ইসরায়েলি নির্বাচনে বড় পরীক্ষার মুখে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
- আপডেট সময় : ১০:৩০:৫৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে
ইসরায়েলে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আজ মঙ্গলবার এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হচ্ছেন। দেশটির পার্লামেন্ট ‘নেসেট’-এর ১২০টি আসনের নির্বাচনে নির্ধারিত হবে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। বর্তমান যুদ্ধপরিস্থিতি এবং ইরান ও ফিলিস্তিনের গাজা ইস্যুতে তাঁর নেতৃত্বের ওপর ভিত্তি করেই এই ভাগ্য নির্ধারণ হবে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর গাজায় শুরু হওয়া সর্বাত্মক যুদ্ধ এবং পরবর্তীতে ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হয় তিনি ইরান এবং ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধ এগিয়ে নিতে টিকে যাবেন, নয়তো ক্ষমতা থেকে বিদায় নেবেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। নির্বাচনের প্রাক্কালে সর্বশেষ জনমত জরিপগুলো বলছে, কঠিন চাপে পড়তে পারেন নেতানিয়াহু। প্রতিটি দল নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার অভিঘাত, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, ইরান যুদ্ধ এবং নেতানিয়াহুর সরকারের ডানপন্থী নীতি নিয়ে অভ্যন্তরীণ গভীর বিভাজন—এসব নিয়ে উত্তাল রয়েছে ইসরায়েলের সমাজ–রাজনীতি। নেতানিয়াহুর বিরোধীদের অনেকে ৭ অক্টোবরের ওই হামলার দিনে ইসরায়েলিদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতার দায়ভার নির্ধারণ করার বিষয়টি সামনে রেখে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন। ইসরায়েলের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চাকরি করেন মালি হাজাজ। ৭ অক্টোবরের হামলার জন্য নেতানিয়াহুকে দায়ী করতে নারাজ লিকুদ পার্টির সমর্থক ১৮ বছর বয়সী নফ গাবে।
নির্বাচন নিয়ে ইসরায়েলের জনমত জরিপগুলোতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘ দুই দশকের শাসনামলে নেতানিয়াহু যেভাবে ডানপন্থী ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী দলগুলোকে নিয়ে জোট সরকার চালিয়েছেন, এবারও তিনি একই কৌশল অবলম্বন করেছেন। তাঁর দলের প্রধান শরিক হিসেবে রয়েছেন কট্টর ডানপন্থী ইতামার বেন-গভিরের জিউইশ পাওয়ার পার্টি এবং বেজালেল স্মোত্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিজম। লক্ষণীয় যে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে এই দুই নেতার ওপর বেশ কিছু পশ্চিমা দেশ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। জোট সরকার চালিয়ে ইসরায়েলের দ্বিধাবিভক্ত রাজনীতি সামাল দেওয়ার চেষ্টাও ছিল। কিন্তু এবারের হিসাব–নিকাশ এতটাও সোজা হবে না। ডানপন্থী ও মধ্যপন্থী—উভয় শিবিরেরই তাঁর প্রতি সমর্থন রয়েছে। তত দিন নেতানিয়াহুকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার চালাতে হবে।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিরোধী শিবিরে রয়েছেন সামরিক বাহিনীর সাবেক চিফ অব স্টাফ গাদি আইজেনকট।
ইয়াশার, টুগেদার, ইসরায়েল বেইতেনু ও ডেমোক্র্যাটসদের নিয়ে গঠিত বিরোধী জোটটির নেতৃত্বে আছেন তিনি। দুই দশক ইসরায়েল শাসনের অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা পায় ১৯৪৮ সালে।
এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদও সরকারপ্রধান হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন। টুগেদারের নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও দাবিদার।
ভোটারদের বড় একটি অংশ নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনামল এবং নিরাপত্তা ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে লিকুদ পার্টির সমর্থকরা মনে করেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর অভিজ্ঞতাই দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহু দুটি মূল বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। প্রথমত, যুদ্ধকালীন তাঁর নেতৃত্ব এবং দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন। তিনি দাবি করেছেন, ট্রাম্প ইরানের হুমকি মোকাবিলায় বদ্ধপরিকর এবং নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকলেই কেবল তা কার্যকর করা সম্ভব। তবে গাদি আইজেনকট এই দাবিকে ‘ভীতি ছড়ানো’ ও ‘মিথ্যা প্রচার’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, যেকোনো নির্বাচিত ইসরায়েলি নেতার সঙ্গেই ট্রাম্প সমানভাবে সহযোগিতা করবেন। এরপর নেতানিয়াহুর হাত ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়েছে ইসরায়েল। সেটা তখনই সম্ভব হবে, যদি তিনি (নেতানিয়াহু) ক্ষমতায় থাকেন। নেতানিয়াহু আর আইজেনকট—কারও জন্যই ক্ষমতার পথ সুগম নয়।
আজ স্থানীয় সময় সকাল সাতটা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে। ইসরায়েলের প্রায় ৭৩ লাখ ভোটার এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। নির্বাচনী নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দল সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করে না; বরং দলগুলোকে ভোট দেয় ভোটাররা। নেসেটে জায়গা পেতে একটি দলকে অন্তত ৩.২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয় এবং একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। বর্তমান রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে কোনো দলেরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নেসেটের ১২০ আসনে ভোট হচ্ছে। প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন হয়।
জেরুজালেমের শালোম হার্টম্যান ইনস্টিটিউটের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোতজ এসা-এলের মতে, নির্বাচনে যে-ই জয়ী হোক না কেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুব সামান্যই থাকবে। যদি কোনো জোট সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হয়, তবে আগামী বছর দেশটিতে আবারও নির্বাচন হতে পারে। সেই পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এ দুটি যুদ্ধ দেশে–বিদেশে নেতানিয়াহুকে যেমন চরম সমালোচিত করেছে, তেমনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসরায়েলকে কার্যত একা করে দিয়েছে।
ভোটের ময়দানে উত্তেজনার আরেকটি কারণ নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দীর্ঘমেয়াদী দুর্নীতির ফৌজদারি মামলা। যদিও তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, তবুও এই মামলার কারণে অনেক ভোটার তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া ফিলিস্তিনি ইস্যুতে গাদি আইজেনকট ‘দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক’ সমাধানের বিরোধী হলেও, ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার সমালোচনা করে আন্তর্জাতিক মহলে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। দেশের ভাবমূর্তির ক্ষেত্রে বিবি (নেতানিয়াহুর ডাকনাম) যে ক্ষতি করেছেন, তা কিছুটা হলেও মেরামত করতে পারবে এ সরকার।’।
নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলে আরব বংশোদ্ভূত ইসরায়েলি ভোটারদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। গাদি আইজেনকট সরাসরি আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট করার সম্ভাবনা নাকচ করে দিলেও, বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে শেষ পর্যন্ত কৌশলগত সমর্থন আসতে পারে। সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের ইতিহাসের অত্যন্ত উত্তাল এই সময়ে আজকের নির্বাচন নেতানিয়াহুর ক্যারিয়ারের জন্য এক চূড়ান্ত মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
























