নেতানিয়াহুর বিকল্প গাদি আইজেনকট: ইসরাইলের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ
- আপডেট সময় : ০৬:৫৮:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
ইসরাইলের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন গাদি আইজেনকট। দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা থেকে আগত ইহুদি ভোটাররা ঐতিহ্যগতভাবে লিকুদ পার্টির সমর্থক ছিলেন, তবে আইজেনকটের উত্থান এই সমীকরণ বদলে দিতে পারে। ৬৬ বছর বয়সী আইজেনকট মরক্কো থেকে আসা অভিবাসী পরিবারের সন্তান। তিনি বেড়ে উঠেছেন তিবেরিয়াস ও ইলাত শহরে, যা দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে কিছুটা দূরে। নেতানিয়াহুর অভিজাত জেরুজালেমকেন্দ্রিক জীবন ও ক্ষমতার রাজনীতির বিপরীতে তার এই ভিন্নধর্মী পটভূমি ভোটারদের কাছে একটি বড় আকর্ষণ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। দেশটির ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনে অনেক ভোটারের কাছে এই পরিচয়টুকুই যথেষ্ট হতে পারে। তার জীবনকাহিনি নেতানিয়াহুর অভিজাত জেরুজালেমে বেড়ে ওঠা এবং ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিজ্ঞতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আইজেনকট নির্বাচনে জয়ী হলে সেটিই হবে প্রথম ঘটনা। তত দিনে যুদ্ধের ভয়াবহ মূল্য দিতে হয়েছে আইজেনকটের পরিবারকেও। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাকে সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করেন-এমন প্রশ্নেও জরিপে নেতানিয়াহুর চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন আইজেনকট।
আইজেনকটের রাজনৈতিক পরিচয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইসরাইলের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো মিজরাহি ইহুদি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পাননি। যদিও তিনি নিজে খুব কমই জাতিগত পরিচয়ের বিষয়টি সামনে আনেন, তবে জনমত জরিপে তার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে তিনি বিরোধী শিবিরের প্রধান মুখ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সামরিক বাহিনীর দীর্ঘ ক্যারিয়ার শেষে রাজনীতির ময়দানে আসা আইজেনকট ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরাইলি সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সে সময় নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী থাকলেও, হেবরনের বিতর্কিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনার সময় আইজেনকট সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা রক্ষায় কঠোর অবস্থানে ছিলেন, যা তার দৃঢ়তার পরিচয় দেয়। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, এই পরিচয়ই তার জনপ্রিয়তার একটি কারণ। জীবনের অধিকাংশ সময় ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে (আইডিএফ) কাটানোর পর রাজনীতিতে এসেছেন তুলনামূলক দেরিতে। প্রায় ৪০ বছরের সামরিক জীবনে ধাপে ধাপে উন্নীত হয়ে ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইসরাইলি সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ বা প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে হেবরনে আহত এক ফিলিস্তিনি হামলাকারীকে গুলি করে হত্যা করেন ইসরাইলি সেনা সার্জেন্ট এলর আজারিয়া। কিন্তু আইজেনকট সামরিক তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার পক্ষে অবস্থান নেন। নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও দায়িত্বের কেন্দ্রে এই অঙ্গীকারকেই রেখেছেন তিনি।
২০২২ সালে বেনি গান্তজের সঙ্গে রাজনীতিতে পা রাখা আইজেনকট ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর যুদ্ধকালীন জরুরি মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। তবে যুদ্ধপরবর্তী কৌশল নিয়ে মতবিরোধের কারণে ২০২৪ সালের জুনে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে সরে আসেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি শোকের ছায়ায় থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গীকার থেকে সরেননি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজায় যুদ্ধে তার ২৫ বছর বয়সী ছেলে গাল আইজেনকট নিহত হন, এছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে তার দুই ভাতিজাও প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তিনি এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, ছেলের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের এই মূল্য বিফলে না যাওয়ার শপথ করেছিলেন, যা বর্তমানে তার রাজনৈতিক মূলমন্ত্র। ১৯৭৮ সালে তিনি আইডিএফের গোলানি ব্রিগেডে যোগ দেন। ২০২২ সালে আরেক সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গান্তজের সঙ্গে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন আইজেনকট। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে সুস্পষ্ট কৌশল না থাকার অভিযোগ তুলে ২০২৪ সালের জুনে তারা মন্ত্রিসভা ছাড়েন। ২০২৬ সালের এপ্রিলে ইসরাইলি সংবাদপত্র ইয়েদিওথ আহরোনোথে লেখা এক নিবন্ধে আইজেনকট লিখেছিলেন, ‘গালের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আমি শপথ করেছিলাম, সে এবং তার বন্ধুরা-যাদের সে চিনত, আবার যাদের চিনত না-যে মূল্য দিয়েছে, তা বৃথা যেতে দেব না।
নির্বাচনী লড়াইয়ে জনমত জরিপ অনুযায়ী, আইজেনকটের ‘ইয়াশার’ পার্টি নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে ২০ থেকে ২৩টি আসন পেতে পারে, যা নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকেও ছাপিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রাখে। হিব্রু শব্দ ‘ইয়াশার’-এর অর্থ ‘সোজা’ বা ‘সঠিক পথ’, যা মূলত জিম্মি এলি শারাবির একটি বক্তব্য থেকে অনুপ্রাণিত। তবে ইসরাইলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জোট গঠন অত্যন্ত জটিল। জরিপের ইঙ্গিত বলছে, নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোট কিংবা বিরোধী শিবির—কোনোটিই সহজে ৬১ আসনের ম্যাজিক সংখ্যায় পৌঁছাতে পারবে না, যার ফলে বড় ধরনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরির শঙ্কা রয়েছে। ডানপন্থি রাজনীতিকদের পাশাপাশি নেতানিয়াহুর দিক থেকেও চাপ ছিল। এখানেই শুরু হয় আসনসংখ্যার জটিল হিসাব। আইজেনকটের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ নির্ভর করছে বামপন্থি, ডানপন্থি ও মধ্যপন্থি দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার ওপর।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে নেতানিয়াহুর প্রতি স্পষ্ট সমর্থনের বিপরীতে আইজেনকটের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ট্রাম্প সম্প্রতি নেতানিয়াহুকে ‘মহান যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী’ আখ্যা দিয়ে তাকে সমর্থন না করাকে বড় ঝুঁকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক বারাক রাভিদ ট্রাম্পকে প্রশ্ন করেছিলেন অন্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজের সম্ভাবনা নিয়ে, যার উত্তরে ট্রাম্প সরাসরি কোনো নিশ্চয়তা না দিয়ে অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেন। আইজেনকটের জয় তাই কেবল ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কেও নতুন মেরুকরণ তৈরি করতে পারে।

























