ঢাকা ০১:৫৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

আফগানিস্তানে দারিদ্র্যের কষাঘাতে চরম সংকটে শিশু-কৈশোর

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:১৯:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ২৫ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

আফগানিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বাদঘিস প্রদেশে খরা ও ফসলহানির কারণে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। জীবন বাঁচাতে এবং ঋণের বোঝা মেটাতে সেখানকার পরিবারগুলো তাদের শিশু-কিশোরী কন্যাদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ১৫ বছর বয়সী দারেল্লা, যে বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা ও ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির স্ত্রী, নিজের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে জানায়, এই বয়সে বিয়ের সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। সে এখন খরায় বাস্তুচ্যুত হয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তার মা নূর বিবি জানান, বাগদানের পর থেকে মেয়েটি দুশ্চিন্তা করে, কান্নাকাটি করে এবং বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। মেয়েটি বিয়ের পর ১৫ ঘণ্টার দূরত্বে চলে গেলে তাকে আর দেখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তার মা। এক বাবা খাবারের ব্যবস্থা করতে না পেরে নিজের ১০ বছর বয়সী ছেলের একটি কিডনি বিক্রি করেছেন। সারা মেয়ের সামনে বিয়ের কথা বলতে পারেন না।

এলাকার প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর হলেও দীর্ঘস্থায়ী খরার ফলে ফসল ও পশুপালন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জীবিকা হারিয়ে বহু মানুষ শহরমুখী হয়েছেন। ১১ বছর বয়সী খাতিরাকে ২০ বছর বয়সী এক যুবকের সঙ্গে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। খাতিরা এ বিয়েতে অনাগ্রহী এবং বাগদানের পর থেকেই সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, এমনকি একা থাকতেও ভয় পাচ্ছে। হবু স্বামী বাড়িতে এলে সে পালিয়ে যায়। একই ধরনের সংকটে রয়েছে ৫ বছর বয়সী নাজিলা, যার হবু স্বামীর বয়স ১৫ বছর। এছাড়া দুই বছর বয়সী ফাতেমাহকেও বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কারণ তার আট বছর বয়সী ভাইয়ের ব্লাড ক্যানসারের চিকিৎসার ব্যয় মেটানোর সামর্থ্য তার পরিবারের নেই। ১১ বছরের খাতিরার বিয়েও ঠিক হয়েছে ২০ বছর বয়সী এক যুবকের সঙ্গে। পরিবারের ঋণ শোধ করতে তাকে বিয়ের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করা হয়েছে। বাদঘিসের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ বৃষ্টিনির্ভর কৃষি ও পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী খরা ফসল নষ্ট করছে, শুকিয়ে যাচ্ছে চারণভূমি। জীবিকা হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে আশ্রয় নিচ্ছেন।

পরিবারের দারিদ্র্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা আব্দুল আজিজ নামের এক ব্যক্তির অভিজ্ঞতায় ফুটে উঠেছে। খোশকিয়ান গ্রামের এই বাসিন্দা আট বছরে সাতবার ফসল হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। ঋণ শোধের তাগিদে তিনি তার পাঁচ মেয়েকে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। তার মেয়ে মাজরি ১২ বা ১৩ বছর বয়সে সংসার শুরু করে, এখন ১৬ বা ১৭ বছর বয়সেই সে দুই সন্তানের মা। এমনকি খাবার জোগাতে না পেরে অনেক পরিবার নিজেদের কিডনি বিক্রির মতো কঠিন পথও বেছে নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পরই তাদের সংসার ও মাতৃত্বের দায়িত্ব নিতে হয়।

ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্টারন্যাশনালের আফগানিস্তানবিষয়ক কর্মকর্তা মার্ক ক্যালডার সতর্ক করে বলেছেন, বাল্যবিবাহ মেয়েদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি বয়ে আনে। দেশটিতে আন্তর্জাতিক সহায়তা হ্রাসের ফলে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

১২ বছর বয়সী আয়েশাকে ২০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির কাছে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে পরিবারের বকেয়া বাড়িভাড়া পরিশোধের জন্য। তবে বিয়ের অর্থ পাওয়ার পরেও তাদের দারিদ্র্য ঘুচছে না। আয়েশার মা সারা জানান, বিষয়টি শুনলেই আয়েশা কান্নায় ভেঙে পড়ে, তাই তিনি মেয়েকে আপাতত পড়াশোনায় ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছেন যাতে অন্তত কিছুটা সময় তার শৈশব বজায় থাকে। তাই আপাতত মেয়েকে পড়াশোনা করতে দেন তিনি—যত দিন সম্ভব তার শৈশবটুকু বাঁচিয়ে রাখার আশায়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

আফগানিস্তানে দারিদ্র্যের কষাঘাতে চরম সংকটে শিশু-কৈশোর

আপডেট সময় : ১২:১৯:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

আফগানিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বাদঘিস প্রদেশে খরা ও ফসলহানির কারণে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। জীবন বাঁচাতে এবং ঋণের বোঝা মেটাতে সেখানকার পরিবারগুলো তাদের শিশু-কিশোরী কন্যাদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ১৫ বছর বয়সী দারেল্লা, যে বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা ও ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির স্ত্রী, নিজের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে জানায়, এই বয়সে বিয়ের সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। সে এখন খরায় বাস্তুচ্যুত হয়ে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তার মা নূর বিবি জানান, বাগদানের পর থেকে মেয়েটি দুশ্চিন্তা করে, কান্নাকাটি করে এবং বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। মেয়েটি বিয়ের পর ১৫ ঘণ্টার দূরত্বে চলে গেলে তাকে আর দেখতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তার মা। এক বাবা খাবারের ব্যবস্থা করতে না পেরে নিজের ১০ বছর বয়সী ছেলের একটি কিডনি বিক্রি করেছেন। সারা মেয়ের সামনে বিয়ের কথা বলতে পারেন না।

এলাকার প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর হলেও দীর্ঘস্থায়ী খরার ফলে ফসল ও পশুপালন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জীবিকা হারিয়ে বহু মানুষ শহরমুখী হয়েছেন। ১১ বছর বয়সী খাতিরাকে ২০ বছর বয়সী এক যুবকের সঙ্গে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। খাতিরা এ বিয়েতে অনাগ্রহী এবং বাগদানের পর থেকেই সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, এমনকি একা থাকতেও ভয় পাচ্ছে। হবু স্বামী বাড়িতে এলে সে পালিয়ে যায়। একই ধরনের সংকটে রয়েছে ৫ বছর বয়সী নাজিলা, যার হবু স্বামীর বয়স ১৫ বছর। এছাড়া দুই বছর বয়সী ফাতেমাহকেও বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কারণ তার আট বছর বয়সী ভাইয়ের ব্লাড ক্যানসারের চিকিৎসার ব্যয় মেটানোর সামর্থ্য তার পরিবারের নেই। ১১ বছরের খাতিরার বিয়েও ঠিক হয়েছে ২০ বছর বয়সী এক যুবকের সঙ্গে। পরিবারের ঋণ শোধ করতে তাকে বিয়ের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করা হয়েছে। বাদঘিসের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ বৃষ্টিনির্ভর কৃষি ও পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী খরা ফসল নষ্ট করছে, শুকিয়ে যাচ্ছে চারণভূমি। জীবিকা হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে আশ্রয় নিচ্ছেন।

পরিবারের দারিদ্র্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা আব্দুল আজিজ নামের এক ব্যক্তির অভিজ্ঞতায় ফুটে উঠেছে। খোশকিয়ান গ্রামের এই বাসিন্দা আট বছরে সাতবার ফসল হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। ঋণ শোধের তাগিদে তিনি তার পাঁচ মেয়েকে বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। তার মেয়ে মাজরি ১২ বা ১৩ বছর বয়সে সংসার শুরু করে, এখন ১৬ বা ১৭ বছর বয়সেই সে দুই সন্তানের মা। এমনকি খাবার জোগাতে না পেরে অনেক পরিবার নিজেদের কিডনি বিক্রির মতো কঠিন পথও বেছে নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পরই তাদের সংসার ও মাতৃত্বের দায়িত্ব নিতে হয়।

ওয়ার্ল্ড ভিশন ইন্টারন্যাশনালের আফগানিস্তানবিষয়ক কর্মকর্তা মার্ক ক্যালডার সতর্ক করে বলেছেন, বাল্যবিবাহ মেয়েদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি বয়ে আনে। দেশটিতে আন্তর্জাতিক সহায়তা হ্রাসের ফলে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

১২ বছর বয়সী আয়েশাকে ২০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির কাছে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে পরিবারের বকেয়া বাড়িভাড়া পরিশোধের জন্য। তবে বিয়ের অর্থ পাওয়ার পরেও তাদের দারিদ্র্য ঘুচছে না। আয়েশার মা সারা জানান, বিষয়টি শুনলেই আয়েশা কান্নায় ভেঙে পড়ে, তাই তিনি মেয়েকে আপাতত পড়াশোনায় ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছেন যাতে অন্তত কিছুটা সময় তার শৈশব বজায় থাকে। তাই আপাতত মেয়েকে পড়াশোনা করতে দেন তিনি—যত দিন সম্ভব তার শৈশবটুকু বাঁচিয়ে রাখার আশায়।