ঢাকা ০১:৫৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

মিডিয়া ট্রায়াল ও ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের নেপথ্য বিতর্ক

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:০০:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ ৩৫ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সম্প্রতি ইশরাক হোসেনকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমে যে ধরনের প্রচারণামূলক কার্যক্রম দেখা গেছে, তা অনেকটা মিডিয়া ট্রায়ালের পর্যায়ে পড়ে। অতীতে ইরাক ও আফগান যুদ্ধের প্রাক্কালে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে বিতর্কিত ভূমিকা নিয়েছিল, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও তেমনটি ঘটছে। গত ১৫ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী ও তারেক রহমানকে লক্ষ্য করে সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে চরিত্র হননের মিশনে লিপ্ত ছিল, সাম্প্রতিক ইশরাক ইস্যুটি তারই ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হচ্ছে। আমরা এক বিপুল মিডিয়া ট্রায়ালের ঘটনা দেখলাম। গণমাধ্যম যে মাঝে মাঝে বিতর্কিত ভূমিকায় উপনীত হয় এটা আমরা ইরাক ও আফগান যুদ্ধের পূর্বে আমেরিকার বিভিন্ন মিডিয়ার সংবাদ প্রকাশের ধরন দেখে হাতেনাতে প্রমাণ পেয়েছি। বাংলাদেশে তো সাংবাদিকতার নামে একদল লোকের চরিত্র নির্মাণ ও আরেক দল লোকের চরিত্র নাশের এক নগ্ন খেলায় পরিণত হতে আমরা এর আগে বহু দেখেছি। আজকে যিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, জনাব তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে মিডিয়াগুলোর চরিত্রনাশা মিশন আমরা বিগত ১৫ বছর ভালো মতোই দেখেছি। বিধি মোতাবেক তা বে-আইনি এটা বলার সুযোগ নাই।

পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন ইশরাক হোসেন। ওই এলাকাটি মাদক কারবারিদের অন্যতম আস্তানা হিসেবে পরিচিত। এর আগে সেখানে সন্ত্রাসীরা পুলিশের ওপর গুলি চালিয়েছিল, যার ফলে এলাকাবাসীর মধ্যে ভীতি কাজ করছিল। আত্মরক্ষার অংশ হিসেবেই ইশরাক তার নিজের লাইসেন্স করা বৈধ অস্ত্র সাথে রেখেছিলেন। এটি আইনত অপরাধ না হলেও গণমাধ্যমে সেটিকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে তার সেই জনগুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের চেয়ে ‘অস্ত্র হাতে ইশরাক’—এই বিষয়টিই বড় করে দেখানো হয়েছে। অথচ কেন পুলিশ সেই অভিযানে সক্রিয় ছিল না বা মাদকের ভয়াল থাবা থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে কোনো গঠনমূলক আলোচনা হয়নি। মার্শাল ম্যাকলোহানের সেই বিখ্যাত উক্তি ‘মিডিয়া ইজ দ্য মেসেজ’-এর প্রতিফলন ঘটেছে এই ঘটনায়।

ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের বিষয়টি ছিল এই পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দু। যখন গণমাধ্যমে খবর ছড়ায় যে প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগ করতে বলেছেন, তখনো বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। এমনকি বিটিভি থেকে খবর প্রচার করা হয়েছিল যে, প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন, যা পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ‘ভুয়া’ বলে প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং সংশোধন করতে বলা হয়। পরদিন দুপুরে ইশরাক নিজেই সংবাদ সম্মেলন করে জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নয়, বরং নিজেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, পপুলার সেন্টিমেন্টকে ব্যবহার করে যেন প্রধানমন্ত্রীর জনকল্যাণমুখী উদ্যোগগুলোকে আড়াল করা না হয়, সেজন্যই তিনি এই পথ বেছে নিয়েছেন।

গণমাধ্যমের এই প্রপাগান্ডা আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটের মনোবল বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইশরাক। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, মাদকবিরোধী অভিযানের পর যখন একজন নেতাকে পদত্যাগ করতে হয়, তখন মাদক সম্রাটরা কি আরও উৎসাহিত হবে না? এছাড়া ইতালিয়ান চিন্তক উমবার্তো একোর তত্ত্ব অনুযায়ী, আধুনিক সেন্সরশিপ কেবল খবর গোপন করে নয়, বরং আসল ইস্যুকে আড়াল করে গৌণ বিষয়কে বড় করে উপস্থাপন করে। ইশরাক ইস্যুতেও মূলত মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে নজর সরিয়ে তাকেই ভিলেন বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথাও বলে নি। এ ছাড়া পুরো অভিযানের মধ্যে এটা মাত্র কয়েক মিনিটের দৃশ্য।

রাজনীতির মাঠে বিএনপিকে কোণঠাসা করার কৌশল হিসেবেও অনেক সময় এ ধরনের হাইপ তৈরি করা হয়। সরকারের ভেতর ও বাইরের শত্রুদের একটি অংশ সম্মিলিতভাবে দলকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করছে বলে অনেকের ধারণা। এছাড়া ইশরাকের কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য বা ইনটেনশন না দেখে কেবল কর্ম বা অ্যাকশনকে বিচার করা হয়েছে, যা একপাক্ষিক পপুলার জাজমেন্টের নামান্তর। অপরাধের বিচারে ইনটেনশন সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর, যা আদালত বিবেচনায় নেয়, কিন্তু এখানে মিডিয়া ট্রায়ালে সেটি উপেক্ষিত হয়েছে।

সবশেষে, এই পদত্যাগের পর ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক পুনর্জন্ম হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি কেবল মন্ত্রী হিসেবে নন, বরং জননেতা হিসেবে নতুন পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তিনি নিজেকে জনগণের মানুষ হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন। মাঠের রাজনীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে তার কার্যক্রম আরও সক্রিয়ভাবে চালিয়ে যাওয়ার জন্যই তিনি এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

মিডিয়া ট্রায়াল ও ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের নেপথ্য বিতর্ক

আপডেট সময় : ০৭:০০:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

সম্প্রতি ইশরাক হোসেনকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমে যে ধরনের প্রচারণামূলক কার্যক্রম দেখা গেছে, তা অনেকটা মিডিয়া ট্রায়ালের পর্যায়ে পড়ে। অতীতে ইরাক ও আফগান যুদ্ধের প্রাক্কালে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে বিতর্কিত ভূমিকা নিয়েছিল, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও তেমনটি ঘটছে। গত ১৫ বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী ও তারেক রহমানকে লক্ষ্য করে সংবাদমাধ্যমগুলো যেভাবে চরিত্র হননের মিশনে লিপ্ত ছিল, সাম্প্রতিক ইশরাক ইস্যুটি তারই ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হচ্ছে। আমরা এক বিপুল মিডিয়া ট্রায়ালের ঘটনা দেখলাম। গণমাধ্যম যে মাঝে মাঝে বিতর্কিত ভূমিকায় উপনীত হয় এটা আমরা ইরাক ও আফগান যুদ্ধের পূর্বে আমেরিকার বিভিন্ন মিডিয়ার সংবাদ প্রকাশের ধরন দেখে হাতেনাতে প্রমাণ পেয়েছি। বাংলাদেশে তো সাংবাদিকতার নামে একদল লোকের চরিত্র নির্মাণ ও আরেক দল লোকের চরিত্র নাশের এক নগ্ন খেলায় পরিণত হতে আমরা এর আগে বহু দেখেছি। আজকে যিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, জনাব তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে মিডিয়াগুলোর চরিত্রনাশা মিশন আমরা বিগত ১৫ বছর ভালো মতোই দেখেছি। বিধি মোতাবেক তা বে-আইনি এটা বলার সুযোগ নাই।

পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন ইশরাক হোসেন। ওই এলাকাটি মাদক কারবারিদের অন্যতম আস্তানা হিসেবে পরিচিত। এর আগে সেখানে সন্ত্রাসীরা পুলিশের ওপর গুলি চালিয়েছিল, যার ফলে এলাকাবাসীর মধ্যে ভীতি কাজ করছিল। আত্মরক্ষার অংশ হিসেবেই ইশরাক তার নিজের লাইসেন্স করা বৈধ অস্ত্র সাথে রেখেছিলেন। এটি আইনত অপরাধ না হলেও গণমাধ্যমে সেটিকে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে তার সেই জনগুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের চেয়ে ‘অস্ত্র হাতে ইশরাক’—এই বিষয়টিই বড় করে দেখানো হয়েছে। অথচ কেন পুলিশ সেই অভিযানে সক্রিয় ছিল না বা মাদকের ভয়াল থাবা থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষায় কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়ে কোনো গঠনমূলক আলোচনা হয়নি। মার্শাল ম্যাকলোহানের সেই বিখ্যাত উক্তি ‘মিডিয়া ইজ দ্য মেসেজ’-এর প্রতিফলন ঘটেছে এই ঘটনায়।

ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের বিষয়টি ছিল এই পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দু। যখন গণমাধ্যমে খবর ছড়ায় যে প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগ করতে বলেছেন, তখনো বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। এমনকি বিটিভি থেকে খবর প্রচার করা হয়েছিল যে, প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছেন, যা পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ‘ভুয়া’ বলে প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং সংশোধন করতে বলা হয়। পরদিন দুপুরে ইশরাক নিজেই সংবাদ সম্মেলন করে জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নয়, বরং নিজেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, পপুলার সেন্টিমেন্টকে ব্যবহার করে যেন প্রধানমন্ত্রীর জনকল্যাণমুখী উদ্যোগগুলোকে আড়াল করা না হয়, সেজন্যই তিনি এই পথ বেছে নিয়েছেন।

গণমাধ্যমের এই প্রপাগান্ডা আন্তর্জাতিক মাদক সিন্ডিকেটের মনোবল বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইশরাক। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, মাদকবিরোধী অভিযানের পর যখন একজন নেতাকে পদত্যাগ করতে হয়, তখন মাদক সম্রাটরা কি আরও উৎসাহিত হবে না? এছাড়া ইতালিয়ান চিন্তক উমবার্তো একোর তত্ত্ব অনুযায়ী, আধুনিক সেন্সরশিপ কেবল খবর গোপন করে নয়, বরং আসল ইস্যুকে আড়াল করে গৌণ বিষয়কে বড় করে উপস্থাপন করে। ইশরাক ইস্যুতেও মূলত মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে নজর সরিয়ে তাকেই ভিলেন বানানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথাও বলে নি। এ ছাড়া পুরো অভিযানের মধ্যে এটা মাত্র কয়েক মিনিটের দৃশ্য।

রাজনীতির মাঠে বিএনপিকে কোণঠাসা করার কৌশল হিসেবেও অনেক সময় এ ধরনের হাইপ তৈরি করা হয়। সরকারের ভেতর ও বাইরের শত্রুদের একটি অংশ সম্মিলিতভাবে দলকে বিপদে ফেলার চেষ্টা করছে বলে অনেকের ধারণা। এছাড়া ইশরাকের কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য বা ইনটেনশন না দেখে কেবল কর্ম বা অ্যাকশনকে বিচার করা হয়েছে, যা একপাক্ষিক পপুলার জাজমেন্টের নামান্তর। অপরাধের বিচারে ইনটেনশন সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর, যা আদালত বিবেচনায় নেয়, কিন্তু এখানে মিডিয়া ট্রায়ালে সেটি উপেক্ষিত হয়েছে।

সবশেষে, এই পদত্যাগের পর ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক পুনর্জন্ম হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি কেবল মন্ত্রী হিসেবে নন, বরং জননেতা হিসেবে নতুন পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তিনি নিজেকে জনগণের মানুষ হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন। মাঠের রাজনীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে তার কার্যক্রম আরও সক্রিয়ভাবে চালিয়ে যাওয়ার জন্যই তিনি এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়।