লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়রের দৌড়ে ক্যাটেন বাস ও নিথিয়া রামান
- আপডেট সময় : ১০:০২:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সর্ববৃহৎ শহর লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র পদের তীব্র প্রতিদ্বন্দিতাপূর্ণ নির্বাচন আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ নির্বাচনে শহরের ৪৩তম ও বর্তমান মেয়র কারেন বাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন সিটি কাউন্সিলের চতুর্থ ডিস্ট্রিক্টের সদস্য নিথিয়া রামান। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এবং অর্জিত প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে পুনরায় জয়ের চেষ্টা করছেন কারেন বাস। অপরদিকে, জনসেবায় স্বচ্ছতা, নগর ব্যবস্থার সংষ্কার এবং সাশ্রয়ী আবাসনের ডাক নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন নিথিয়া রামান। কারেন বাস: স্বাস্থ্যসেবাদাতা থেকে রাজনীতির শীর্ষে।
নির্বাচন কেন্দ্রিক শেষ মুহূর্তের জনমত জরিপে দেখা গেছে দুই প্রার্থীর জনপ্রিয়তাই প্রায় সমান পর্যায়ে অবস্থান করছে। ফলে শেষ মুহূর্তের প্রচারে কোনো খামতি রাখেননি দুই প্রার্থীই। এবারের নির্বাচনে শহরটির ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, অনিয়ন্ত্রিত গৃহহীনতা, নগর অবকাঠামো, পুলিশের ভূমিকা, সাম্প্রতিক দাবানলের ক্ষত ও ২০২৮ সালের অলিম্পিক আয়োজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির মাঝেও এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করা যাচ্ছে। লস অ্যাঞ্জেলেসের ‘লিটল বাংলাদেশ’ অঞ্চলে দুই প্রার্থীর দলই সরাসরি নানা মতবিনিময় ও প্রচারণা চালিয়েছে।
কারেন বাসের জন্ম ১৯৫৩ সালের ৩ অক্টোবর লস অ্যাঞ্জেলেসে।
পেশাগত জীবন স্বাস্থ্যসেবায় শুরু হলেও ১৯৯০ সালে তিনি দক্ষিণ লস অ্যাঞ্জেলেসে ‘কমিউনিটি কোয়ালিশন’ প্রতিষ্ঠা করে সামাজিক সংগঠক হিসেবে সুনাম অর্জন করেন। তিনি চিকিৎসক নন; একজন ফিজিশিয়ান অ্যাসিস্ট্যান্ট।
মাদকাসক্তি, অপরাধ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ করার পর তিনি মূলধারার রাজনীতিতে আসেন।
২০০৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হয়ে ২০০৮ সালে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে এর স্পিকারের পদ অলঙ্কৃত করেন বাস। পরবর্তীতে ২০১০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে দায়িত্ব পালনের পর ২০২২ সালের নির্বাচনে রিক কারুসোকে পরাজিত করে প্রথম নারী মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন কারেন বাস। ২০০৮ সালে তিনি অ্যাসেম্বলির স্পিকার হন। এরপর ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হয়ে ২০১১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পরই শহরের প্রধান সমস্যা গৃহহীনতা দূর করতে জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন বাস। তাঁর বিশেষ প্রকল্প ‘ইনসাইড সেফ’-এর মাধ্যমে কয়েক হাজার মানুষকে রাস্তা থেকে সরিয়ে অস্থায়ী আবাসন দেওয়া হয়। এছাড়া দ্রুত আবাসন নির্মাণের অনুমোদন দিতে ‘এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টিভ ১’ জারি করে প্রায় ১০ হাজারের বেশি আবাসন তৈরি করা হয়, এবং আরও ৫০ হাজার ইউনিট নির্মাণের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের জরিপে দেখা গেছে লস অ্যাঞ্জেলেসে আবারও গৃহহীন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, কারণ অস্থায়ী আশ্রয় পাওয়া মানুষের বড় এক অংশ পুনরায় রাস্তায় ফিরে এসেছে। মেয়রের কার্যালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এ উদ্যোগের আওতায় ১০ হাজারের বেশি সাশ্রয়ী আবাসন ইউনিটের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং আরও প্রায় ৫০ হাজার ইউনিট উন্নয়নপ্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। টানা দুই বছর গৃহহীন মানুষের সংখ্যা কমার পর ২০২৬ সালের সর্বশেষ হিসাবে লস অ্যাঞ্জেলেসে এই সংখ্যা আবার বেড়েছে। ‘ইনসাইড সেফ’ কর্মসূচির আওতায় অস্থায়ী আবাসনে নেওয়া মানুষের একটি বড় অংশ পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আবার রাস্তায় ফিরে গেছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে। ফলে কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ২০১৭ সালে সিলভার লেক, ইকোপার্ক, লস ফেলিজ, অ্যাটওয়াটার ভিলেজ ও হলিউড এলাকার গৃহহীন মানুষের সহায়তায় ‘সেলাহ নেবারহুড হোমলেস কোয়ালিশন’ প্রতিষ্ঠায় যুক্ত হন তিনি। লস অ্যাঞ্জেলেসে বাড়িভাড়া ও আবাসনসংকট নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যু। শহরের আবাসন ও গৃহহীনতা-সংক্রান্ত কমিটির নেতৃত্বও দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য—শহরটি মৌলিক সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে; রাস্তাঘাট, ফুটপাত, সড়কবাতি, আবাসন ও গৃহহীনতা মোকাবিলায় আরও কার্যকর প্রশাসন দরকার।
মেয়র বাসের সাম্প্রতিক মেয়াদে সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারির প্যালিসেইডস এলাকার ভয়াবহ দাবানল। এ ঘটনায় অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয় এবং হাজার হাজার বসতি বিনষ্ট হয়। ঘটনার সময় ঘানা সফরে থাকায় চরম সমালোচনার মুখোমুখি হন কারেন বাস। পরবর্তী পুনর্গঠন পরিকল্পনা ও শহরের ফায়ার চিফ ক্রিস্টিন ক্রাউলিকে অপসারণ নিয়েও বিতর্কের সৃষ্টি হয়, যিনি পরে বেআইনিভাবে বরখাস্ত করার অভিযোগে আদালতের দ্বারস্থ হন। এছাড়া ২০২৬ সালে বয়েল হাইটসের লাইনেজ কোল্ডস্টোরেজে আগুনের পর দীর্ঘ দুই মাস পচা মাংসের গন্ধে নগরবাসীর দুর্ভোগ পোহাতে হওয়ায় বাস প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে লস অ্যাঞ্জেলেসের প্যালিসেইডস এলাকায় ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। এতে হাজার হাজার বাড়িঘর ও স্থাপনা ধ্বংস হয় এবং অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ২০২৬ সালে বয়েল হাইটস এলাকার লাইনেজ কোল্ডস্টোরেজ গুদামে অগ্নিকাণ্ডের পর পচে যাওয়া মাংসের দুর্গন্ধ প্রায় দুই মাস ধরে এলাকায় ছড়িয়ে ছিল, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তিতে ফেলে। ২০২৬ সালের মেয়র নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আগে বছরের শুরুতে কারেন বাসকে সমর্থন জানিয়েছিলেন রামান।
অন্যদিকে, ভারতে জন্মগ্রহণ করা নিথিয়া রামান মাত্র ছয় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান। তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরবর্তীতে এমআইটি থেকে নগরায়ন ও নগর পরিকল্পনা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন। ভারত ও লস অ্যাঞ্জেলেসে ভূমি অধিকার এবং বস্তিবাসীদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতার পর ২০২০ সালে সিটি কাউন্সিলে লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রথম দক্ষিণ এশীয় সদস্য হিসেবে জয় পান এবং ২০২৪ সালে পুনর্নির্বাচিত হন। প্রথমদিকে কারেন বাসকে সমর্থন দিলেও পরবর্তীতে নগর পরিষেবা ও স্বচ্ছতার দূরবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি নিজেই মেয়র পদে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেন। পড়াশোনা করেছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি) থেকে নগর পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনা শেষে ভারতের চেন্নাই ও দিল্লিতে নগর দারিদ্র্য, বস্তিবাসীর অধিকার, পানি-স্যানিটেশন এবং ভূমির অধিকার নিয়ে কাজ করেন তিনি। অন্যদিকে নিথিয়া রামান ভাড়াটেদের অধিকার জোরালো করা, উচ্ছেদ থেকে সুরক্ষা, ভাড়া বৃদ্ধির সীমা এবং বাড়িওয়ালাদের জবাবদিহির পক্ষে। মেয়র নির্বাচিত হলে হাউজিং ডিপার্টমেন্টের অধীনে ভাড়াটেদের সুরক্ষায় আলাদা দপ্তর গঠন এবং অভিযোগ দ্রুত তদন্তের ব্যবস্থা করতে চান তিনি।
দুই প্রার্থীর রাজনৈতিক অবস্থান ও অর্থায়নেও রয়েছে বড় পার্থক্য। ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত বাসের প্রচার তহবিলে জমা পড়ে ৩৪ লাখ ডলার এবং রামানের সংগ্রহে ছিল ৩০ লাখ ডলার। এর বাইরে রামানের সমর্থক ‘এস্তামোস কন নিথিয়া’ প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার তুলে ধরেছে, বিপরীতে পুলিশ প্রটেকটিভ লিগ রামানের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামায় ৪৮ লাখ ডলার। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস ও ইউসি বার্কলির যৌথ জরিপে দুই প্রার্থীই ৪০ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন, যেখানে ১৯ শতাংশ ভোটার ছিলেন অনির্ধারিত। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক তথ্যে দেখা যায়, রামানকে সমর্থন দিচ্ছে শ্রমিক সংগঠন, সাউথ এশিয়ান-আমেরিকান ও ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টদের সম্মিলিত একটি প্ল্যাটফর্ম। ক্রাউলি পরে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুতির অভিযোগ তুলে শহর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনোযোগ আকর্ষণেও প্রার্থীরা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। ২০২৬ সালের মে মাসে লিটল বাংলাদেশের অর্কিড কিচেন রেস্তোরাঁয় বাংলাদেশিদের সঙ্গে কারেন বাস এক মতবিনিময় সভায় যোগ দেন। সেখানে একটি স্থায়ী কমিউনিটি সেন্টার, বিদ্বেষমূলক অপরাধ প্রতিরোধ এবং স্থানীয় স্কুলে ঈদের ছুটির দাবি তুলে ধরেন প্রবাসী নেতারা। অন্যদিকে, ৩০ অক্টোবর এশীয় ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে শাকিল সৈয়দের নেতৃত্বাধীন সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ও এশিয়ান ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যৌথভাবে প্রচার কার্য চালান রামান।
আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও দুই প্রার্থীর অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে প্রচারণায়। গত ২৯ সেপ্টেম্বর স্কারবল কালচারাল সেন্টারের এক বক্তব্যে বাস উল্লেখ করেছিলেন যে, তিনি গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানকে ‘গণহত্যা’ বলে মনে করেন না, যা নির্দিষ্ট একটি অংশকে ক্ষুব্ধ করে। ভোটগ্রহণ সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে। এখন দেখার বিষয় লস অ্যাঞ্জেলেসের সাধারণ মানুষ বাসের অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক ধারার পক্ষে রায় দেবে নাকি নিথিয়া রামানের পরিবর্তনের আহ্বান বেছে নেবে।
























