করলেন: উত্তেজিত কংগ্রেস সভাপতি ‘মোদির বাপও যাবে’ বলে কেন
- আপডেট সময় : ০৩:৫৫:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে
বিহারের রাজধানী পাটনায় আয়োজিত এক জনসভায় মেজাজ হারিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ্য করে বিতর্কিত মন্তব্য করে বিপাকে পড়েছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। নীতিন নবীন বলেন, দেশের উন্নয়ন ও জনকল্যাণ নিয়ে কংগ্রেস ভাবে না। মোদিকে না সরিয়ে আমি মারা যাচ্ছি না: কংগ্রেস সভাপতি।
বিহারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শ্রীকৃষ্ণ সিংয়ের ১৩৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সভায় দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করার সময় খাড়গে প্রধানমন্ত্রীকে তীব্র আক্রমণ করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, নরেন্দ্র মোদি জনগণকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করছেন। তিনি নাকি বলেছিলেন, অত সহজে মোদি যাবেন না। কুকথার রাজনীতি ছাড়া তাদের আর কিছু অবশিষ্ট নেই। মোদি নিজেই তা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছিলেন।
তার দাবি, কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে এসআইআর প্রক্রিয়ায় কারচুপি করা ব্যক্তিদের জেলে পাঠানো হবে এবং মোদিকেও সেই তালিকায় রাখা হবে।
বক্তৃতার সময় সভা থেকে এক তরুণ ‘মোদি নেহি যায়েগা’ বলে চিৎকার করলে খাড়গে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। সাধারণত মৃদুভাষী নেতা হিসেবে পরিচিত খাড়গে তখন ওই তরুণের উদ্দেশে বলেন, ‘মোদি কা বাপ ভি যায়েগা’। উপস্থিত কংগ্রেস কর্মীরা ওই তরুণকে, যার নাম সন্তোষ কুমার, সভা থেকে বের করে দেন এবং তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। সন্তোষ গণমাধ্যমকে জানান, তিনি মূলত মোদির ক্ষমতাচ্যুতি এত সহজ নয় তা বোঝাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাকে ভুল বোঝা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ‘বাপ’ তুলে কথা বলার খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। নিজের ‘অনগ্রসর’ জাতের প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, কংগ্রেস তাঁকে জাত তুলে অসম্মান করেছে। ২০২৩ সালের কর্ণাটক বিধানসভার ভোটের প্রচারে মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেছিলেন, মোদি এক ‘বিষাক্ত সাপ’। ‘অগ্নিবীর’ বিতর্কের সময় বিহারের কংগ্রেস নেতা সুবোধকান্ত সহায় বলেছিলেন, একনায়ক মোদির মৃত্যু হবে হিটলারের মতোই। রাহুল সেই কথার রেশ টেনে বলেছিলেন, ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’। ২০২৩ সালের কর্ণাটক বিধানসভার ভোটের আগে বিজেপির তথ্যপ্রযুক্তি সেলের প্রধান অমিত মালভিয়া এক তালিকা প্রকাশ করেছিলেন।
এই মন্তব্যের পর দেশজুড়ে বিজেপির শীর্ষ নেতারা সোচ্চার হয়ে ওঠেন।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন, খাড়গে শালীনতার সব সীমা অতিক্রম করেছেন। অমিত শাহ লিখেছেন, ‘একের পর এক ভোটে হেরে কংগ্রেস হতাশা ও নৈরাশ্যে ডুবে গেছে।
তিনি কংগ্রেসের হতাশা ও গ্রহণযোগ্যতা হারানো নিয়ে প্রশ্ন তুলে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বের সমালোচনা করেন। বিজেপি সভাপতি নীতিন নবীনসহ দলের মুখপাত্র সম্বিত পাত্র ও সাবেক মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর এই বক্তব্যকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক রেষারেষি ও অশালীনতার নতুন উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাদের দাবি, প্রধানমন্ত্রী ও তার প্রয়াত মা-বাবাকে নিয়ে কংগ্রেসের এ ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণ নিন্দনীয় এবং খাড়গেকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। তারা নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে।’। প্রধানমন্ত্রীর মাকে নিয়ে তারা মশকরা করেছে, এবার প্রয়াত বাবাকেও টেনে আনল।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিরিরাজ সিং দাবি করেন, এসব গালিগালাজ দিয়ে মোদিকে সরানো সম্ভব নয় এবং তিনি আরও ৩০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। এছাড়া বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট সিং ও চিরাগ পাসোয়ানও এই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান। বিজেপির পক্ষ থেকে সোমবার ভারতের প্রতিটি রাজ্য ও জেলায় দলীয় কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। এদিকে কংগ্রেস অভিযোগ করেছে যে, বিজেপি ও আরএসএস তাদের সভায় পরিকল্পিতভাবে উসকানি দিতে লোক পাঠিয়েছে যাতে আলোচনার মূল বিষয়বস্তু থেকে মানুষের মনোযোগ সরানো যায়। কংগ্রেস যদিও বলেছে, তাদের সভায় লোক ঢুকিয়ে বিজেপি-আরএসএস গোলমালে প্ররোচনা দিচ্ছে।
ভারতীয় রাজনীতিতে এ ধরনের পাল্টাপাল্টি কুমন্তব্য নতুন নয়। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় থেকেই মোদি বিভিন্ন সময় বিরোধীদের আক্রমণের শিকার হয়েছেন। সোনিয়া গান্ধীর ২০০৭ সালের ‘মৌত কা সওদাগর’ মন্তব্য, মণিশংকর আয়ারের ‘নিচ আদমি’ সম্বোধন, দিগ্বিজয় সিংয়ের ‘রাবণ’ তুলনা এবং পি চিদম্বরমের ‘কম্পালসিভ লায়ার’ বা ‘এনকাউন্টার মুখ্যমন্ত্রী’ আখ্যা দেওয়া রাজনৈতিক উত্তাপের বড় নিদর্শন। একইভাবে রাহুল গান্ধীকে নিয়ে মোদি সরকার ও বিজেপি নেতাদের বিভিন্ন কটূক্তিও বেশ আলোচিত হয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে গমগমে রাজনৈতিক আবহে খাড়গের এই মন্তব্য এক অন্য মাত্রা জুড়েছে। ২০০৭ সালে গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের সময় কংগ্রেসনেত্রী সোনিয়া গান্ধী নেই বিশেষণই কিছুটা ঘুরিয়ে মোদিকে ‘মৌত কা সওদাগর’ বা ‘মৃত্যুর সওদাগর’ বলেছিলেন। ২০১৭ সালে মণিশংকর আয়ার মোদিকে ‘নিচ আদমি’ বা ‘নিচু মনের মানুষ’ বলেছিলেন। ২০১২ সালে কংগ্রেস নেতা দিগ্বিজয় সিং গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী মোদিকে ‘রাবণের’ সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, অহংকার ত্যাগ না করলে তাঁর দশাও রাবণের মতো হবে। ২০১৪ সালে কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম বলেছিলেন, মোদি একজন ‘কম্পালসিভ লায়ার’ বা অভ্যাসগত মিথ্যুক।
মোদি নিজেও বিভিন্ন জনসভায় দাবি করেছেন যে, গত ২০ বছর ধরে তিনি প্রতিদিন ‘গালি ডায়েট’ অনুসরণ করছেন এবং বিরোধীরা তাকে ৯১ বার অপমানসূচক মন্তব্য করেছে। এই গালমন্দই তার শক্তির উৎস বলে তিনি প্রচার করেন। ২০০৪ সালে সোনিয়া গান্ধীকে ‘জার্সি কাউ’ এবং রাহুল গান্ধীকে ‘হাইব্রিড বাছুর’ বলা থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত কংগ্রেস নেতাদের ‘চোরেদের সর্দার’ বা ‘বিষাক্ত সাপ’ বলে আখ্যা দেওয়া—সবই দুই দলের চরম তিক্ত সম্পর্কেরই বহিঃপ্রকাশ। এই চলমান অশালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে ভারতীয় গণতন্ত্রের শিষ্টাচার দিন দিন কলুষিত হচ্ছে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন। মোদিও বিভিন্ন জনসভায় বলতে শুরু করেন, দিনে তিনি ২ থেকে ৩ কেজি গালাগালি হজম করেন।

























