৩৫১ জন আহত হয়েছেন। টিআইবি এ পরিস্থিতি উত্তরণে দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আনা, স্বচ্ছ আর্থিক হিসাব প্রকাশ, নিয়মিত কাউন্সিল আয়োজন এবং অপরাধী সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। সংস্থাটির মতে, দলের অভ্যন্তরীণ সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে প্রকৃত গণতান্ত্রিক চর্চা প্রতিষ্ঠা এবং জনআস্থা অর্জন করা সম্ভব হবে না। টিআইবির গবেষণায় উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৪ হাজার ২৮০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৭৪৬ জন নিহত এবং ৪৬ হাজার ৩৫১ জন আহত হয়েছেন।
























