ঢাকা ১১:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

ঠাকুরগাঁওয়ের জাদুঘরে ১০ দেশের সংস্কৃতি ও লোকজ খেলনার মেলবন্ধন

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:০২:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬ ১৬ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ঠাকুরগাঁওয়ের পূর্ব আকচায় অবস্থিত একটি বেসরকারি জাদুঘর যেন হয়ে উঠেছে দেশি-বিদেশি সংস্কৃতির মিলনমেলা। ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) পরিচালিত ‘লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘর’-এর লোকজ খেলনা গ্যালারিতে এখন দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। সেখানে মালদ্বীপ, কাতার, তুরস্ক, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম, কেনিয়া, আজারবাইজান, সেনেগাল, ভারত এবং বাংলাদেশের পুতুলগুলো তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও নকশা নিয়ে প্রদর্শিত হচ্ছে।

জাদুঘরটির অ্যাকাউন্টেন্ট জীবন চন্দ্র রায় জানান, এই পুতুলগুলো কেবল শৈল্পিক নিদর্শন নয়, বরং বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক।

তিনি বলেন, পুতুলের পোশাক ও সাজসজ্জা দেখলেই সংশ্লিষ্ট দেশের সংস্কৃতির একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া সম্ভব। পুতুলের পাশাপাশি এই গ্যালারির অন্য অংশে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আবহমান গ্রামবাংলার সামাজিক জীবনের নানা দৃশ্য। দলবদ্ধভাবে বসে থাকা নারী-পুরুষের প্রতিকৃতিগুলো যেন অতীতে উঠান, বারান্দা কিংবা গাছের ছায়ায় মানুষের প্রাণখোলা আড্ডার সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। ডিজিটাল যুগের নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই এটি এক নতুন অভিজ্ঞতা। বর্তমান ডিজিটাল যুগে মানুষের অবসর কাটানোর ধরন বদলে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে এমন দৃশ্য আর আগের মতো পরিচিত নয়।’।

প্রদর্শনী দেখতে আসা শিক্ষার্থীদের কণ্ঠেও ঝরেছে মুগ্ধতা। কচুবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান বলে, আগে বিভিন্ন দেশের নাম বইতে পড়লেও তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক এভাবে একসঙ্গে দেখার সুযোগ কখনো হয়নি। বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইসরাত ফারজানা ও মারিয়া জাহান জানায়, পুতুলগুলোর গোল হয়ে বসে থাকার দৃশ্য দেখে তাদের মনে হচ্ছে যেন সবাই মিলে গল্প করছে। বর্তমানের মোবাইল আসক্তির ভিড়ে এই দৃশ্যগুলো তাদের বড়দের মুখে শোনা সেই সামাজিকতার কথা মনে করিয়ে দেয়। বড়দের কাছে শুনেছি, আগে মানুষ অবসর সময়ে উঠানে বা বাড়ির সামনে একসঙ্গে বসে গল্প করত।’।

গ্যালারির আরেক অংশে রয়েছে কাঠের খেলনা গাড়ি, ঠেলনা গাড়ি, লাটিম ও মার্বেলের মতো লোকজ খেলনা। দর্শনার্থী জাকির হোসেন তাঁর শৈশবের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, কয়েকটা মার্বেল কিংবা লাটিম ঘিরেই আমাদের আনন্দের আসর জমতো। আধুনিক খেলনার ভিড়ে এমন সাধারণ জিনিসের আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। শিক্ষার্থী নির্ঝর আহমেদ ও সবুজ রানা জানায়, বাবা-চাচাদের কাছে শোনা সেই পুরোনো দিনের খেলনাগুলো সামনাসামনি দেখে তারা দারুণভাবে আপ্লুত। আমাদের কাছে এখন অনেক ধরনের আধুনিক খেলনা আছে, কিন্তু আগের দিনে শিশুরা কীভাবে এসব সাধারণ খেলনা দিয়ে আনন্দ পেত, তা জানতে পারছি।’।

এই চমৎকার প্রদর্শনী সম্পর্কে ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যাপক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, গ্যালারিটি ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করেছে। একদিকে ১০ দেশের পুতুলে ফুটে উঠেছে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, অন্যদিকে দেশীয় খেলনা ও মানুষের প্রতিকৃতিতে ধরা পড়েছে বাংলার অতীত জীবন। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মনোতোষ কুমার দে-র মতে, এই গ্যালারি শুধু দর্শনের জায়গা নয়, বরং অতীতকে জানার এবং ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার একটি অনন্য শিক্ষামূলক মাধ্যম। এখানে যেমন দূরের দেশের পোশাকের পরিচয় মেলে, তেমনি নিজের মাটি ও শৈশবের গল্পও খুঁজে পাওয়া যায়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ঠাকুরগাঁওয়ের জাদুঘরে ১০ দেশের সংস্কৃতি ও লোকজ খেলনার মেলবন্ধন

আপডেট সময় : ০৮:০২:১৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬

ঠাকুরগাঁওয়ের পূর্ব আকচায় অবস্থিত একটি বেসরকারি জাদুঘর যেন হয়ে উঠেছে দেশি-বিদেশি সংস্কৃতির মিলনমেলা। ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) পরিচালিত ‘লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘর’-এর লোকজ খেলনা গ্যালারিতে এখন দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। সেখানে মালদ্বীপ, কাতার, তুরস্ক, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম, কেনিয়া, আজারবাইজান, সেনেগাল, ভারত এবং বাংলাদেশের পুতুলগুলো তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও নকশা নিয়ে প্রদর্শিত হচ্ছে।

জাদুঘরটির অ্যাকাউন্টেন্ট জীবন চন্দ্র রায় জানান, এই পুতুলগুলো কেবল শৈল্পিক নিদর্শন নয়, বরং বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক।

তিনি বলেন, পুতুলের পোশাক ও সাজসজ্জা দেখলেই সংশ্লিষ্ট দেশের সংস্কৃতির একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া সম্ভব। পুতুলের পাশাপাশি এই গ্যালারির অন্য অংশে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আবহমান গ্রামবাংলার সামাজিক জীবনের নানা দৃশ্য। দলবদ্ধভাবে বসে থাকা নারী-পুরুষের প্রতিকৃতিগুলো যেন অতীতে উঠান, বারান্দা কিংবা গাছের ছায়ায় মানুষের প্রাণখোলা আড্ডার সেই হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। ডিজিটাল যুগের নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই এটি এক নতুন অভিজ্ঞতা। বর্তমান ডিজিটাল যুগে মানুষের অবসর কাটানোর ধরন বদলে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে এমন দৃশ্য আর আগের মতো পরিচিত নয়।’।

প্রদর্শনী দেখতে আসা শিক্ষার্থীদের কণ্ঠেও ঝরেছে মুগ্ধতা। কচুবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জাহিদ হাসান বলে, আগে বিভিন্ন দেশের নাম বইতে পড়লেও তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক এভাবে একসঙ্গে দেখার সুযোগ কখনো হয়নি। বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইসরাত ফারজানা ও মারিয়া জাহান জানায়, পুতুলগুলোর গোল হয়ে বসে থাকার দৃশ্য দেখে তাদের মনে হচ্ছে যেন সবাই মিলে গল্প করছে। বর্তমানের মোবাইল আসক্তির ভিড়ে এই দৃশ্যগুলো তাদের বড়দের মুখে শোনা সেই সামাজিকতার কথা মনে করিয়ে দেয়। বড়দের কাছে শুনেছি, আগে মানুষ অবসর সময়ে উঠানে বা বাড়ির সামনে একসঙ্গে বসে গল্প করত।’।

গ্যালারির আরেক অংশে রয়েছে কাঠের খেলনা গাড়ি, ঠেলনা গাড়ি, লাটিম ও মার্বেলের মতো লোকজ খেলনা। দর্শনার্থী জাকির হোসেন তাঁর শৈশবের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেন, কয়েকটা মার্বেল কিংবা লাটিম ঘিরেই আমাদের আনন্দের আসর জমতো। আধুনিক খেলনার ভিড়ে এমন সাধারণ জিনিসের আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি। শিক্ষার্থী নির্ঝর আহমেদ ও সবুজ রানা জানায়, বাবা-চাচাদের কাছে শোনা সেই পুরোনো দিনের খেলনাগুলো সামনাসামনি দেখে তারা দারুণভাবে আপ্লুত। আমাদের কাছে এখন অনেক ধরনের আধুনিক খেলনা আছে, কিন্তু আগের দিনে শিশুরা কীভাবে এসব সাধারণ খেলনা দিয়ে আনন্দ পেত, তা জানতে পারছি।’।

এই চমৎকার প্রদর্শনী সম্পর্কে ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যাপক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, গ্যালারিটি ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করেছে। একদিকে ১০ দেশের পুতুলে ফুটে উঠেছে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, অন্যদিকে দেশীয় খেলনা ও মানুষের প্রতিকৃতিতে ধরা পড়েছে বাংলার অতীত জীবন। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক মনোতোষ কুমার দে-র মতে, এই গ্যালারি শুধু দর্শনের জায়গা নয়, বরং অতীতকে জানার এবং ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার একটি অনন্য শিক্ষামূলক মাধ্যম। এখানে যেমন দূরের দেশের পোশাকের পরিচয় মেলে, তেমনি নিজের মাটি ও শৈশবের গল্পও খুঁজে পাওয়া যায়।