ডায়েট করেও ওজন কমছে না? যে ৯টি ভুল হতে
- আপডেট সময় : ০৮:০২:১০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে
অনেকেই ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ডায়েট মেনে চলেন, কিন্তু প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া যায় না। কখনো ওজন কমে না, আবার কখনো ডায়েট ছেড়ে দেওয়ার পর তা দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে আসে। ডায়েটের ক্ষেত্রে সাধারণ কিছু ভুল, খাদ্যাভ্যাসের অসংগতি এবং অবাস্তব প্রত্যাশার কারণে এমনটা হতে পারে। ওজন কমানোর পথে অন্তরায় হতে পারে এমন ৯টি সাধারণ ভুলের বিস্তারিত নিচে তুলে ধরা হলো। অনেকের ধারণা, ডায়েট করতে হলে বিশেষ কিছু খাবার খেতেই হবে। কিছু মানুষ কয়েক দিন কঠোরভাবে ডায়েট করেন, তারপর হঠাৎ তা ছেড়ে দেন।
১. দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকা: অনেকেই মনে করেন না খেয়ে থাকলে দ্রুত ওজন কমবে, তাই নাশতা বা দুপুরের খাবার বাদ দিয়ে চলেন। এটি ভুল পদ্ধতি। দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকলে শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা বাড়ে, যা ওজন কমানোর লক্ষ্য নষ্ট করে। বরং অতিরিক্ত ক্ষুধার কারণে পরবর্তী সময়ে বেশি খাওয়া, দুর্বলতা কিংবা প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ, যে পদ্ধতিতে দ্রুত ওজন কমানোর আশা করছেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল দিতে পারে। তাই সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। বেসাল মেটাবলিক রেট (বিএমআর), অর্থাৎ বিশ্রামকালীন অবস্থায় শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তির পরিমাণও ব্যক্তিভেদে আলাদা।
২. ক্যালরি গণনায় ভুল খাবার নির্বাচন: ওজন নিয়ন্ত্রণে ক্যালরি গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেকেই ভুল খাবার বেছে নেন। কার্বোহাইড্রেট কমাতে ভাত বাদ দিয়ে মুড়ি, ওটস বা নুডলস খাওয়া শুরু করেন, কিন্তু এসব খাবারের ক্যালরি নির্ভর করে তাদের প্রস্তুতপ্রণালি ও পরিমাণের ওপর। তাই কেবল ভাত বাদ দেওয়া যথেষ্ট নয়, সুষম খাবারের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
৩. ডায়েটের ফাঁকে বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার: নিয়মিত নিয়ম মেনে চলার পাশাপাশি ছুটির দিনে বা অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড, চিনিযুক্ত পানীয় বা প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকস খাওয়ার প্রবণতা ওজন কমানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এতে শরীরে ক্যালরি ও ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ বেড়ে যায়। ফলে অন্যান্য সময়ে খাবার নিয়ন্ত্রণ করলেও মোট ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। সুস্থ থাকুন, সবল থাকুন, বাস্তবসম্মতভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণ করুন।
৪. দামি বা বিদেশি খাবারের প্রতি ঝোঁক: ওজন কমাতে ডিটক্স পানি, চিয়া সিড বা বিদেশি সালাদের মতো দামী খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা জরুরি নয়। আমাদের চারপাশে থাকা সহজলভ্য শাকসবজি, মৌসুমী ফল, ডাল ও মাছের মতো পুষ্টিকর খাবারগুলো সঠিক পরিমাণে গ্রহণ করেই কার্যকর ওজন কমানো সম্ভব। আমাদের দেশেই রয়েছে সহজলভ্য ও পুষ্টিকর নানা খাবার—শাকসবজি, মৌসুমি ফল, ডাল, ডিম, মাছ ও অন্যান্য প্রোটিনের উৎস।
৫. পুষ্টিকর খাবার ভেবে অতিরিক্ত গ্রহণ: ফল, বাদাম বা মাংস পুষ্টিকর হলেও তা ইচ্ছেমতো খাওয়া যায় না। ক্যালরি নিয়ন্ত্রণের জন্য সব ধরনের খাবারের নির্দিষ্ট পরিমাণ বজায় রাখা জরুরি। বিশেষ করে বাদামে উচ্চ ক্যালরি থাকায় তা অতিরিক্ত খাওয়া ওজন নিয়ন্ত্রণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
৬. ডায়েট ও ছাড়ার অনিয়মিত অভ্যাস: ডায়েট শুরু ও বন্ধ করার ‘অন-অফ’ চক্র ওজন নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা। সাময়িকভাবে কঠিন নিয়ম মেনে চলার চেয়ে দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর। ডায়েট মানে সপ্তাহের পাঁচ দিন কঠোর নিয়ম মেনে চলা আর বাকি দুই দিন ইচ্ছেমতো খাওয়া নয়।
৭. অন্যের ডায়েট অনুসরণ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা পরিচিত কারও ডায়েট চার্ট হুবহু নিজের ওপর প্রয়োগ করা ঠিক নয়। বয়স, উচ্চতা, শারীরিক অবস্থা ও বিপাকীয় চাহিদা (বিএমআর) ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। তাই নিজের শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে ভালো।
৮. জীবনযাপনে অসংগতি: শুধু ক্যালরি নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়। পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত হাঁটাচলা ও শরীরচর্চা এবং শরীরে পানির চাহিদা পূরণ করা ওজন কমানোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। পর্যাপ্ত ঘুম হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং শরীরকে সক্রিয় রাখে। শুধু ডায়েটে গুরুত্ব দিয়ে ব্যায়াম, ঘুম ও পানি উপেক্ষা করা। পর্যাপ্ত ঘুম ক্ষুধা ও তৃপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়ক।
৯. ওজন কমলেই ডায়েট ছেড়ে দেওয়া: এটি সবচেয়ে প্রচলিত ভুল। নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর পর পুরোনো খাদ্যাভ্যাসে ফিরে গেলে ওজন দ্রুত বাড়তে থাকে। তাই স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলো আজীবন ধরে রাখা প্রয়োজন। ওজন কমলেই ডায়েটকে বিদায় জানানো।
ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য জীবনযাত্রার কিছু মৌলিক পরিবর্তন জরুরি। ডায়েটের পাশাপাশি একজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য দৈনিক ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুম একান্ত প্রয়োজন। চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি জাতীয় খাবার, ট্রান্স ফ্যাট এবং স্যাচুরেটেড ফ্যাটের ব্যবহার যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪০ মিনিট হাঁটা বা শরীরচর্চা করার অভ্যাস করুন, তবে তা অবশ্যই আপনার শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী হতে হবে। এছাড়া শরীরে পানির চাহিদা মেটাতে সারা দিনে ৮ থেকে ১৪ গ্লাস পানি পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়, যদিও এটি ব্যক্তির শারীরিক পরিশ্রম ও আবহাওয়া অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।
সবশেষে, মনে রাখতে হবে যে ওজন বাড়াতে যেমন সময় লাগে, স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে তা কমাতে ধৈর্য ও মানসিক স্থিতির প্রয়োজন। দ্রুত ওজন কমানোর মোহে না পড়ে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। দীর্ঘস্থায়ী সুফলের জন্য পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে নিয়মিত জীবনযাপন বজায় রাখা জরুরি। তথ্যসূত্র: আয়শা আনিকা নাজনীন, পুষ্টিবিদ, প্রত্যয় মেডিক্যাল ক্লিনিক, বারিধারা। ধৈর্য ও মানসিক স্থিতিই সাফল্যের চাবিকাঠি।

























