ঢাকা ১১:৩৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়ম: সংসদীয় কমিটির তদন্তের সুপারিশ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩৩:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সারা দেশে নতুন সারের ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি এবং আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নীতিমালায় স্পষ্ট ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও নির্দিষ্ট যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও তা মোটেই মানা হয়নি। ডিলারশিপ প্রদানে রাজনৈতিক পরিচয় এবং দলীয় সুপারিশকেই প্রধান বিচার্য করা হয়েছে। অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে অনভিজ্ঞ ও অনুগত ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করায় কৃষিখাতে নতুন সার সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে দেশে সার ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হলে সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অসন্তোষ ও সিদ্ধান্ত

ডিলার নিয়োগের এ ধরনের প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার মুখে কৃষি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জোর সুপারিশ জানিয়েছে। স্থায়ী কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সংসদ সদস্য ডিলার তালিকার অনিয়ম নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। যেসব স্থান থেকে ডিলারশিপের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার বিষয়েও বৈঠকে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। সংসদীয় কমিটির এই কঠোর অবস্থানকে সামগ্রিকভাবে সময়োপযোগী ও যৌক্তিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। খবর জানাচ্ছে, সোমবারের বৈঠকে সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ ক্ষোভ ও অসন্তোষও প্রকাশ করেন। আমরা মনে করি, দ্রুত এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ তদন্ত করে সরকারকে ন্যায্য ও কৃষকবান্ধব পদক্ষেপ নিতে হবে।

আবেদনের পরিসংখ্যান ও নীতিমালার চরম লঙ্ঘন

সারাদেশে সার বিতরণের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় পাঁচ হাজারের মতো ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নেয়। এই নিয়োগের বিপরীতে মাঠপর্যায় থেকে ৪৭ হাজারের বেশি আবেদনপত্র জমা পড়েছিল। সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগপ্রাপ্তদের একটি আংশিক তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু প্রকাশিত তালিকায় দেখা যায়, দীর্ঘদিন যাবৎ সফলভাবে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞদের বাদ দেওয়া হয়েছে। নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে

  • ডিলার পদে নিয়োগে পূর্ব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সার ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
  • নিয়োগপ্রার্থীর নিজ ইউনিয়ন বা পৌরসভা এলাকায় নিজস্ব অথবা ভাড়া নেওয়া অন্তত ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার উপযুক্ত গুদাম থাকতে হবে।

লক্ষ্মীপুর ও সারা দেশের আশঙ্কাজনক চিত্র

গত ২২ অক্টোবর প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা যায়, লক্ষ্মীপুরে ডিলার হিসেবে প্রাথমিকভাবে মনোনীত ৫৭ জনের মধ্যে অন্তত ৪৫ জন বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতা-কর্মী। মনোনীতদের বেশিরভাগেরই কোনো ধরনের সার বেচাকেনার অভিজ্ঞতা নেই। বহু বছর ধরে ওই এলাকায় ব্যবসা করে আসা অভিজ্ঞ সার ব্যবসায়ীদের সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

বাস্তবে সারা দেশের চিত্রই লক্ষ্মীপুরের মতো প্রায় একই রকম। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, নবনিযুক্ত ডিলারদের প্রায় ৮০ শতাংশই সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ এবং সদ্য খোলা ট্রেড লাইসেন্সের মালিক। এর আগে সরকারের উচ্চপর্যায়ে জমা দেওয়া একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল যে, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্রের চাপে যোগ্যতা উপেক্ষা করে স্বজনপ্রীতি করলে ভবিষ্যতে সার সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে গণমাধ্যমের খবর বলছে, ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশই অনভিজ্ঞ ও নতুন ট্রেড লাইসেন্সধারী।

কৃষক ভোগান্তি ও স্থায়ী সমাধানের তাগিদ

বিগত আমন মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থানে সঠিক সময়ে সার না পেয়ে কৃষকদের তীব্র ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছিল। অনেক এলাকায় বাধ্য হয়ে কৃষকেরা সার গুদাম ভাঙচুর এবং মহাসড়ক অবরোধের মতো প্রতিবাদী কর্মসূচী পালন করেছিলেন। এমন অভিজ্ঞতা থাকার পরও সারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের সামগ্রিক সার পরিবহন ও বণ্টনব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখতে স্বচ্ছ নীতিমালার অধীনে যোগ্যদের ডিলার নিয়োগ দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

সারের ডিলার নিয়োগে অনিয়ম: সংসদীয় কমিটির তদন্তের সুপারিশ

আপডেট সময় : ০৯:৩৩:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

সারা দেশে নতুন সারের ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি এবং আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নীতিমালায় স্পষ্ট ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও নির্দিষ্ট যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও তা মোটেই মানা হয়নি। ডিলারশিপ প্রদানে রাজনৈতিক পরিচয় এবং দলীয় সুপারিশকেই প্রধান বিচার্য করা হয়েছে। অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে অনভিজ্ঞ ও অনুগত ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করায় কৃষিখাতে নতুন সার সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে দেশে সার ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হলে সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অসন্তোষ ও সিদ্ধান্ত

ডিলার নিয়োগের এ ধরনের প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার মুখে কৃষি মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জোর সুপারিশ জানিয়েছে। স্থায়ী কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সংসদ সদস্য ডিলার তালিকার অনিয়ম নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। যেসব স্থান থেকে ডিলারশিপের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার বিষয়েও বৈঠকে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। সংসদীয় কমিটির এই কঠোর অবস্থানকে সামগ্রিকভাবে সময়োপযোগী ও যৌক্তিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। খবর জানাচ্ছে, সোমবারের বৈঠকে সংসদ সদস্যদের কেউ কেউ ক্ষোভ ও অসন্তোষও প্রকাশ করেন। আমরা মনে করি, দ্রুত এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ তদন্ত করে সরকারকে ন্যায্য ও কৃষকবান্ধব পদক্ষেপ নিতে হবে।

আবেদনের পরিসংখ্যান ও নীতিমালার চরম লঙ্ঘন

সারাদেশে সার বিতরণের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় পাঁচ হাজারের মতো ডিলার নিয়োগের উদ্যোগ নেয়। এই নিয়োগের বিপরীতে মাঠপর্যায় থেকে ৪৭ হাজারের বেশি আবেদনপত্র জমা পড়েছিল। সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে নিয়োগপ্রাপ্তদের একটি আংশিক তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। কিন্তু প্রকাশিত তালিকায় দেখা যায়, দীর্ঘদিন যাবৎ সফলভাবে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞদের বাদ দেওয়া হয়েছে। নীতিমালায় স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে

  • ডিলার পদে নিয়োগে পূর্ব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সার ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
  • নিয়োগপ্রার্থীর নিজ ইউনিয়ন বা পৌরসভা এলাকায় নিজস্ব অথবা ভাড়া নেওয়া অন্তত ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার উপযুক্ত গুদাম থাকতে হবে।

লক্ষ্মীপুর ও সারা দেশের আশঙ্কাজনক চিত্র

গত ২২ অক্টোবর প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা যায়, লক্ষ্মীপুরে ডিলার হিসেবে প্রাথমিকভাবে মনোনীত ৫৭ জনের মধ্যে অন্তত ৪৫ জন বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতা-কর্মী। মনোনীতদের বেশিরভাগেরই কোনো ধরনের সার বেচাকেনার অভিজ্ঞতা নেই। বহু বছর ধরে ওই এলাকায় ব্যবসা করে আসা অভিজ্ঞ সার ব্যবসায়ীদের সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

বাস্তবে সারা দেশের চিত্রই লক্ষ্মীপুরের মতো প্রায় একই রকম। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, নবনিযুক্ত ডিলারদের প্রায় ৮০ শতাংশই সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ এবং সদ্য খোলা ট্রেড লাইসেন্সের মালিক। এর আগে সরকারের উচ্চপর্যায়ে জমা দেওয়া একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল যে, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্রের চাপে যোগ্যতা উপেক্ষা করে স্বজনপ্রীতি করলে ভবিষ্যতে সার সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে গণমাধ্যমের খবর বলছে, ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৮০ শতাংশই অনভিজ্ঞ ও নতুন ট্রেড লাইসেন্সধারী।

কৃষক ভোগান্তি ও স্থায়ী সমাধানের তাগিদ

বিগত আমন মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থানে সঠিক সময়ে সার না পেয়ে কৃষকদের তীব্র ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছিল। অনেক এলাকায় বাধ্য হয়ে কৃষকেরা সার গুদাম ভাঙচুর এবং মহাসড়ক অবরোধের মতো প্রতিবাদী কর্মসূচী পালন করেছিলেন। এমন অভিজ্ঞতা থাকার পরও সারের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে রাজনৈতিক বিবেচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের সামগ্রিক সার পরিবহন ও বণ্টনব্যবস্থা নির্বিঘ্ন রাখতে স্বচ্ছ নীতিমালার অধীনে যোগ্যদের ডিলার নিয়োগ দেওয়া এখন সময়ের দাবি।