ঢাকা ০১:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

নেহা বোরা: মোদি সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠা তরুণী

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৪:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ২৮ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বর্তমানে ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ ঘিরে ভারতের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে তীব্র ক্ষোভ ও আন্দোলনের জন্ম হয়েছে, তার অন্যতম প্রতিবাদী মুখ হয়ে উঠেছেন ২৯ বছর বয়সী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। তিনি বামপন্থী ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কয়েক মাস আগেও ছাত্ররাজনীতির বাইরে নেহা বোরার নাম খুব বেশি মানুষ জানতেন না। এবার ভোটার তালিকার বিতর্কিত সংশোধনের কারণে ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ নিয়েও মোদি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন তরুণেরা। রাজপথের এই কৌশলী কর্মী আন্দোলনের মাধ্যমে মোদি সরকারের নীতি ও বিভিন্ন পদে নিয়োগ নিয়ে ক্ষুব্ধ তরুণদের একাংশের কাছে এক আইকনে পরিণত হয়েছেন। এটি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী–লেনিনবাদী) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন। রাষ্ট্রীয় দমন–পীড়নের মুখে দলটি অন্তত তিন দশক গোপনে কাজ করেছে।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথে নেহা বোরা এখন এক পরিচিত ও আলোচিত নাম। গত ১২ অক্টোবর প্রধান বিরোধী দলের নেতা রাহুল গান্ধী হাজার হাজার সমর্থককে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অভিমুখে পদযাত্রা করেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবিতে সেই আবেদন জমা দেওয়ার মিছিলে রাহুল গান্ধীর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর পাশাপাশি নেহা বোরাও সামনের সারিতে ছিলেন। রাহুল গান্ধী প্রিয়াঙ্কাকে নিজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন, আর নেহার উপস্থিতি ভারতের বর্তমান আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুত্বকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক নেতাকে দেবতার আসন থেকে নামিয়ে আনার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেও নিজের সঙ্গে এমন তুলনা চান না নেহা বোরা। পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রামের কৃষক বিদ্রোহ ছিল সেই আন্দোলনের অনুপ্রেরণা।

নেহার রাজনৈতিক উত্থানের প্রেক্ষাপট বেশ দীর্ঘ। তিনি উত্তরাখণ্ডের খাতিমা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, যার সুবাদে নেহা শৈশব থেকে ভারতের বিভিন্ন শহরে বসবাস করেছেন। তবে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। বিশেষ করে তাঁর বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যরা বিজেপির সক্রিয় সমর্থক হওয়ায় রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রশ্নে নেহার সঙ্গে তাদের দূরত্ব স্পষ্ট হয়। ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের প্রতিবাদে আন্দোলনের সময় থেকেই নেহার রাজনৈতিক সক্রিয়তা দানা বাঁধতে শুরু করে। কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর পেরিয়ে তিনি এখন ভারতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এ সময় পদযাত্রায় সামনে থাকা দুই নারীর কাঁধে তিনি হাত রেখেছিলেন। দলটির উত্থান ঘটে ১৯৬৭ সালে পূর্ব ভারতে শুরু হওয়া মাওবাদী নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট বিদ্রোহের ধারায়।

নেহা বোরা দিল্লির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় এক দশক ধরে শিল্পকলা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং বর্তমানে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) নাট্যকলায় পোস্টডক্টরাল পর্যায়ে গবেষণারত। জেএনইউতে পড়ার সময় থেকেই তিনি আইসার সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আইসার সহকর্মী ২৫ বছর বয়সী দানিশ আলীর মতে, নেহা বছরের পর বছর শিক্ষার্থীদের দোরগোড়ায় গিয়ে প্রচার চালিয়েছেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা বিপ্লবী ভগত সিংয়ের প্রতিরোধ কৌশলের ওপর তাঁদের সংগঠন এখনো আস্থা রাখে, যা নেহার রাজনৈতিক দর্শনেও প্রভাব ফেলেছে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতারা প্ল্যাকার্ড হাতে অবস্থান ধর্মঘট করেন এবং পুলিশ সহজেই তাঁদের ধরে ফেলে। পুলিশ ট্রেন ও বাসে আসা আন্দোলনকারীদের দ্রুত আটক করে। নেহার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আইসার ২৫ বছর বয়সী ছাত্রনেতা দানিশ আলী বলেন, ‘নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে আমাদের দল দীর্ঘদিন গোপনে পরিচালিত হতো। ১৯৩১ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ব্রিটিশ শাসকেরা ভগত সিংকে ফাঁসি দিয়েছিল।

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলতি বছরের শুরুর দিকে নেহা ও তাঁর সহকর্মীরা যন্তর মন্তরে টানা কয়েক সপ্তাহ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।

সেই আন্দোলন চলাকালীন নেহার মা সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন, যা সে সময় বেশ আলোচিত হয়েছিল। অন্যদিকে মোদির হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি বাম রাজনীতিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে।

আইসার জ্যেষ্ঠ নেতা ও নেহার পরামর্শক এন সাই বালাজি জানান, সেই অনশনই নেহাকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে এবং সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দেয়।

মোদি সরকার সাধারণত রাজনৈতিক বিরোধীদের ‘দেশবিরোধী’ তকমা দিয়ে থাকে, তবে নেহার মতে, এই অপপ্রচার সফল হয় না কারণ সাধারণ মানুষ এই তরুণ নেত্রীর মধ্যে আশার আলো দেখতে পায়।

নেহার জনপ্রিয়তার বিষয়টি এতটাই বেড়েছে যে, সফটওয়্যার ডেভেলপাররা তাঁকে নিয়ে সুপার মারিও ধাঁচের একটি ভিডিও গেম তৈরি করেছেন। গেমের প্রধান চরিত্র পুলিশের ব্যারিকেড টপকে ‘গণতন্ত্র পয়েন্ট’ সংগ্রহ করে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে এগিয়ে চলে। এছাড়া দিল্লির ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নিশিতা নাথসহ অনেকে তাঁকে ‘গণতন্ত্রের দেবী’ বলে আখ্যায়িত করছেন। হংকংয়ের আন্দোলনকারী নেত্রী অ্যাগনেস চাউয়ের সঙ্গে নেহার তুলনা করে অনেকে বলছেন, তিনি ভারতের রাজনীতিতে এক নতুন ধারা তৈরি করছেন। তবে নেহা নিজেই এই ধরনের উপমার ঘোর বিরোধী। দিল্লির ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নিশিতা নাথ চলতি মাসের শুরুর দিকে সেন্ট্রাল দিল্লিতে বসে বলেন, ‘আমরা কি নেহাকে “গণতন্ত্রের দেবী” বলতে পারি। নেহার রাজপথের রাজনীতি বুঝতে হলে আগে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।

পুলিশের কঠোর বাধা সত্ত্বেও নেহা যেভাবে আন্দোলনের ডাক দেন, তা অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। গত ১০ অক্টোবর যখন মোদি সরকার পুরো নয়াদিল্লি কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছিল, তখন নেহা ইনস্টাগ্রাম লাইভে এসে সরাসরি তরুণদের সংগঠিত করেন। তিনি অ্যানিমে ‘ওয়ান পিস’–এর টি–শার্ট পরে দক্ষিণ দিল্লির অভিজাত এলাকায় উপস্থিত হয়ে পুলিশের নজর এড়িয়ে কর্মসূচি চালিয়েছিলেন। এছাড়া ওই সপ্তাহে আরও কয়েকবার তিনি পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে সমর্থকদের নিয়ে বিক্ষোভ করতে সক্ষম হন। অনেক ছাত্রনেতাকে নিজ নিজ বাড়িতে নজরবন্দী করা হয়। ১০ অক্টোবর পুলিশ তরুণ নেতাদের আগেই আটক করার জন্য তৎপর হবে জেনে আইসার কর্মীরা নেহাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নেহার মতো তরুণ নেতাদের জন্য পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনী রাজনীতির ময়দানে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করা। নয়াদিল্লিভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলী মনে করেন, আইসার মতো সংগঠনের পক্ষে সরাসরি সংসদীয় নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মতো সাংগঠনিক ভিত এখনো গড়ে ওঠেনি। তাই নেহার মতো নেতাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য বড় কোনো মূলধারার জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে নেহা ও তাঁর সহকর্মীরা তাদের গেরিলা কৌশল ও তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততাকে বড় শক্তি হিসেবে দেখছেন। ১৯৯০–এর দশকে তারা সশস্ত্র পথ ত্যাগ করে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় যুক্ত হয়, যদিও তাদের কিছু ভাঙনধারা এখনো সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পক্ষপাতী।

স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘আরবান নকশাল’ বা ‘বুদ্ধিজীবী নকশালদের’ বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিয়েছিলেন, যা নেহার মতো বামপন্থী নেতাদের লক্ষ্য করেই বলা হয়েছে বলে মনে করা হয়। বিজেপির এই অবস্থানকে নেহা ভারতের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ হিসেবে দেখেন। তিনি আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী ধারার প্রকৃত উত্তরসূরিদের অস্বীকার করে জাতীয়তাবাদের দাবি করা যায় না। নেহা বোরা বর্তমানে কেবল একজন ছাত্রনেত্রী নন, বরং মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রধান কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। বেইজিংয়ের চাপিয়ে দেওয়া যেসব আইনকে সমালোচকেরা কঠোর ও দমনমূলক বলে অভিহিত করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে অ্যাগনেস এই উপাধি পেয়েছিলেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

নেহা বোরা: মোদি সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠা তরুণী

আপডেট সময় : ০৯:৪৪:০৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বর্তমানে ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ ঘিরে ভারতের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে তীব্র ক্ষোভ ও আন্দোলনের জন্ম হয়েছে, তার অন্যতম প্রতিবাদী মুখ হয়ে উঠেছেন ২৯ বছর বয়সী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। তিনি বামপন্থী ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কয়েক মাস আগেও ছাত্ররাজনীতির বাইরে নেহা বোরার নাম খুব বেশি মানুষ জানতেন না। এবার ভোটার তালিকার বিতর্কিত সংশোধনের কারণে ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ নিয়েও মোদি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন তরুণেরা। রাজপথের এই কৌশলী কর্মী আন্দোলনের মাধ্যমে মোদি সরকারের নীতি ও বিভিন্ন পদে নিয়োগ নিয়ে ক্ষুব্ধ তরুণদের একাংশের কাছে এক আইকনে পরিণত হয়েছেন। এটি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী–লেনিনবাদী) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন। রাষ্ট্রীয় দমন–পীড়নের মুখে দলটি অন্তত তিন দশক গোপনে কাজ করেছে।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথে নেহা বোরা এখন এক পরিচিত ও আলোচিত নাম। গত ১২ অক্টোবর প্রধান বিরোধী দলের নেতা রাহুল গান্ধী হাজার হাজার সমর্থককে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অভিমুখে পদযাত্রা করেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবিতে সেই আবেদন জমা দেওয়ার মিছিলে রাহুল গান্ধীর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর পাশাপাশি নেহা বোরাও সামনের সারিতে ছিলেন। রাহুল গান্ধী প্রিয়াঙ্কাকে নিজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন, আর নেহার উপস্থিতি ভারতের বর্তমান আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুত্বকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তবে রাজনৈতিক নেতাকে দেবতার আসন থেকে নামিয়ে আনার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেও নিজের সঙ্গে এমন তুলনা চান না নেহা বোরা। পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রামের কৃষক বিদ্রোহ ছিল সেই আন্দোলনের অনুপ্রেরণা।

নেহার রাজনৈতিক উত্থানের প্রেক্ষাপট বেশ দীর্ঘ। তিনি উত্তরাখণ্ডের খাতিমা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, যার সুবাদে নেহা শৈশব থেকে ভারতের বিভিন্ন শহরে বসবাস করেছেন। তবে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। বিশেষ করে তাঁর বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যরা বিজেপির সক্রিয় সমর্থক হওয়ায় রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রশ্নে নেহার সঙ্গে তাদের দূরত্ব স্পষ্ট হয়। ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের প্রতিবাদে আন্দোলনের সময় থেকেই নেহার রাজনৈতিক সক্রিয়তা দানা বাঁধতে শুরু করে। কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর পেরিয়ে তিনি এখন ভারতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এ সময় পদযাত্রায় সামনে থাকা দুই নারীর কাঁধে তিনি হাত রেখেছিলেন। দলটির উত্থান ঘটে ১৯৬৭ সালে পূর্ব ভারতে শুরু হওয়া মাওবাদী নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট বিদ্রোহের ধারায়।

নেহা বোরা দিল্লির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় এক দশক ধরে শিল্পকলা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং বর্তমানে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) নাট্যকলায় পোস্টডক্টরাল পর্যায়ে গবেষণারত। জেএনইউতে পড়ার সময় থেকেই তিনি আইসার সঙ্গে যুক্ত হন। তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আইসার সহকর্মী ২৫ বছর বয়সী দানিশ আলীর মতে, নেহা বছরের পর বছর শিক্ষার্থীদের দোরগোড়ায় গিয়ে প্রচার চালিয়েছেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা বিপ্লবী ভগত সিংয়ের প্রতিরোধ কৌশলের ওপর তাঁদের সংগঠন এখনো আস্থা রাখে, যা নেহার রাজনৈতিক দর্শনেও প্রভাব ফেলেছে। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতারা প্ল্যাকার্ড হাতে অবস্থান ধর্মঘট করেন এবং পুলিশ সহজেই তাঁদের ধরে ফেলে। পুলিশ ট্রেন ও বাসে আসা আন্দোলনকারীদের দ্রুত আটক করে। নেহার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আইসার ২৫ বছর বয়সী ছাত্রনেতা দানিশ আলী বলেন, ‘নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে আমাদের দল দীর্ঘদিন গোপনে পরিচালিত হতো। ১৯৩১ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ব্রিটিশ শাসকেরা ভগত সিংকে ফাঁসি দিয়েছিল।

শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলতি বছরের শুরুর দিকে নেহা ও তাঁর সহকর্মীরা যন্তর মন্তরে টানা কয়েক সপ্তাহ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।

সেই আন্দোলন চলাকালীন নেহার মা সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন, যা সে সময় বেশ আলোচিত হয়েছিল। অন্যদিকে মোদির হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি বাম রাজনীতিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে।

আইসার জ্যেষ্ঠ নেতা ও নেহার পরামর্শক এন সাই বালাজি জানান, সেই অনশনই নেহাকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে এবং সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দেয়।

মোদি সরকার সাধারণত রাজনৈতিক বিরোধীদের ‘দেশবিরোধী’ তকমা দিয়ে থাকে, তবে নেহার মতে, এই অপপ্রচার সফল হয় না কারণ সাধারণ মানুষ এই তরুণ নেত্রীর মধ্যে আশার আলো দেখতে পায়।

নেহার জনপ্রিয়তার বিষয়টি এতটাই বেড়েছে যে, সফটওয়্যার ডেভেলপাররা তাঁকে নিয়ে সুপার মারিও ধাঁচের একটি ভিডিও গেম তৈরি করেছেন। গেমের প্রধান চরিত্র পুলিশের ব্যারিকেড টপকে ‘গণতন্ত্র পয়েন্ট’ সংগ্রহ করে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে এগিয়ে চলে। এছাড়া দিল্লির ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নিশিতা নাথসহ অনেকে তাঁকে ‘গণতন্ত্রের দেবী’ বলে আখ্যায়িত করছেন। হংকংয়ের আন্দোলনকারী নেত্রী অ্যাগনেস চাউয়ের সঙ্গে নেহার তুলনা করে অনেকে বলছেন, তিনি ভারতের রাজনীতিতে এক নতুন ধারা তৈরি করছেন। তবে নেহা নিজেই এই ধরনের উপমার ঘোর বিরোধী। দিল্লির ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নিশিতা নাথ চলতি মাসের শুরুর দিকে সেন্ট্রাল দিল্লিতে বসে বলেন, ‘আমরা কি নেহাকে “গণতন্ত্রের দেবী” বলতে পারি। নেহার রাজপথের রাজনীতি বুঝতে হলে আগে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।

পুলিশের কঠোর বাধা সত্ত্বেও নেহা যেভাবে আন্দোলনের ডাক দেন, তা অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। গত ১০ অক্টোবর যখন মোদি সরকার পুরো নয়াদিল্লি কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছিল, তখন নেহা ইনস্টাগ্রাম লাইভে এসে সরাসরি তরুণদের সংগঠিত করেন। তিনি অ্যানিমে ‘ওয়ান পিস’–এর টি–শার্ট পরে দক্ষিণ দিল্লির অভিজাত এলাকায় উপস্থিত হয়ে পুলিশের নজর এড়িয়ে কর্মসূচি চালিয়েছিলেন। এছাড়া ওই সপ্তাহে আরও কয়েকবার তিনি পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে সমর্থকদের নিয়ে বিক্ষোভ করতে সক্ষম হন। অনেক ছাত্রনেতাকে নিজ নিজ বাড়িতে নজরবন্দী করা হয়। ১০ অক্টোবর পুলিশ তরুণ নেতাদের আগেই আটক করার জন্য তৎপর হবে জেনে আইসার কর্মীরা নেহাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নেহার মতো তরুণ নেতাদের জন্য পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্বাচনী রাজনীতির ময়দানে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করা। নয়াদিল্লিভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলী মনে করেন, আইসার মতো সংগঠনের পক্ষে সরাসরি সংসদীয় নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মতো সাংগঠনিক ভিত এখনো গড়ে ওঠেনি। তাই নেহার মতো নেতাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য বড় কোনো মূলধারার জাতীয় দলে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে নেহা ও তাঁর সহকর্মীরা তাদের গেরিলা কৌশল ও তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ততাকে বড় শক্তি হিসেবে দেখছেন। ১৯৯০–এর দশকে তারা সশস্ত্র পথ ত্যাগ করে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় যুক্ত হয়, যদিও তাদের কিছু ভাঙনধারা এখনো সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পক্ষপাতী।

স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘আরবান নকশাল’ বা ‘বুদ্ধিজীবী নকশালদের’ বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিয়েছিলেন, যা নেহার মতো বামপন্থী নেতাদের লক্ষ্য করেই বলা হয়েছে বলে মনে করা হয়। বিজেপির এই অবস্থানকে নেহা ভারতের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ হিসেবে দেখেন। তিনি আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপ্লবী ধারার প্রকৃত উত্তরসূরিদের অস্বীকার করে জাতীয়তাবাদের দাবি করা যায় না। নেহা বোরা বর্তমানে কেবল একজন ছাত্রনেত্রী নন, বরং মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রধান কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছেন। বেইজিংয়ের চাপিয়ে দেওয়া যেসব আইনকে সমালোচকেরা কঠোর ও দমনমূলক বলে অভিহিত করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে অ্যাগনেস এই উপাধি পেয়েছিলেন।