শেন ওয়ার্নকে যেভাবে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন সেলিম মালিক
- আপডেট সময় : ১১:০৩:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে
১৯৯৪ সালের পাকিস্তান সফর। ১৯৯৪ সালে পাকিস্তান সফরের প্রথম টেস্ট, করাচিতে।
করাচি টেস্টের সেই হাইওয়ে উইকেটে চতুর্থ দিনের খেলা শেষে উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাকিস্তানের তখন জয়ের জন্য দরকার ৩১৪ রান, হাতে ৭ উইকেট। সে সময় অস্ট্রেলিয়ান লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্ন তাঁর সতীর্থ টিম মের সঙ্গে একই রুমে অবস্থান করছিলেন। সন্ধ্যাবেলায় হঠাৎ পাকিস্তান অধিনায়ক সেলিম মালিকের ফোন আসে। তিনি ওয়ার্নকে জরুরি আলোচনার কথা বলে নিজের রুমে ডেকে পাঠান। ওয়ার্ন সেই সময় সেলিম মালিককে নিয়ে মজার ছলে ‘ইঁদুর’ ডাকনামটি ব্যবহার করতেন, যদিও তা কেবল তার চেহারার জন্য, কোনো চারিত্রিক বিষয়ের জন্য নয়। উইকেটটা ছিল একেবারে হাইওয়ে—ব্যাটিং স্বর্গ। চতুর্থ দিনের খেলা শেষে পাকিস্তানের স্কোর ৩ উইকেটে ১৫৫। পাকিস্তানের অধিনায়ক স্বয়ং। ‘গুড ডে, মেইট, কেমন আছ?’ ‘খারাপ না, খারাপ না। শোনো, আমি কি একটু কথা বলতে পারি?’ ‘নিশ্চয়ই, কী হয়েছে?’ ‘না, তুমি কি দয়া করে আমার রুমে আসতে পারো?’ ‘উম, কেন। আমি মের সঙ্গে বসে আছি।’ ‘না, না, এটা খুব জরুরি। লেগ স্পিনের ‘রকস্টার’ ওয়ার্ন, আর তাঁর চোখে সেরা ১১। ওকে আমরা এই নামেই ডাকতাম, দেখতে ইঁদুরের মতো লাগত বলে, এই জন্য না যে সে একজন ‘ইঁদুর’ (খারাপ মানুষ); অন্তত সেই সময় পর্যন্ত নয়। সে কুর্তা পরা ছিল—পাকিস্তানের স্থানীয় লোকজন যে সাদা লম্বা জামা পরে, সেটা। ‘আসার জন্য ধন্যবাদ।’ ‘নিশ্চয়ই, মেইট, কীভাবে সাহায্য করতে পারি। ফোনে তোমাকে খুব চিন্তিত লাগছিল।’ ‘কাল আমরা হারতে পারব না।’ ‘আহ, ঠিক আছে, আমি নিশ্চিত তোমরা জেতার চেষ্টা করবে, আর আমরাও জেতার চেষ্টা করব। জিততে হলে তাদের দরকার ৩১৪ রান। আমরা ধরে নিলাম, জন ব্যাপারটা আইসিসিকে জানিয়েছেন, কিন্তু আমরা পরে আর কিছু জানতে পারিনি। ভেবে দেখো এবং কাল সকালের আগে আমাকে জানিও।’ ‘ভাবার কিছু নেই।
সেলিম মালিকের রুমে পৌঁছানোর পর তিনি ওয়ার্নকে সরাসরি জানান যে, পাকিস্তান এই ম্যাচ হারতে পারবে না। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, ম্যাচ হারলে ভক্তরা ক্রিকেটারদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিতে পারে বলে মালিক দাবি করেন। আলোচনার একপর্যায়ে সেলিম মালিক বোমা ফাটান। তিনি শেন ওয়ার্ন ও টিম মেকে প্রস্তাব দেন, যদি তারা পরের দিন অফ স্টাম্পের অনেক বাইরে বল করেন এবং ম্যাচটি ড্র করার সুযোগ করে দেন, তবে তাদের প্রত্যেককে দুই লাখ ইউএস ডলার করে দেওয়া হবে। আধা ঘণ্টার মধ্যে এই টাকা রুমে পৌঁছে দেওয়ার কথাও জানান তিনি। লোকেরা আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেবে।
প্রথমে ওয়ার্ন এটিকে রসিকতা মনে করেছিলেন, কিন্তু মালিকের সিরিয়াস চাহনি দেখে বুঝতে পারেন তিনি গুরুতর কোনো প্রস্তাব দিচ্ছেন। ওয়ার্ন স্পষ্টভাবে সেই অনৈতিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর দ্রুত রুমে ফিরে গিয়ে টিম মেকে বিষয়টি জানান। চমকে যাওয়া মে এবং ওয়ার্ন তাৎক্ষণিকভাবে অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক মার্ক টেলর ও কোচ বব সিম্পসনের সাথে বিষয়টি নিয়ে জরুরি আলোচনায় বসেন। টেলর তখন অধিনায়ক হিসেবে নিজের প্রথম টেস্ট সিরিজ খেলছিলেন এবং ব্যক্তিগতভাবে ব্যাট হাতে ভালো সময় পার করছিলেন না, যার ওপর এই ম্যাচ ফিক্সিংয়ের খবরটি ছিল বাড়তি মানসিক চাপ। আশা করি, ভালো একটা ম্যাচ হবে।’ ‘না, না, তুমি বুঝছ না। তবু বললাম, ‘মজা করছ নাকি?’ ‘আমি সিরিয়াস। তারপর সে বলল, ‘তুমি সিরিয়াস?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘ধ্যাত।
বব সিম্পসন পুরো ঘটনার একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন তৈরি করে ম্যাচ রেফারি নিউজিল্যান্ডের জন রিডের কাছে জমা দেন। জন রিড বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখেন এবং আইসিসিকে জানানোর কথা ছিল, যদিও পরবর্তীতে এ নিয়ে আর বড় কোনো আপডেট পাওয়া যায়নি। তৎকালীন সময়ে ‘ম্যাচ ফিক্সিং’ বা ‘স্পট ফিক্সিং’ শব্দগুলো ক্রিকেটের অভিধানে সেভাবে পরিচিত ছিল না, তাই পুরো বিষয়টি ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর ও উদ্বেগের। তাই তোমাদের কাজটা বেশ কঠিন এবং সম্ভবত আমরাই জিতব। ফিক্সিং, বিদ্রোহ এবং ষড়যন্ত্রে ভরা ড্রেসিংরুম: পাকিস্তান ক্রিকেটের অস্থির অধ্যায়।
টেস্টের শেষ দিনে খেলা গড়ায় চরম নাটকীয়তায়। চতুর্থ দিন বিকেলে ১টি এবং শেষ দিনে আরও ৪টি উইকেট তুলে নিয়েছিলেন ওয়ার্ন। এক পর্যায়ে পাকিস্তানের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৫৯ রান। নবম উইকেট পড়ার সময়ও জয়ের জন্য ৫৬ রান দরকার ছিল। নাটকীয়ভাবে শেষ পর্যন্ত ইনজামাম-উল-হক ও মুশতাক আহমেদের দৃঢ়তায় পাকিস্তান ম্যাচটি জিতে নেয়। ইনজামামকে আউট করার সুযোগ তৈরি হয়েছিল, কিন্তু ফিল্ডিং মিস ও বলের বাউন্ডারি হয়ে যাওয়ার ফলে অস্ট্রেলিয়া দুর্ভাগ্যজনকভাবে ম্যাচটি হেরে যায়।
পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে উঠার সময় সেলিম মালিক ওয়ার্নের কাছে এসে ব্যঙ্গ করে বলেন, টাকাটা নিলে ভালো হতো। ওয়ার্ন জানান, সেই মুহূর্তের ক্ষোভ ও বিদ্রূপ তিনি কখনো ভুলবেন না। পরবর্তীতে সেলিম মালিক আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ হন। যে পাকিস্তানি আদালত সেলিমকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল, সেখানেও তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ওয়ার্ন ও মার্ক ওয়াহর মতো ক্রিকেটারদের মিথ্যাবাদী বলেছিলেন। দীর্ঘ সময় পর এই ঘটনাটি ক্রিকেটের কলঙ্কিত এক ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে আছে।

























