হ্যামট্রামিক মেয়র নির্বাচন: ১২ ভোটে এগিয়ে বাংলাদেশি মুহিত মাহমুদ
- আপডেট সময় : ০৭:০০:১৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ৩৮ বার পড়া হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের হ্যামট্রামিক সিটির মেয়র নির্বাচনে এক নতুন ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী মুহিত মাহমুদ। দীর্ঘ এক বছরের আইনি লড়াইয়ের পর আদালতের নির্দেশে বিতর্কিত ৩৭টি ব্যালট পুনর্গণনার ফলে নির্বাচনের সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এই ফলাফলের ভিত্তিতে এখন বর্তমান মেয়র অ্যাডাম আলহারবির চেয়ে ১২ ভোটে এগিয়ে রয়েছেন মুহিত মাহমুদ। যদি আদালতের চূড়ান্ত রায় তাঁর পক্ষেই থাকে, তবে তিনিই হবেন হ্যামট্রামিক সিটির ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মেয়র। বাকি দুটি ব্যালট অন্যভাবে হিসাবভুক্ত হয়। একসময় শিল্পকারখানানির্ভর অভিবাসী শহর হিসেবে পরিচিত হ্যামট্রামিক আজ যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বসতি। হ্যামট্রামিক এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ শহর হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পায়। ২০২১ সালের নির্বাচনে ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত আমের গালিব শহরটির প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হন। ২০২২ সালে তিনি হ্যামট্রামিক সিটি কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বাংলাদেশে ইসলামি ইতিহাস বিষয়ে পড়াশোনা করা মুহিত যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হ্যামট্রামিক মেয়র নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সে সময় অ্যাডাম আলহারবি মাত্র ১১ ভোটের ব্যবধানে মুহিত মাহমুদকে পরাজিত করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ঠিক পরদিন নগরীর ক্লার্কের দপ্তরে ডাকযোগে আসা ৩৭টি ব্যালট পাওয়া যায়, যা মূল গণনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এ নিয়ে শুরু হয় তীব্র বিতর্ক এবং আইনি লড়াই। মুহিত মাহমুদ এই ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা করেন। এরপর চলতি বছরের মার্চে মিশিগান কোর্ট অব আপিল নিম্ন আদালতের পূর্বের রায় বাতিল করে নতুন করে বিষয়টি পর্যালোচনার আদেশ দেয়। এ কারণে ওয়েইন কাউন্টির নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রথমে ব্যালটগুলো গণনায় অন্তর্ভুক্ত করেননি। মার্কিন গণমাধ্যম ডব্লিউডিইটি ২০২৫ সালের নির্বাচনের আগেই মুহিত মাহমুদের প্রার্থিতাকে এই ঐতিহাসিক সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছিল। নগর প্রশাসনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০২৫ সালে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
সেই ধারাবাহিকতায় ওয়েইন কাউন্টি সার্কিট কোর্টের বিচারক ক্যাথলিন ম্যাকার্থি বিতর্কিত ৩৭টি ব্যালট গণনার নির্দেশ প্রদান করেন। গত ১৬ অক্টোবর শুক্রবার ওয়েইন কাউন্টি বোর্ড অব ক্যানভাসার্স আদালতের সেই নির্দেশ অনুযায়ী ব্যালটগুলো পুনরায় গণনা করে। ডব্লিউডিআইভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন করে গণনা করা ব্যালটগুলোতে মুহিত মাহমুদ পেয়েছেন ২৯টি ভোট, আর অ্যাডাম আলহারবি পেয়েছেন ৬টি। এই পরিবর্তনের ফলে সংশোধিত অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে মুহিতের মোট ভোট দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৯-এ এবং আলহারবির ভোট দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৭-এ। অর্থাৎ, আগের ১১ ভোটের ব্যবধান পেছনে ফেলে মুহিত মাহমুদ এখন ১২ ভোটের লিড নিয়েছেন। ভোট পুনর্গণনার পরও ওই ব্যবধান বহাল থাকায় আলহারবিকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ডব্লিউডিআইভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন করে গণনা করা ব্যালটগুলোর মধ্যে মুহিত পান ২৯ ভোট এবং আলহারবি পান ৬ ভোট। তাঁর আইনজীবী নাবিহ আয়াদ জানিয়েছেন, বিতর্কিত ব্যালটগুলোর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিয়ে আইনি আপত্তি অব্যাহত থাকবে।
উল্লেখ্য যে, মুহিত মাহমুদের নাগরিকত্ব ও আবাসিক যোগ্যতা নিয়ে প্রতিপক্ষ প্রশ্ন তুললেও তিনি দাবি করেছেন যে, তিনি হ্যামট্রামিকের একজন বৈধ বাসিন্দা এবং নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করেই প্রার্থী হয়েছেন। এই গুরুত্বপূর্ণ মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী ২২ অক্টোবর ওয়েইন কাউন্টি সার্কিট কোর্টে অনুষ্ঠিত হবে। আদালতের পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত এই সংশোধিত নির্বাচনী ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়ন করা সম্ভব নয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি ভোটের সঠিক গণনা, স্বচ্ছতা এবং আদালতের মাধ্যমে ভোটাধিকার রক্ষার বিষয়টিকে সামনে নিয়ে এসেছে। ব্যালটগুলোর সংরক্ষণ ও হস্তান্তরসংক্রান্ত নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০০০ সালে মিশিগানে আসার পর তিনি পড়াশোনা, কর্মজীবন ও কমিউনিটি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। তিনি এমজিএম গ্র্যান্ড ক্যাসিনোতে কাজ করেছেন এবং শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃত্বের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। নির্বাচনী প্রচারে স্থানীয় সড়ক ও অবকাঠামোর উন্নয়ন, সম্পত্তিকর, পানির বিল এবং নাগরিক সেবার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল। প্রয়োজনে পুনর্গণনাসহ পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও তাঁদের বিবেচনায় রয়েছে। এ ছাড়া মুহিত মাহমুদের বসবাসের ঠিকানা নিয়েও বিরোধ রয়েছে।
একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী হিসেবে মুহিত মাহমুদের এই এগিয়ে থাকা স্থানীয় রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। মামলার রায় শেষ পর্যন্ত তাঁর অনুকূলে এলে এটি কেবল হ্যামট্রামিকের প্রশাসনিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে না, বরং আমেরিকার মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের অগ্রযাত্রার একটি মাইলফলক হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে থাকবে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ডব্লিউডিআইভি ও ডব্লিউডব্লিউজে নতুন এই ফলাফল নিশ্চিত করেছে। এ অর্জন কেবল একজন প্রবাসী বাংলাদেশির ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সাফল্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসেও যুক্ত করবে নতুন অধ্যায়। ডেট্রয়েট নগরীর ভেতরে অবস্থিত ছোট এই শহরে কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশি অভিবাসীরা ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছেন। অভিবাসীদের প্রথম প্রজন্ম যেখানে জীবিকা ও পরিবার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বেশি মনোযোগী ছিল, সেখানে পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিরা নগর প্রশাসন ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দায়িত্বেও এগিয়ে এসেছেন। একই সময়ে নগর পরিষদেও মুসলিম জনপ্রতিনিধিদের পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।


























