ঢাকা ০১:৫৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

ঔপনিবেশিক কাঠামোর প্রভাব ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সংকট

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৪৪:৪৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ঔপনিবেশিক ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার রাজনীতি দীর্ঘ সময় ধরে বাঙালি জাতিকে এক ধরনের হীনম্মন্যতায় ভোগানোর চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে পাকিস্তান শাসনামলে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বাঙালিদের ‘অযোদ্ধা জাতি’ হিসেবে প্রমাণের এক অপপ্রয়াস চালানো হয়েছিল। অথচ নানা ‘পুরুষোচিত’ খেলাধুলা বা বক্সিংয়ে বাঙালি সৈন্য ও কর্মকর্তাদের পারদর্শিতা ছিল প্রশ্নাতীত। এমনকি ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাঞ্জাব ফ্রন্টে বাঙালিদের নিয়ে গঠিত ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’ যে অভাবনীয় শৌর্য ও রণকৌশল প্রদর্শন করেছিল, তা সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তান-ভিত্তিক শাসকগোষ্ঠী এই বর্ণবাদী প্রচার বন্ধ করেনি। ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ৩২। হিসেবে আখ্যায়িত করা অব্যাহত রাখে এবং সেনাবাহিনীতে বাঙালি নিয়োগের হার আগের মতোই সংকুচিত করে রাখে। পূর্ব ও পশ্চিমের ভেতর এই সামরিক বৈষম্য জারি রাখা, আসলে, বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাঞ্জাব-প্রভাবিত পশ্চিম পাকিস্তানের দীর্ঘ বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নীতির সম্প্রসারণ হিসেবে নয়া-উপনিবেশবাদী পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির সহজাত। বাঙালির বিরুদ্ধে শৌর্যহীনতার ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ও পাকিস্তানি নয়া-ঔপনিবেশিক শাসকশ্রেণির এই বর্ণবাদী কৌশলগত অপপ্রচারের অন্তঃসারশূন্যতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় ১৯৭১ সালে —বাংলাদেশের সফল স্বাধীনতাযুদ্ধে, বাঙালি মেজরদের স্বল্পকালীন অল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অকুতোভয়।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ এই বর্ণবাদী ধারণার অন্তঃসারশূন্যতা স্পষ্টভাবে উন্মোচন করে দেয়। বাঙালি মেজরদের নেতৃত্বে স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা সমন্বিত গেরিলা আক্রমণ ও সম্মুখ সমরে পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে। মাত্র নয় মাসের ব্যবধানে অর্জিত এই বিজয় স্বাধীন বাংলাদেশের উত্থান নিশ্চিত করে। দীর্ঘ ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসন ও উর্দুর আগ্রাসী প্রভাব থেকে বাংলা ভাষা মুক্তি লাভ করে। ইতিহাসসিদ্ধ প্রত্যাশা ছিল যে, একটি দীর্ঘ সশস্ত্র জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে উঠে আসা স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি বাংলা ভাষার প্রকৃত গণতান্ত্রিক মুক্তি ঘটাবে। এভাবে, পাকিস্তান সৃষ্টির ২৪ বছরের মাথায়, পাকিস্তানের প্রধানত বাংলাভাষী পূর্বাংশ বাংলাদেশ হিসেবে স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে, বাংলাভাষা উর্দুর আগ্রাসী প্রভাব থেকে মুক্তি লাভ করে। ওদিকে, আধুনিক বাংলা ভাষার বিকাশে কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও, ভারতের বাংলাভাষী পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের জনগণ হিন্দির ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের মুখে নিজের ভাষাকে রক্ষা করতে হিমশিম খেতে থাকে। তাছাড়া, যে জনগোষ্ঠী আপন ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াকু সংগ্রামে প্রাণবিসর্জন দিতে পারে, সে জনগোষ্ঠী অপরাপর ভাষাভাষী মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাধীন বিকাশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে —এটাই ছিল নৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত প্রত্যাশা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই জোড়া-প্রত্যাশার আরও ন্যায্যতা ছিল, কারণ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র জনযুদ্ধে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই দেশটির বিভিন্ন সংখ্যালঘু অবাঙালি জাতিগোষ্ঠী যেমন, চাকমা, মার্মা, গারো, ত্রিপুরা প্রভৃতি সম্প্রদায় নানাভাবে অংশগ্রহণ। কেননা, ‘রাষ্ট্র’ হিসেবে একটি যথার্থ ‘গণতান্ত্রিক রিপাবলিকের’ পক্ষেই কেবল নাগরিকদের জন্য ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা’ভিত্তিক ‘গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা’ প্রবর্তন ও বিকাশে ভূমিকা রাখা সম্ভব। গণতান্ত্রিক রাজনীতি-দর্শনের শিক্ষার্থীমাত্রই জানেন, একটি যথার্থ ‘গণতান্ত্রিক রিপাবলিক’ বলতে বোঝায়, কোনো দেশের সকল শ্রেণির জনগণের ‘সাধারণ ইচ্ছার’ ভিত্তিতে প্রণীত ও জনগণের সকল অংশের ভেতর সম্পাদিত, একটি ‘সামাজিক চুক্তি’রূপী সংবিধানের অধীনে পরিচালিত একটি। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে নিরন্তর দায়বদ্ধ থাকে। কোনো দেশে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্ররূপী এই রকম একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যবর্গ, অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট দেশটির জনগণ, মর্যাদাবান ‘নাগরিক’ (পরঃরুবহ) হিসেবে স্বীকৃত থাকেন— কখনোই কোনো ঔপনিবেশিক শক্তির দখলীকৃত কোনো অধিরাজ্যের ‘প্রজা’ (ংঁনলবপঃ) হিসেবে বিবেচিত হন না। শেখ মুজিবুর রহমানসহ লীগ-নেতৃত্বের একটি অংশ তরুণ বয়সে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ-বিরোধী স্বাধীনতাসংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করলেও, পরবর্তীকালে নয়া-উপনিবেশবাদী পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দুই যুগব্যাপী সংগ্রামে নেতৃত্বমূলক ভূমিকা পালন করলেও, তাঁদের রাজনৈতিক মন ও মননের। লীগ-নেতৃত্ব উপনিবেশবাদ বিরোধী রক্তাক্ত জনযুদ্ধের ভেতর দিয়ে আবির্ভূত বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে একটি ‘জনগণতান্ত্রিক’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে, ‘গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র’ নামকরণ না করে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’ সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে, বাংলা ভাষায় ‘প্রজা’ শব্দটি এমনকি রাজার ‘সাবজেক্টের’ চেয়েও অধস্তন মর্যাদাসম্পন্ন একটি প্রতিপাদ্য। কেননা, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকশ্রেণি ‘অষ্টাদশ শতকে’ অবিভক্ত বাংলায় ‘ভূমির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ প্রবর্তনের মাধ্যমে, ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অনুরক্ত যে বিশ্বস্ত ‘জমিদার শ্রেণি’ গড়ে তুলেছিল, তারা তাদের জমিদারির শোষিত-নিপীড়িত কৃষকদের ‘প্রজা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। অর্থাৎ, জমিদার নিজেই ব্রিটিশ রাজা/রানীর ‘প্রজা’, আবার জমিদারের ‘প্রজা’ হলো এদেশের কৃষক।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণে ‘সাম্য ও মানবিক মর্যাদা’ প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার ছিল, তা ছিল জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তি। তবে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা যখন আওয়ামী লীগের হাতে আসে, তখন তারা জনযুদ্ধের ইতিহাসকে ঔপনিবেশিক আদলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রয়াস চালায়। সংবিধান রচনার ক্ষেত্রেও দলটি একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখে এবং অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেনি। ফলে সংবিধানটি সামগ্রিক জনগণের ‘সাধারণ ইচ্ছার’ প্রতিফলনের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামোর রূপ পায়। তাছাড়া, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার রজ্জু যে আওয়ামী লীগের হস্তগত হয়, সেই লীগ-নেতৃত্ব তার ১০ই এপ্রিল ১৯৭১, ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে’ বিলম্বে ঘোষিত এবং পরদিন প্রচারিত প্রবাসী লীগ-সরকারের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে, স্বাধীন বাংলাদেশে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা। 1971, 278.

১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলাকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও তা কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও উচ্চতর পর্যায়ে বাংলা ভাষার ব্যবহার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় যে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা প্রয়োজন ছিল, তা কার্যত থমকে থাকে। মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকেই কৃষিপ্রধান পূর্ব বাংলার মানুষ যেভাবে প্রান্তিক জীবনযাপনে বাধ্য হয়েছিল, স্বাধীনতার পরও সেই কাঠামোগত নিপীড়ন ও বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যের চর্চা রয়ে গেছে বলে প্রতীয়মান হয়। কৃষিপ্রধান পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষই ছিলেন কৃষক, আর তাঁরা ব্রিটিশের প্রজারও প্রজার জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছেন।

বাঙালিদের শৌর্যহীনতার অভিযোগ তোলা সেই শাসকগোষ্ঠীর কৌশল ছিল মূলত জাতিকে মানসিকভাবে পঙ্গু করার একটি পরিকল্পিত অপপ্রচার। ১৯৭১ সালের বিজয় এই প্রচারের অসারতা প্রমাণ করলেও রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়ায় সেই ঔপনিবেশিক ধারার অনুকরণ বা চর্চা থেকে বাংলাদেশ পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। এটিই বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ঔপনিবেশিক কাঠামোর প্রভাব ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সংকট

আপডেট সময় : ০৮:৪৪:৪৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

ঔপনিবেশিক ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার রাজনীতি দীর্ঘ সময় ধরে বাঙালি জাতিকে এক ধরনের হীনম্মন্যতায় ভোগানোর চেষ্টা করেছে। বিশেষ করে পাকিস্তান শাসনামলে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বাঙালিদের ‘অযোদ্ধা জাতি’ হিসেবে প্রমাণের এক অপপ্রয়াস চালানো হয়েছিল। অথচ নানা ‘পুরুষোচিত’ খেলাধুলা বা বক্সিংয়ে বাঙালি সৈন্য ও কর্মকর্তাদের পারদর্শিতা ছিল প্রশ্নাতীত। এমনকি ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পাঞ্জাব ফ্রন্টে বাঙালিদের নিয়ে গঠিত ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট’ যে অভাবনীয় শৌর্য ও রণকৌশল প্রদর্শন করেছিল, তা সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তান-ভিত্তিক শাসকগোষ্ঠী এই বর্ণবাদী প্রচার বন্ধ করেনি। ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি ৩২। হিসেবে আখ্যায়িত করা অব্যাহত রাখে এবং সেনাবাহিনীতে বাঙালি নিয়োগের হার আগের মতোই সংকুচিত করে রাখে। পূর্ব ও পশ্চিমের ভেতর এই সামরিক বৈষম্য জারি রাখা, আসলে, বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পাঞ্জাব-প্রভাবিত পশ্চিম পাকিস্তানের দীর্ঘ বৈষম্যমূলক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নীতির সম্প্রসারণ হিসেবে নয়া-উপনিবেশবাদী পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির সহজাত। বাঙালির বিরুদ্ধে শৌর্যহীনতার ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ও পাকিস্তানি নয়া-ঔপনিবেশিক শাসকশ্রেণির এই বর্ণবাদী কৌশলগত অপপ্রচারের অন্তঃসারশূন্যতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় ১৯৭১ সালে —বাংলাদেশের সফল স্বাধীনতাযুদ্ধে, বাঙালি মেজরদের স্বল্পকালীন অল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অকুতোভয়।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ এই বর্ণবাদী ধারণার অন্তঃসারশূন্যতা স্পষ্টভাবে উন্মোচন করে দেয়। বাঙালি মেজরদের নেতৃত্বে স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা সমন্বিত গেরিলা আক্রমণ ও সম্মুখ সমরে পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে। মাত্র নয় মাসের ব্যবধানে অর্জিত এই বিজয় স্বাধীন বাংলাদেশের উত্থান নিশ্চিত করে। দীর্ঘ ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসন ও উর্দুর আগ্রাসী প্রভাব থেকে বাংলা ভাষা মুক্তি লাভ করে। ইতিহাসসিদ্ধ প্রত্যাশা ছিল যে, একটি দীর্ঘ সশস্ত্র জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে উঠে আসা স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি বাংলা ভাষার প্রকৃত গণতান্ত্রিক মুক্তি ঘটাবে। এভাবে, পাকিস্তান সৃষ্টির ২৪ বছরের মাথায়, পাকিস্তানের প্রধানত বাংলাভাষী পূর্বাংশ বাংলাদেশ হিসেবে স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে, বাংলাভাষা উর্দুর আগ্রাসী প্রভাব থেকে মুক্তি লাভ করে। ওদিকে, আধুনিক বাংলা ভাষার বিকাশে কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকা সত্ত্বেও, ভারতের বাংলাভাষী পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের জনগণ হিন্দির ক্রমবর্ধমান আগ্রাসনের মুখে নিজের ভাষাকে রক্ষা করতে হিমশিম খেতে থাকে। তাছাড়া, যে জনগোষ্ঠী আপন ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াকু সংগ্রামে প্রাণবিসর্জন দিতে পারে, সে জনগোষ্ঠী অপরাপর ভাষাভাষী মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাধীন বিকাশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে —এটাই ছিল নৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত প্রত্যাশা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই জোড়া-প্রত্যাশার আরও ন্যায্যতা ছিল, কারণ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র জনযুদ্ধে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই দেশটির বিভিন্ন সংখ্যালঘু অবাঙালি জাতিগোষ্ঠী যেমন, চাকমা, মার্মা, গারো, ত্রিপুরা প্রভৃতি সম্প্রদায় নানাভাবে অংশগ্রহণ। কেননা, ‘রাষ্ট্র’ হিসেবে একটি যথার্থ ‘গণতান্ত্রিক রিপাবলিকের’ পক্ষেই কেবল নাগরিকদের জন্য ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা’ভিত্তিক ‘গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা’ প্রবর্তন ও বিকাশে ভূমিকা রাখা সম্ভব। গণতান্ত্রিক রাজনীতি-দর্শনের শিক্ষার্থীমাত্রই জানেন, একটি যথার্থ ‘গণতান্ত্রিক রিপাবলিক’ বলতে বোঝায়, কোনো দেশের সকল শ্রেণির জনগণের ‘সাধারণ ইচ্ছার’ ভিত্তিতে প্রণীত ও জনগণের সকল অংশের ভেতর সম্পাদিত, একটি ‘সামাজিক চুক্তি’রূপী সংবিধানের অধীনে পরিচালিত একটি। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে নিরন্তর দায়বদ্ধ থাকে। কোনো দেশে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্ররূপী এই রকম একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সদস্যবর্গ, অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট দেশটির জনগণ, মর্যাদাবান ‘নাগরিক’ (পরঃরুবহ) হিসেবে স্বীকৃত থাকেন— কখনোই কোনো ঔপনিবেশিক শক্তির দখলীকৃত কোনো অধিরাজ্যের ‘প্রজা’ (ংঁনলবপঃ) হিসেবে বিবেচিত হন না। শেখ মুজিবুর রহমানসহ লীগ-নেতৃত্বের একটি অংশ তরুণ বয়সে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ-বিরোধী স্বাধীনতাসংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করলেও, পরবর্তীকালে নয়া-উপনিবেশবাদী পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দুই যুগব্যাপী সংগ্রামে নেতৃত্বমূলক ভূমিকা পালন করলেও, তাঁদের রাজনৈতিক মন ও মননের। লীগ-নেতৃত্ব উপনিবেশবাদ বিরোধী রক্তাক্ত জনযুদ্ধের ভেতর দিয়ে আবির্ভূত বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে একটি ‘জনগণতান্ত্রিক’ প্রতিষ্ঠান হিসেবে, ‘গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র’ নামকরণ না করে ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’ সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে, বাংলা ভাষায় ‘প্রজা’ শব্দটি এমনকি রাজার ‘সাবজেক্টের’ চেয়েও অধস্তন মর্যাদাসম্পন্ন একটি প্রতিপাদ্য। কেননা, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকশ্রেণি ‘অষ্টাদশ শতকে’ অবিভক্ত বাংলায় ‘ভূমির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ প্রবর্তনের মাধ্যমে, ব্রিটিশ শাসনের প্রতি অনুরক্ত যে বিশ্বস্ত ‘জমিদার শ্রেণি’ গড়ে তুলেছিল, তারা তাদের জমিদারির শোষিত-নিপীড়িত কৃষকদের ‘প্রজা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। অর্থাৎ, জমিদার নিজেই ব্রিটিশ রাজা/রানীর ‘প্রজা’, আবার জমিদারের ‘প্রজা’ হলো এদেশের কৃষক।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ভাষণে ‘সাম্য ও মানবিক মর্যাদা’ প্রতিষ্ঠার যে অঙ্গীকার ছিল, তা ছিল জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তি। তবে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা যখন আওয়ামী লীগের হাতে আসে, তখন তারা জনযুদ্ধের ইতিহাসকে ঔপনিবেশিক আদলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রয়াস চালায়। সংবিধান রচনার ক্ষেত্রেও দলটি একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখে এবং অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেনি। ফলে সংবিধানটি সামগ্রিক জনগণের ‘সাধারণ ইচ্ছার’ প্রতিফলনের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কাঠামোর রূপ পায়। তাছাড়া, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার রজ্জু যে আওয়ামী লীগের হস্তগত হয়, সেই লীগ-নেতৃত্ব তার ১০ই এপ্রিল ১৯৭১, ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে’ বিলম্বে ঘোষিত এবং পরদিন প্রচারিত প্রবাসী লীগ-সরকারের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে, স্বাধীন বাংলাদেশে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা। 1971, 278.

১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের সংবিধানে বাংলাকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও তা কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও উচ্চতর পর্যায়ে বাংলা ভাষার ব্যবহার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় যে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা প্রয়োজন ছিল, তা কার্যত থমকে থাকে। মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকেই কৃষিপ্রধান পূর্ব বাংলার মানুষ যেভাবে প্রান্তিক জীবনযাপনে বাধ্য হয়েছিল, স্বাধীনতার পরও সেই কাঠামোগত নিপীড়ন ও বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যের চর্চা রয়ে গেছে বলে প্রতীয়মান হয়। কৃষিপ্রধান পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষই ছিলেন কৃষক, আর তাঁরা ব্রিটিশের প্রজারও প্রজার জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছেন।

বাঙালিদের শৌর্যহীনতার অভিযোগ তোলা সেই শাসকগোষ্ঠীর কৌশল ছিল মূলত জাতিকে মানসিকভাবে পঙ্গু করার একটি পরিকল্পিত অপপ্রচার। ১৯৭১ সালের বিজয় এই প্রচারের অসারতা প্রমাণ করলেও রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়ায় সেই ঔপনিবেশিক ধারার অনুকরণ বা চর্চা থেকে বাংলাদেশ পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। এটিই বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।