ঘিয়ের ব্যবসা থেকে ১৮৫ পদের মিষ্টান্ন: বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের ঐতিহ্য
- আপডেট সময় : ০৮:৩২:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে
একসময় তাঁদের মূল পারিবারিক ব্যবসায়িক পণ্য ছিল খাঁটি ঘি। সময়ের পরিক্রমায় ব্যবসার সেই গণ্ডি পেরিয়ে তাঁরা পা রেখেছেন বৈচিত্র্যময় মিষ্টির জগতে। দুধ, ছানা, ক্ষীর আর চিনির নিখুঁত সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে তাদের নতুন পরিচয়। মুন্সিগঞ্জের বালাশুরে পারিবারিক পূজা আয়োজনে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে এসেছে তাদের এই দীর্ঘ পথচলার নানামুখী গল্প।
ব্রিটিশ আমল থেকে ঘোষ পরিবারের পূর্বপুরুষেরা ঘিয়ের ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের সঙ্গে তাঁদের এই সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বর্তমান পরিচালক দীপক কুমার ঘোষ জানান, ঘিয়ের ব্যবসাকে আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য থেকেই মিষ্টি তৈরির চিন্তা আসে। ধীরে ধীরে ঘিয়ের পাশাপাশি রসগোল্লা, চমচম ও কালোজামের মতো জনপ্রিয় মিষ্টিগুলো তাঁদের নিয়মিত পণ্যের তালিকায় জায়গা করে নেয়। বেড়েছে কর্মীর সংখ্যা, বিস্তৃত হয়েছে ব্যবসা। এত বৈচিত্র্যের মধ্যেও কিছু মিষ্টি রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে ঋতুর সম্পর্ক গভীর।
তাঁদের শুরুর দিকের দোকানটির নাম ছিল ‘দেশপ্রিয় মিষ্টান্ন ভান্ডার’, যা পুরান ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সকালের নাশতা আর দুধ চায়ের পাশাপাশি ওই দোকানের বিশেষ ‘প্রাণহরা’ মিষ্টি ছিল ব্যাপক জনপ্রিয়। শত বছর আগে সাগরকলা ব্যবহার করে বিশেষ এক পদ্ধতিতে এটি তৈরি করা হতো। তবে সেই প্রস্তুতপ্রণালির দক্ষ কারিগরেরা আজ আর নেই বলে এখন প্রাণহরা তৈরি করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। পরবর্তী ধাপে ১৯৮১ সালে প্রয়াত রমেশচন্দ্র ঘোষের হাত ধরে কলাবাগানে যাত্রা শুরু হয় বর্তমান ‘বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডার’-এর। কিন্তু সেই সমন্বয়কে সঠিক স্বাদ ও গঠনে রূপ দেন কারিগরেরা।
প্রমিত কুমার ঘোষের মতে, ঠাকুরদার বাবার আমল থেকে চার প্রজন্ম ধরে তাঁরা মিষ্টান্ন ব্যবসার হাল ধরে আছেন। বর্তমান প্রজন্ম আগের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসার পরিধি বাড়াচ্ছে, তবে পারিবারিক বন্ধনই তাদের ব্যবসার প্রধান ভিত্তি। বর্তমানে পরিবারের ২৪ সদস্য মিলে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন। এখন তাদের সারা দেশে প্রায় ৪৫টি শাখা রয়েছে এবং নতুন আরও কিছু শাখা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। এক প্রজন্ম যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, পরের প্রজন্ম তা ধারণ করেছে নিজেদের মতো করে।
প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি জানান, বর্তমানে তাঁদের আউটলেটগুলোতে প্রায় ১৮৫ ধরনের মিষ্টি পাওয়া যায়। রসগোল্লা, লালমোহন, কালোজাম, চমচম, ক্ষীর চমচমের মতো সাধারণ মিষ্টিগুলোর পাশাপাশি রসমালাই, মালাই চপ, ইন্দ্রাণী ভোগ, জাফরানি ভোগ ও কাশ্মীরি চমচমের মতো বৈচিত্র্যময় আইটেমও এখানে তৈরি হয়। উপকরণের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে অনেক মিষ্টি নির্দিষ্ট মৌসুমে তৈরি করা হয়। যেমন শীতকালে ক্ষীর কদমের চাহিদা বেড়ে যায়। কমলাভোগ তাই শুধু একটি মিষ্টি নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট ঋতুর স্বাদকে ধরে রাখার প্রচেষ্টা। মিষ্টি তৈরির পেছনে থাকে নানা উপকরণের সমন্বয়।
কমলাভোগের ক্ষেত্রে তারা নিজস্ব রীতি মেনে চলেন। প্রমিত কুমার ঘোষ জানান, কমলার খোসা বেটে ছানার সঙ্গে মিশিয়ে কেবল কমলার মৌসুমেই এটি তৈরি করা হয়। অনেক জায়গায় সারা বছর এটি মিললেও তারা মানের খাতিরে তা এড়িয়ে চলেন। মিষ্টি তৈরির ক্ষেত্রে দুধের মান, ছানার ঘনত্ব, ক্ষীরের প্রস্তুতি এবং চিনির পরিমাণের ওপরই মূল স্বাদ নির্ভর করে। মুন্সিগঞ্জ থেকে আনা দুধ, ছানা, ক্ষীর ও মাওয়া দিয়ে কলাবাগান ও ইংলিশ রোডের কারখানায় এসব মিষ্টি তৈরি হয়। স্বাদে ভিন্নতা আনতে এলাচি, দারুচিনি, জায়ফল, জয়ত্রী ও লবঙ্গ ব্যবহার করা হয়।
মিষ্টির প্রিজারভেটিভ ব্যবহার প্রসঙ্গে প্রমিত কুমারের দাবি, তারা কোনো কৃত্রিম প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করেন না। তবে ড্রাগন সুইটস, অরেঞ্জ লাড্ডু ও মাল্টি লাড্ডুর মতো কয়েকটি আইটেমে কেবল ফুড রেড কালার মেশানো হয়। চিনির পরিমাণ কিছুটা বেশি থাকলে মিষ্টির স্থায়িত্ব বাড়ে, তবে দুধ ও ছানার তৈরি পণ্যের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা ও তাপমাত্রার বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি মনে করেন।
প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে তিন শতাধিক কর্মী কাজ করছেন, যার মধ্যে শতাধিক দক্ষ কারিগর রয়েছেন। অভিজ্ঞ কারিগরদের হাতের জাদুই মূলত একটি মিষ্টিকে অন্যটির চেয়ে আলাদা করে তোলে। তবে এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে চ্যালেঞ্জও কম নেই। প্রায় ৪৫টি শাখায় মিষ্টির স্বাদ অভিন্ন রাখা এবং নকল মিষ্টির দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ করা এখন তাদের বড় দায়িত্ব। প্রমিত কুমার জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল পণ্য বিক্রি করছেন, এমন প্রায় ৩০০ ঘটনা তারা শনাক্ত করেছেন। এদের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা। এই মিষ্টির ইতিহাস প্রায় শত বছরের পুরোনো। বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভান্ডারের প্রতিনিধির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে সব মিলিয়ে প্রায় তিন শ কর্মী কাজ করেন।


























