ঢাকা ১০:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়, ব্যাকফুটে ট্রাম্প

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৫:০৪:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিশাল জয় অর্জন করেছে ডেমোক্র্যাট পার্টি। রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও এই জয়ের ঢেউ পৌঁছে গেছে, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির প্রতি ভোটারদের স্পষ্ট প্রত্যাখ্যানের বার্তা দিচ্ছে। দুবার ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে পৌঁছে দেওয়া ভোটার জোটের সমর্থনে ফাটল ধরার বিষয়টিও এই নির্বাচনের ফলাফলে উন্মোচিত হয়েছে। রিপাবলিকানদের হটিয়ে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিল ডেমোক্র্যাটরা। কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি নিতে চায় ভারত। এতে দুর্নীতি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ আরো বেড়েছে। শিকাগোর সাবেক ডেমোক্র্যাট মেয়র ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত রাহম ইমানুয়েল বলেন, ‘সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো, মাগা-সমর্থক নন এমন রিপাবলিকানরা তাঁদের দল থেকে সরে এসেছেন। অথচ এসব উদ্যোগ নিয়ে ভোটারদের বিরক্তির লক্ষণ আগেই দেখা যাচ্ছিল। শাহজালালে পরিত্যক্ত বিমান ভাঙারি হিসেবে বিক্রির উদ্যোগ।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পুরো প্রচার পর্বেই ট্রাম্প ভোটারদের আহ্বান জানিয়েছিলেন যেন তাঁরা তাঁকেই ব্যালটে মনে করে ভোট দেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের হোয়াইট হাউসবিষয়ক প্রধান সংবাদদাতা পিটার বেকার তাঁর ‘হিস্টোরিক মিডটার্ম রাউট সার্ভস অ্যাজ আ সুইপিং রিপিউক অব ট্রাম্প এরা’ শীর্ষক বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধে জানান, চলতি শরতে ট্রাম্প অন্তত ৪৭ বার ভোটারদের প্রতি এই একই আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। ১৯৮৬ সাল থেকে মধ্যবর্তী নির্বাচন কভার করা এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের মতে, ট্রাম্পের এই কৌশল শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের জন্যই রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস বুধবার (৪ নভেম্বর) জানায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে ট্রাম্প ভোটারদের বারবার বলেছিলেন, ‘এমনভাবে ভোট দিন, যেন ব্যালটে আমার নাম আছে। এ বছর তাদের প্রধান পরিচয় ছিল ট্রাম্পবিরোধিতা।

প্রতিনিধি পরিষদের আসনগুলোতে জাতীয়ভাবে ডেমোক্র্যাটদের ভোটের ব্যবধান প্রায় ১৩ শতাংশ হতে পারে বলে বুধবার ভোর পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যানে জানা গেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালের পর কংগ্রেসে কোনো দল এত বড় ব্যবধানে জয় পায়নি। ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটনের সময়ে কিংবা ২০১০ সালে বারাক ওবামার মেয়াদে রিপাবলিকানরা যে জয় পেয়েছিল, এবারের ডেমোক্র্যাটদের জয়ের ব্যবধান তাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে নতুন ঊর্ধ্বগতি।

নির্বাচনের এমন ফল প্রসঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের রাজনৈতিক পরিচালক ডগলাস বি. সোসনিক বলেন, এটি মূলত ট্রাম্প, রিপাবলিকান পার্টি এবং গত দুই বছরে তাদের নেওয়া পদক্ষেপগুলোর প্রতি ভোটারদের চরম অনাস্থা ও প্রত্যাখ্যানের বহিঃপ্রকাশ। তাঁর মতে, এই নির্বাচনের পরদিন থেকেই মার্কিন রাজনীতি নতুন এক যুগে প্রবেশ করবে এবং আগামী দুই বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পূর্ববর্তী দুই বছর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধারা বা ট্রাম্পবাদ কিছুটা পিছু হটলেও আগামী দুই বছর প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা তাঁর হাতেই থাকছে।

তবে নির্বাচনের এই ভরাডুবির পরও ট্রাম্প নিজের অবস্থান সমর্থনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মঙ্গলবার রাতে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, এই পরাজয় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো রায় নয়। তিনি বলেন, ‘আমি তো ব্যালটে ছিলাম না। আর আমি ব্যালটে না থাকার কারণে পর্যাপ্ত মানুষকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি।’ তাঁর এই মন্তব্য অনেক রিপাবলিকান নেতার মধ্যেই বিরক্তি তৈরি করেছে, কারণ পুরো প্রচার যুদ্ধটাই চালানো হয়েছিল ট্রাম্পের নাম ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে কেন্দ্র করে। তাঁর কাছ থেকে দূরত্ব তৈরির সাহস অনেক রিপাবলিকান প্রার্থী দেখাতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘এর অর্থ এই নয় যে মাগা জোট ভেঙে পড়ছে। তবে ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ আছে, যখন এ ধরনের পরিবর্তন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

ভোটারদের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ক্ষমতায় থেকে বিপুল অর্থ উপার্জনের অভিযোগ। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউসিএলএ) অধ্যাপক লিন ভ্যাভরেক মনে করেন, অর্থনৈতিক সংকট এবং ট্রাম্পের শাসনকৌশলের প্রতি জন অসন্তোষই ডেমোক্র্যাটদের এই অভাবনীয় জয়ের পথ প্রশস্ত করেছে।

রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাস ও সাউথ ক্যারোলাইনায় ট্রাম্পের ব্যক্তিগত পছন্দের দুই সিনেট প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। ফলে দলে ট্রাম্পের একক হস্তক্ষেপের ক্ষতিকর দিকটি প্রকাশ্যে এসেছে। এ ছাড়া দশক শেষ হওয়ার আগেই প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান তৈরির যে চেষ্টা রিপাবলিকানরা করেছিল, তা-ও বাস্তবে বিপরীত ফল দিয়েছে। নিজেদের সুবিধামতো নির্বাচনী এলাকার সীমানা সাজিয়ে নেয়ায় এখন বিরোধী দলের পক্ষে অন্য দলের আসন কেড়ে নেয়া আগের চেয়ে কঠিন।

অনেক ভোটার জরিপকারীদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো এবং নতুন যুদ্ধ এড়ানোর যে প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তা তিনি রক্ষা করেননি। ওয়াশিংটনে নিজের পছন্দের ব্যয়বহুল নির্মাণ প্রকল্পগুলোর প্রতি ট্রাম্পের অতিরিক্ত আগ্রহ দেখেও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরক্তি তৈরি হয়েছিল, যা নির্বাচনের আগের দিনের শেষ ভাষণেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ট্রাম্প নিজেই এবারের নির্বাচনকে তাঁর শাসনামলের ওপর গণভোটের রূপ দিয়েছিলেন। পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা একজন বহিরাগত নেতার ওপর যারা একসময় আস্থা রেখেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এবার তাঁর দলকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর এই বক্তব্য শুনে অনেক রিপাবলিকানও বিরক্তি প্রকাশ করবেন। ভোক্তাদের খরচ বাড়িয়ে দেয়া শুল্কনীতির বিরুদ্ধেও তাঁদের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগ কমানোর পরিকল্পনার কথা বলার বদলে তিনি ওয়াশিংটনের রিফ্লেক্টিং পুলের সামনে দাঁড়িয়ে শেওলা ও পানির পাইপ নিয়ে কথা বলেন।

এত কিছুর পরও রক্ষণশীল সংগঠন ‘ক্লাব ফর গ্রোথ’-এর প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যাকিনটোশ মনে করেন, এই ফলেই ট্রাম্পের রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি শেষ হয়ে গেছে বলা যাবে না। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্পের সমালোচকেরা আগেও তাঁর রাজনৈতিক পতনের ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি বারবার ফিরে এসেছেন।’ তাঁর মতে, ২০২৮ সালের নির্বাচনে জিততে হলে রিপাবলিকানদের আবার দলের মূল নীতিগুলোতে ফেরত যেতে হবে।

মার্কিন রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ ধরনের বড় পরাজয়ের পর রাতারাতি কোনো দলের শেষ হয়ে যায় না। ১৯৭৪ সালে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর ডেমোক্র্যাটদের বিশাল জয়ের পরও মাত্র ছয় বছরের মাথায় রিপাবলিকানরা রোনাল্ড রেগানের নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। একইভাবে ১৯৯৪ ও ২০১০ সালের ধাক্কা সামলে ক্লিনটন ও ওবামা দুজনই পরবর্তী নির্বাচনে বিপুল ভোটে পুনর্বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের অভ্যন্তরীণ নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা জো গ্রোগান ট্রাম্পবাদের পক্ষ সমর্থন করে বলেন, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, রিপাবলিকান পার্টি আর আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না। ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার ঠিক আগে গ্রোগান জোর দিয়ে বলেন, ‘আজ রাতে যা-ই ঘটুক, আমরা এখনো ট্রাম্পের দলেই আছি। যারা মনে করছেন ট্রাম্পবাদের পতন ঘটবে, তারা ভুল ভাবছেন।’

তা সত্ত্বেও ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রিস্টিনা এম. গ্রিয়ার সতর্ক করে বলেছেন, এমন বড় বিপর্যয়ের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান, তা এখন দেখার বিষয়। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কিছুটা ভাটা পড়লেও অভিবাসন ও বৈচিত্র্যের মতো বিষয়ে তাঁর নীতি দলটির ওপর শক্ত প্রভাব রেখে যাবে, কারণ ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টিকে তাঁর নিজস্ব ছাঁচে নতুন করে গড়ে তুলেছেন। এক দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে আসা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। রিপাবলিকানদের হারে ইরান যুদ্ধের প্রভাব স্বীকার করলেন ট্রাম্প। এখন সেই সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হচ্ছে তাঁকে। তুলনামূলক বেশি জয়ের সম্ভাবনা থাকা প্রার্থীদের বাদ দিয়ে তিনি কেন প্যাক্সটন ও ডারলিন গ্রাহামকে বেছে নিয়েছিলেন, এখন সেই সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সৌদির সঙ্গে আলোচনা, বিদেশি সেনামুক্ত মধ্যপ্রাচ্য চায় ইরান।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়, ব্যাকফুটে ট্রাম্প

আপডেট সময় : ০৫:০৪:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিশাল জয় অর্জন করেছে ডেমোক্র্যাট পার্টি। রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অঙ্গরাজ্যগুলোতেও এই জয়ের ঢেউ পৌঁছে গেছে, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির প্রতি ভোটারদের স্পষ্ট প্রত্যাখ্যানের বার্তা দিচ্ছে। দুবার ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে পৌঁছে দেওয়া ভোটার জোটের সমর্থনে ফাটল ধরার বিষয়টিও এই নির্বাচনের ফলাফলে উন্মোচিত হয়েছে। রিপাবলিকানদের হটিয়ে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিল ডেমোক্র্যাটরা। কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি নিতে চায় ভারত। এতে দুর্নীতি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ আরো বেড়েছে। শিকাগোর সাবেক ডেমোক্র্যাট মেয়র ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত রাহম ইমানুয়েল বলেন, ‘সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো, মাগা-সমর্থক নন এমন রিপাবলিকানরা তাঁদের দল থেকে সরে এসেছেন। অথচ এসব উদ্যোগ নিয়ে ভোটারদের বিরক্তির লক্ষণ আগেই দেখা যাচ্ছিল। শাহজালালে পরিত্যক্ত বিমান ভাঙারি হিসেবে বিক্রির উদ্যোগ।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের পুরো প্রচার পর্বেই ট্রাম্প ভোটারদের আহ্বান জানিয়েছিলেন যেন তাঁরা তাঁকেই ব্যালটে মনে করে ভোট দেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের হোয়াইট হাউসবিষয়ক প্রধান সংবাদদাতা পিটার বেকার তাঁর ‘হিস্টোরিক মিডটার্ম রাউট সার্ভস অ্যাজ আ সুইপিং রিপিউক অব ট্রাম্প এরা’ শীর্ষক বিশ্লেষণমূলক নিবন্ধে জানান, চলতি শরতে ট্রাম্প অন্তত ৪৭ বার ভোটারদের প্রতি এই একই আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন। ১৯৮৬ সাল থেকে মধ্যবর্তী নির্বাচন কভার করা এই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের মতে, ট্রাম্পের এই কৌশল শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের জন্যই রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস বুধবার (৪ নভেম্বর) জানায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে ট্রাম্প ভোটারদের বারবার বলেছিলেন, ‘এমনভাবে ভোট দিন, যেন ব্যালটে আমার নাম আছে। এ বছর তাদের প্রধান পরিচয় ছিল ট্রাম্পবিরোধিতা।

প্রতিনিধি পরিষদের আসনগুলোতে জাতীয়ভাবে ডেমোক্র্যাটদের ভোটের ব্যবধান প্রায় ১৩ শতাংশ হতে পারে বলে বুধবার ভোর পর্যন্ত পাওয়া পরিসংখ্যানে জানা গেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালের পর কংগ্রেসে কোনো দল এত বড় ব্যবধানে জয় পায়নি। ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটনের সময়ে কিংবা ২০১০ সালে বারাক ওবামার মেয়াদে রিপাবলিকানরা যে জয় পেয়েছিল, এবারের ডেমোক্র্যাটদের জয়ের ব্যবধান তাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে নতুন ঊর্ধ্বগতি।

নির্বাচনের এমন ফল প্রসঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের রাজনৈতিক পরিচালক ডগলাস বি. সোসনিক বলেন, এটি মূলত ট্রাম্প, রিপাবলিকান পার্টি এবং গত দুই বছরে তাদের নেওয়া পদক্ষেপগুলোর প্রতি ভোটারদের চরম অনাস্থা ও প্রত্যাখ্যানের বহিঃপ্রকাশ। তাঁর মতে, এই নির্বাচনের পরদিন থেকেই মার্কিন রাজনীতি নতুন এক যুগে প্রবেশ করবে এবং আগামী দুই বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পূর্ববর্তী দুই বছর থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হবে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধারা বা ট্রাম্পবাদ কিছুটা পিছু হটলেও আগামী দুই বছর প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা তাঁর হাতেই থাকছে।

তবে নির্বাচনের এই ভরাডুবির পরও ট্রাম্প নিজের অবস্থান সমর্থনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। মঙ্গলবার রাতে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, এই পরাজয় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো রায় নয়। তিনি বলেন, ‘আমি তো ব্যালটে ছিলাম না। আর আমি ব্যালটে না থাকার কারণে পর্যাপ্ত মানুষকে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি।’ তাঁর এই মন্তব্য অনেক রিপাবলিকান নেতার মধ্যেই বিরক্তি তৈরি করেছে, কারণ পুরো প্রচার যুদ্ধটাই চালানো হয়েছিল ট্রাম্পের নাম ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে কেন্দ্র করে। তাঁর কাছ থেকে দূরত্ব তৈরির সাহস অনেক রিপাবলিকান প্রার্থী দেখাতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘এর অর্থ এই নয় যে মাগা জোট ভেঙে পড়ছে। তবে ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণ আছে, যখন এ ধরনের পরিবর্তন বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

ভোটারদের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করেছে জ্বালানির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এবং ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ক্ষমতায় থেকে বিপুল অর্থ উপার্জনের অভিযোগ। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউসিএলএ) অধ্যাপক লিন ভ্যাভরেক মনে করেন, অর্থনৈতিক সংকট এবং ট্রাম্পের শাসনকৌশলের প্রতি জন অসন্তোষই ডেমোক্র্যাটদের এই অভাবনীয় জয়ের পথ প্রশস্ত করেছে।

রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাস ও সাউথ ক্যারোলাইনায় ট্রাম্পের ব্যক্তিগত পছন্দের দুই সিনেট প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। ফলে দলে ট্রাম্পের একক হস্তক্ষেপের ক্ষতিকর দিকটি প্রকাশ্যে এসেছে। এ ছাড়া দশক শেষ হওয়ার আগেই প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান তৈরির যে চেষ্টা রিপাবলিকানরা করেছিল, তা-ও বাস্তবে বিপরীত ফল দিয়েছে। নিজেদের সুবিধামতো নির্বাচনী এলাকার সীমানা সাজিয়ে নেয়ায় এখন বিরোধী দলের পক্ষে অন্য দলের আসন কেড়ে নেয়া আগের চেয়ে কঠিন।

অনেক ভোটার জরিপকারীদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো এবং নতুন যুদ্ধ এড়ানোর যে প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তা তিনি রক্ষা করেননি। ওয়াশিংটনে নিজের পছন্দের ব্যয়বহুল নির্মাণ প্রকল্পগুলোর প্রতি ট্রাম্পের অতিরিক্ত আগ্রহ দেখেও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরক্তি তৈরি হয়েছিল, যা নির্বাচনের আগের দিনের শেষ ভাষণেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ট্রাম্প নিজেই এবারের নির্বাচনকে তাঁর শাসনামলের ওপর গণভোটের রূপ দিয়েছিলেন। পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা একজন বহিরাগত নেতার ওপর যারা একসময় আস্থা রেখেছিলেন, তাঁদের অনেকেই এবার তাঁর দলকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর এই বক্তব্য শুনে অনেক রিপাবলিকানও বিরক্তি প্রকাশ করবেন। ভোক্তাদের খরচ বাড়িয়ে দেয়া শুল্কনীতির বিরুদ্ধেও তাঁদের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগ কমানোর পরিকল্পনার কথা বলার বদলে তিনি ওয়াশিংটনের রিফ্লেক্টিং পুলের সামনে দাঁড়িয়ে শেওলা ও পানির পাইপ নিয়ে কথা বলেন।

এত কিছুর পরও রক্ষণশীল সংগঠন ‘ক্লাব ফর গ্রোথ’-এর প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যাকিনটোশ মনে করেন, এই ফলেই ট্রাম্পের রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি শেষ হয়ে গেছে বলা যাবে না। তিনি বলেন, ‘ট্রাম্পের সমালোচকেরা আগেও তাঁর রাজনৈতিক পতনের ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি বারবার ফিরে এসেছেন।’ তাঁর মতে, ২০২৮ সালের নির্বাচনে জিততে হলে রিপাবলিকানদের আবার দলের মূল নীতিগুলোতে ফেরত যেতে হবে।

মার্কিন রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এ ধরনের বড় পরাজয়ের পর রাতারাতি কোনো দলের শেষ হয়ে যায় না। ১৯৭৪ সালে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির পর ডেমোক্র্যাটদের বিশাল জয়ের পরও মাত্র ছয় বছরের মাথায় রিপাবলিকানরা রোনাল্ড রেগানের নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। একইভাবে ১৯৯৪ ও ২০১০ সালের ধাক্কা সামলে ক্লিনটন ও ওবামা দুজনই পরবর্তী নির্বাচনে বিপুল ভোটে পুনর্বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের অভ্যন্তরীণ নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা জো গ্রোগান ট্রাম্পবাদের পক্ষ সমর্থন করে বলেন, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, রিপাবলিকান পার্টি আর আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না। ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়ার ঠিক আগে গ্রোগান জোর দিয়ে বলেন, ‘আজ রাতে যা-ই ঘটুক, আমরা এখনো ট্রাম্পের দলেই আছি। যারা মনে করছেন ট্রাম্পবাদের পতন ঘটবে, তারা ভুল ভাবছেন।’

তা সত্ত্বেও ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রিস্টিনা এম. গ্রিয়ার সতর্ক করে বলেছেন, এমন বড় বিপর্যয়ের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান, তা এখন দেখার বিষয়। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কিছুটা ভাটা পড়লেও অভিবাসন ও বৈচিত্র্যের মতো বিষয়ে তাঁর নীতি দলটির ওপর শক্ত প্রভাব রেখে যাবে, কারণ ট্রাম্প রিপাবলিকান পার্টিকে তাঁর নিজস্ব ছাঁচে নতুন করে গড়ে তুলেছেন। এক দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করে আসা ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। রিপাবলিকানদের হারে ইরান যুদ্ধের প্রভাব স্বীকার করলেন ট্রাম্প। এখন সেই সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হচ্ছে তাঁকে। তুলনামূলক বেশি জয়ের সম্ভাবনা থাকা প্রার্থীদের বাদ দিয়ে তিনি কেন প্যাক্সটন ও ডারলিন গ্রাহামকে বেছে নিয়েছিলেন, এখন সেই সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। সৌদির সঙ্গে আলোচনা, বিদেশি সেনামুক্ত মধ্যপ্রাচ্য চায় ইরান।