ব্যাংক খাতের ক্ষতি কাটাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন
- আপডেট সময় : ০১:২৩:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬ ২৪ বার পড়া হয়েছে
দেশের ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাতের ক্ষত সারাতে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। তিনি সরকারের কাছে একটি খসড়া প্রস্তাব তুলে ধরেছেন, যেখানে আগামী পাঁচ থেকে আট বছর ধরে প্রতিবছর জাতীয় বাজেট থেকে ৬০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার কথা বলা হয়েছে। এই বিশাল অঙ্কের অর্থের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গভর্নর স্পষ্ট করেছেন যে, ব্যাংক খাতে বর্তমানে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা মূলত ব্যাপক লুটপাট ও জালিয়াতির ফসল। আবার এই জনগণকেই এখন সেই টাকা দিতে হচ্ছে। আমাদের আয় ও ব্যয়ের এই টানাটানির বাজেট থেকে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা কীভাবে দেওয়া হবে, দিলে আমাদের ব্যয়ের কোন কোন খাতে টান পড়বে, সে আলোচনায় না গিয়ে প্রথমেই বলা যায়, এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতকে খাদের তলা থেকে তুলে আনার কোনো বিকল্পও নেই। বাকি অংশ ধীরে ধীরে অবলোপন করতে হবে।
গভর্নরের ভাষ্যমতে, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ব্যাংকিং খাতে যে বিশৃঙ্খলা দেখেছেন, তা সাধারণ ঋণের হিসাবের বাইরে। ব্যাংকের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ অর্থ চুরি বা লুট হয়ে গেছে। তিনি এই পরিস্থিতিকে কেবল খেলাপি ঋণ হিসেবে চিহ্নিত না করে বরং আর্থিক খাত ধ্বংসের একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বেনামি বা অস্তিত্বহীন গ্রাহকের নামে ঋণ বিতরণ এবং ব্যাংকিং নিয়মের ব্যাপক লঙ্ঘনের মাধ্যমেই এই লুণ্ঠন সম্পন্ন হয়েছে। তিনি এটাকে ঠিক চুরি বলতে চান না, এটাকে লুট বলাই সংগত বলে মনে করেন বরং। আবার ব্যাংকের অসতর্কতা ও দুর্বল ঋণ নীতিমালার কারণে সিঁধ কাটার মতো চুরিও আছে খেলাপি ঋণের মধ্যে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছে যথাক্রমে আফ্রিকার চাদ ও নিরক্ষীয় গিনি। লুট করে নিয়ে গেছে একজন, আর জরিমানা দিচ্ছে জনগণ। খেলাপি ঋণ: সামনের দরজা বন্ধ, পেছনের দরজা খোলা। এসব খেলাপি গ্রহীতার অনেকেই সম্পদ বিক্রি করে ঋণ পরিশোধে আগ্রহীও নন।
দেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বিশ্বজুড়ে সর্বোচ্চ। এর মধ্যে ইচ্ছাকৃত ও অনিচ্ছাকৃত উভয় ধরনের খেলাপি ঋণই অন্তর্ভুক্ত। যদিও এই ৩৩ শতাংশ প্রকৃত চিত্র কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের সংশয় রয়েছে। কারণ, অনেক ব্যাংকই ঋণ শ্রেণীকরণের আন্তর্জাতিক নিয়মগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করে না। এই সত্য কথাটি উচ্চারণের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ।
গভর্নরের প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরের জন্য সহায়তা প্রয়োজন হলে মোট ৩ লাখ কোটি টাকা এবং আট বছরের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে তা ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াবে।
এই তথ্যটি যখন সামনে এল, তখন এটিও স্মরণ করা জরুরি যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের রাজস্ব আয় ছিল প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা। এবারের বাজেটে মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা হলেও ঘাটতি রয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার। ফলে সীমিত বাজেটে এই বিশাল অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এখানে আমাদের কয়েকটা তথ্য মাথায় রাখতে হবে, ২০২৫-২৬ বছরে আমাদের বার্ষিক রাজস্ব আয় ছিল ৪ লাখ কোটি টাকার মতো।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে আমেরিকার সাবপ্রাইম সংকটের সময়ের ফেডারেল রিজার্ভের সহায়তার তুলনা চললেও, মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। আমেরিকার ব্যাংকগুলো অতি লোভের কারণে বিপর্যয়ে পড়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকটটি মূলত বড় ঋণগ্রহীতা ও কিছু অসাধু পরিচালকের যোগসাজশে করা লুটপাটের ফল। তবে আমেরিকার উদাহরণ টেনে বলা যায়, সেই সময় অনেক বড় ব্যাংক সুদ ও লভ্যাংশসহ পুরো অর্থ ফেরত দিয়েছিল, যা একটি উদাহরণ হতে পারে। আমেরিকার সাবপ্রাইম সংকটের জেরে বেহালে পড়া সে দেশের আর্থিক খাত পুনরুদ্ধারে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ৪৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার সহায়তা দিয়েছিল। তবে আমেরিকার তখনকার পরিস্থিতি ও পটভূমি এবং বাংলাদেশের উদ্ভূত পরিস্থিতির উৎসের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য। ২০০৭ সালের শেষার্ধে আবাসনশিল্পকে চাঙা করা এবং আসন্ন মন্দাবস্থা মোকাবিলার জন্য ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমাতে শুরু করলে মানুষের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়, বিশেষ করে বাড়ি কেনার জন্য সহজ শর্তে পাওয়া ঋণ। এই ঝুঁকিপূর্ণ ঋণই ‘সাবপ্রাইম মর্টগেজ’ নামে পরিচিতি পায়।
লুটপাটকে কোনোভাবেই সাধারণ খেলাপি ঋণের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়, কারণ এটি একটি ফৌজদারি অপরাধ। তাই গভর্নর ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান রয়েছে, যেন তারা লুণ্ঠিত অর্থ এবং প্রকৃত খেলাপি ঋণকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করেন। লুণ্ঠিত অর্থের হিসাবটি ‘প্রটেস্টেড বিল’ হিসেবে সরিয়ে এনে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। আমাদের ব্যাংকগুলোর বিশ্ব রেকর্ড করা খেলাপি ঋণের আড়ালে একটা বিশাল অঙ্ক যে লুটপাটের কারণে ঘটেছে, এই সত্যটি প্রকাশ করে প্রকৃত অভিভাবকের পরিচয় দিয়েছেন মাননীয় গভর্নর। কিন্তু একই সঙ্গে একটা গুরুতর বিষয়ের সুরাহা হওয়া উচিত। অন্যদিকে প্রকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় আইন সংস্কার এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের সব ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা খর্ব করতে হবে।
সামাজিক ন্যায়বিচারের স্বার্থে অপরাধীদের বিচার করা ছাড়া কেবল জনগণের করের টাকায় ব্যাংক উদ্ধার করা উচিত নয়। এতে সাধারণ মানুষ ও করদাতাদের ওপর অবিচার করা হয়। কারণ, অনেক তারকা খেলাপি ইতোমধ্যে তাঁদের ঋণের টাকা বিদেশে সরিয়ে ফেলেছেন কিংবা এমন জায়গায় বিনিয়োগ করেছেন, যা পুনরুদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব। ব্যাংক খাতে খেলাপি তোষণ যে পরিণাম ডেকে এনেছে। তাঁদের পরিচয় প্রকাশ্য করার উদ্যোগ নিলেও উল্লেখযোগ্য সুফল আসার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সুদ মওকুফের মাধ্যমে এককালীন পরিশোধের সুযোগ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান নেতৃত্বের গৃহীত সুদ মওকুফসহ বিভিন্ন যুগান্তকারী উদ্যোগ সত্ত্বেও বড় খেলাপিরা তাদের অর্থ পরিশোধে তেমন আগ্রহী নয়। তাই উদ্ধার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। করদাতারা কেবল সরকারের এই সহায়তার পক্ষে নয়, বরং যারা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী, তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো দেখার অপেক্ষায় আছেন। তাই নিরুপায় করদাতাদের আশা, উদ্যোগটি একতরফা হবে না, উদ্ধার করা ব্যাংকগুলোর দুরবস্থার হোতাদের জবাবদিহি ও বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
পরিশেষে, উদ্ধারকারী এই অর্থ কী শর্তে প্রদান করা হবে এবং এটি আদায়ের কী ব্যবস্থা থাকবে, তা স্পষ্ট করা সরকারের দায়িত্ব। শুধুমাত্র ব্যাংক বাঁচানোর জন্য বাজেট থেকে অর্থ দেওয়া সমাধান নয়, বরং ভবিষ্যতে যেন এই ধরনের লুটপাট আর না ঘটে, সেজন্য অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা ও আইনি সংস্কারই হতে পারে টেকসই পথ।
























