নিউইয়র্কে মেধাবী নৃত্যশিল্পী তাসিন ফেরদৌসের অকাল প্রয়াণ
- আপডেট সময় : ০৫:৫৪:৪৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ৩৮ বার পড়া হয়েছে
জীবন যে কতটা অনিশ্চিত ও নির্মম হতে পারে, তারই এক হৃদয়বিদারক নজির হয়ে রইল তাসিন ফেরদৌসের অকালমৃত্যু। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে, জীবনের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময়ে স্বামী এড্রিয়ান, শিশুপুত্র লুকাস, মা-বাবা এবং অসংখ্য শুভানুধ্যায়ীকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নিলেন নিউইয়র্কের এই মেধাবী নৃত্যশিল্পী, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। গত ১৮ অক্টোবর রোববার ভোরে নিউইয়র্কের কুইন্সের জ্যামাইকা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাসিন ছিলেন নিউইয়র্কের সুপরিচিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পারফর্মিং আর্টস (বিপা)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক এ্যানি ফেরদৌস এবং বিশিষ্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও ট্রাভেল এজেন্সির স্বত্বাধিকারী জাফর ফেরদৌসের একমাত্র কন্যা। পরিস্থিতি এতটাই সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাসিন দুইবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হন।
নতুন ঠিকানায় স্বপ্নের অপমৃত্যু
মাত্র এক সপ্তাহ আগেই স্বামী এড্রিয়ান ও শিশুপুত্র লুকাসকে নিয়ে কুইন্সে নিজেদের সদ্য কেনা নতুন বাড়িতে উঠেছিলেন তাসিন। নতুন বাড়ি, নতুন পরিবেশ, নতুন করে সংসার সাজানোর কত স্বপ্ন, কত পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। কিন্তু সেই স্বপ্নের সংসার আর সাজানো হলো না। নতুন বাড়িতে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হতে না হতেই চিরদিনের জন্য থেমে গেল তাসিনের জীবন। অকালে তাঁর এই মৃত্যু পরিবারসহ পুরো কমিউনিটিকে গভীর শোকের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে। মৃত্যুর কয়েকদিন আগে থেকেই তাসিন অসুস্থ বোধ করছিলেন। ঘটনার সূত্রপাত গত ১৬ অক্টোবর শুক্রবার, যখন তিনি হাতে অসহনীয় ব্যথা অনুভব করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তিনি তাৎক্ষণিক মা এ্যানি ফেরদৌসকে বিষয়টি অবগত করেন। পরিবারের পরিচিত একজন চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা হলে তিনি দেরি না করে তাসিনকে দ্রুত জরুরি বিভাগে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তির পরও তাঁর শারীরিক সমস্যাকে শুরুতে খুব একটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকেরা তাঁর শরীরে মারাত্মক সংক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। কিন্তু নিয়তির অমোঘ টানে ১৮ অক্টোবর রোববার ভোরে মৃত্যুর কাছে হার মানেন তাসিন। তাঁর অকালমৃত্যুতে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তাসিনের মেধা ও সৃজনশীলতা তাঁকে অনেকের কাছেই প্রিয় করে তুলেছিল। বিশেষ করে নৃত্যশিল্পী হিসেবে তাঁর দক্ষতা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে সংস্কৃতিচর্চার আগ্রহ তৈরিতে তাঁর ভূমিকা প্রশংসিত ছিল। পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্যমতে, তাসিন সবসময় হাসিখুশি থাকতেন এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার চেষ্টা করতেন। তাঁর মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো কমিউনিটির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাসিনের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় পরিবারের পক্ষ থেকে সকলের কাছে দোয়া চেয়েছেন তাঁর প্রিয়জনরা। শেষ বিদায়ে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীরা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাঁকে স্মরণ করছেন। তাসিনের অকালমৃত্যু চিকিৎসা ব্যবস্থার গাফিলতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি জীবনের অনিশ্চয়তাকে আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল। একটি সাজানো সংসারের স্বপ্ন মুহূর্তেই পরিণত হলো গভীর শোক আর অপূরণীয় শূন্যতায়। সামান্য হাতব্যথা থেকে মৃত্যু, কী ঘটেছিল সেই কয়েক দিনে: তাসিনের মৃত্যুকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কীভাবে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে একটি আপাতসাধারণ শারীরিক সমস্যা এত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনল। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা ধারণা করেন, পেশিতে টান বা মাসল পুলের কারণে ব্যথা হয়ে থাকতে পারে। তাঁকে ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। মেয়ের শারীরিক অবস্থার কথা শুনে উদ্বিগ্ন মা ছুটে যান তাঁর বাসায়। পাশাপাশি হাতে ছোট ছোট ক্ষতও দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। শুক্রবার রাত থেকে রোববার ভোর, এত অল্প সময়ের মধ্যে একটি প্রাণবন্ত তরুণীর এমন করুণ পরিণতি পরিবার, স্বজন এবং পরিচিতজনদের কাছে এখনো অবিশ্বাস্য। প্রাথমিকভাবে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের আশঙ্কা করা হলেও কোন ধরনের ব্যাকটেরিয়া এই সংক্রমণের জন্য দায়ী ছিল, কীভাবে তা শরীরে প্রবেশ করেছিল এবং এত দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি ঘটল কেন, এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্ত বা অটোপসির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে পরিবার আশা করছে। সংক্রমণটি কি আগেই শনাক্ত করা সম্ভব ছিল। সময়মতো যথাযথ চিকিৎসা পাওয়া গেলে কি তাসিনের জীবন বাঁচানো যেত। এসব প্রশ্ন এখন শোকাহত পরিবারের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি, চিকিৎসকদের বক্তব্য এবং ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন ছাড়া চিকিৎসায় অবহেলা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কোথায় কী থাকবে, কীভাবে সাজাবেন নিজের সংসার, কীভাবে বেড়ে উঠবে ছোট্ট লুকাস, এমন কত পরিকল্পনাই না ছিল তাঁর। স্বামী এড্রিয়ানের জীবনে নেমে এসেছে অকল্পনীয় শূন্যতা।
স্মরণে তাসিন ফেরদৌস
- পেশা: নৃত্যশিল্পী, শিক্ষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক
- মৃত্যু তারিখ: ১৮ অক্টোবর, রোববার
- মৃত্যু স্থান: জ্যামাইকা হাসপাতাল, কুইন্স, নিউইয়র্ক
- পরিবারের দাবি: শারীরিক অবস্থার গুরুত্ব ঠিকমতো মূল্যায়ন করা হয়নি
- প্রাথমিক কারণ: শরীরে মারাত্মক সংক্রমণ

























