বিশ্বের জ্বালানি বাজারে বড় ধাক্কা বাকি: সতর্ক করল কাতার
- আপডেট সময় : ১০:১৩:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ ৪৩ বার পড়া হয়েছে
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যে নজিরবিহীন অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে, তার সবচেয়ে মারাত্মক আঘাতটি এখনো বাকি রয়েছে বলে সতর্ক বার্তা দিয়েছেন কাতারের উপ-প্রধানমন্ত্রী শেখ সৌদ বিন আবদুর রহমান আল থানি। তিনি মনে করেন, আগামী দিন ও মাসগুলোতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক চাপ আরও তীব্র হতে পারে। তিনি বলেন, ইরান আমাদের প্রতিবেশী। এ পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকা-েও প্রভাব পড়তে পারে। তাদের সঙ্গে বসবাসের উপায় আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। কাতারের কাছ থেকে যেভাবে বিমান উপহার পেয়েছিলেন ট্রাম্প।
সোমবার দোহায় আয়োজিত গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোরামে অংশ নিয়ে দেশটির প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা শেখ সৌদ বিন আবদুর রহমান আল থানি এ আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জ্বালানি খাতের বিদ্যমান বৈশ্বিক সংকট এখনো চূড়ায় পৌঁছায়নি এবং সামনের দিনে এর প্রভাব আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলসহ কাতারের সামনে যেসব নিরাপত্তাঝুঁকি ঝুলছে, সেগুলোর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আল থানি সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার শঙ্কা প্রকাশ করেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন ও ইসরাইলি আক্রমণ এবং তার জবাবে তেহরানের পাল্টা আঘাতের পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল রুট হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রধান এই নৌপথে চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
গত মার্চ মাসে কাতারের গুরুত্বপূর্ণ রাস লাফান শিল্প কমপ্লেক্সে ইরানি হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোগুলো পুরোপুরি মেরামত করতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। ওই সারপ্রাইজ হামলা সম্পর্কে আল থানি বলেন, তারা ঘটনাটিতে অত্যন্ত বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। তবে এ ঘটনার পরও তেহরানের সঙ্গে দোহার যোগাযোগের পথ বন্ধ হয়নি বলে জানান তিনি।
বিগত হামলার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কাতার তাদের জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ও কৌশলগত স্থাপনাগুলো নিরাপদ রাখতে নতুন প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। এদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসা- যাওয়া করা বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর কোনো ধরনের ট্রানজিট ফি বা টোল বসানোর সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধিতা করেছেন কাতারের উপ-প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, এ ধরনের ফি আরোপ শেষ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী সাধারণ গ্রাহকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করবে। তার ভাষায়, মধ্যস্থতা করার অর্থ এই নয় যে আমাদের পক্ষ থেকে যেকোনো প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত নয়- এমনটা ভাবতে হবে।
ইরানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আল থানি জানান, সংঘাত সত্ত্বেও তারা কখনোই তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেননি। কৌশলগত ও অর্থনৈতিক কারণে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কূটনীতি বজায় রাখা জরুরি। হামলার আগে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল গভীর আস্থার, কারণ তারা যৌথভাবে বিশ্বমানের একটি বিশালাকার সামুদ্রিক গ্যাসক্ষেত্র ভাগাভাগি করে এবং তাদের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক স্বার্থ জড়িত। হামলার বিষয়ে জানতে চাইলে আল থানি বলেন, আমরা বিস্মিত হয়েছিলাম।
সংকট নিরসনে মধ্যস্থতার উদ্যোগ হিসেবে কাতার, পাকিস্তান ও ওমানের যৌথ প্রয়াস সফল হওয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন আল থানি। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী শান্তির জন্য জিসিসিভুক্ত দেশগুলো, তুরস্ক, পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বয়ে বিস্তৃত আঞ্চলিক আলোচনার ওপর জোর দেন তিনি। কাতার চায় আলোচনার পাশাপাশি ইরানের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে, যেন ভবিষ্যৎ সংঘাত এড়ানো যায়; ঠিক যেভাবে কয়েক দশকের শত্রুতা ভুলে জার্মানি ও ফ্রান্স পারস্পরিক সমঝোতা গড়ে তুলেছিল। তবে তার মতে, টেকসই সমাধানের জন্য আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংলাপ প্রয়োজন। এতে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্যদেশগুলো, পাকিস্তান ও তুরস্কের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মিত্রদেরও যুক্ত করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গত তিন-চার দশকের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সুফল তুলে ধরে তিনি জানান, দুই দেশের যৌথ সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের কারণেই তারা সম্ভাব্য হামলার ৯০ শতাংশের বেশি সফলতা সহকারে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমানে কাতারে অবস্থিত আল উদেইদ বিমান ঘাঁটির সুরক্ষা ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে, যেখানে মার্কিন সেনার পাশাপাশি অন্যান্য মিত্র দেশের সদস্যরাও কর্মরত আছেন। মার্চ মাসের শুরুতে ওই ঘাঁটিতে ইরানি হামলার চেষ্টা করা হলে কাতার সফলভাবে ইরানের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে। এ ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও সামরিক সদস্যদের পাশাপাশি অন্য অংশীদার দেশগুলোর সামরিক কর্মীরাও অবস্থান করেন।
কাতার এখন আঞ্চলিক স্তরে একটি নতুন নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার কাজ শেষ পর্যায়ে এনেছে। নতুন এই উদ্যোগে মূলত আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা, ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা এবং সাইবার নিরাপত্তাকে শীর্ষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। খুব শিগগিরই এই নতুন আঞ্চলিক জোটের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে বলে নিশ্চিত করলেও এতে অংশ নিতে যাওয়া অন্যান্য দেশের নাম এখনও প্রকাশ করেননি তিনি। কাতার মধ্যস্থতা চালিয়ে গেলেও নিজেদের ভূখণ্ড ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সামরিক দিক থেকে কোনো ছাড় দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দেন উপ-প্রধানমন্ত্রী। আল থানি বলেন, আজ আমি আনন্দের সঙ্গে আরও ঘোষণা করছি, শিগগিরই আমরা একটি নতুন অংশীদারিত্বের ঘোষণা দেব।
























