ঢাকা ০২:০০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে: কিলোমিটার প্রতি খরচ ১১২৭ কোটি টাকা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:৫০:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ৩২ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উড়াল সড়ক নির্মাণের খরচের তুলনায় ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি ধরা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, চীনের সিচুয়ান প্রদেশে দুর্গম পাহাড় কেটে তৈরি ইবিন-পানঝিহুয়া এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় হয় ৩৬৫ কোটি টাকা। ভারতের আট লেনের দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়েতে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয়েছিল ৩২০ কোটি টাকা এবং ইন্দোনেশিয়ার শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ এক্সপ্রেসওয়েতে কিলোমিটার প্রতি খরচ দাঁড়ায় ৩৯০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে কিলোমিটার প্রতি খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। অস্বাভাবিক এই ব্যয় বৃদ্ধিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্ক। জাতীয় সংসদে সেতুমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রজেক্টটির অনিয়ম ও দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে দুদক ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে।

প্রকল্প এলাকায় সরজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এক্সপ্রেসওয়ের গার্ডার থেকে অন্তত ২০ থেকে ৩০ ফুট দূরে অবস্থিত স্থাপনাকেও অধিগ্রহণ তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। এমনকি প্রধান সড়ক থেকে ২০-২৫ ফুট ব্যবধানে থাকা ভবনগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারি তহবিল থেকে তুলে নেওয়া হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্পের প্রায় ৫০টিরও বেশি ভুয়া অধিগ্রহণ দেখিয়ে অসাধু চক্র কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। এ ক্ষেত্রে সাভারের তৈয়বপুর মৌজার আরএস ৫৩৫, ৫৩৬, ৫৪৩, ৫৪৫, ৫৪৭, ৫৬২, ৮০০, ৮১১, ৮১৭, ৮১৮, ৮১৯, ৮২৪, ৮২৫, ৮২৬, ৮২৯, ৮৩১ ও ৮৩২ নম্বর দাগের ভূমি ও দালানকোঠা অধিগ্রহণ দেখিয়ে শত শত কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়। একইভাবে বাইপাইল মৌজার আরএস ১৯১, ২১১, ২১৩, ২১৪, ৮৪৫ ও ৮৪৬ নম্বর দাগেও চরম দুর্নীতি হয়েছে। এসব দাগের অনেক স্থাপনার মাত্র ২ থেকে ৩ ফিট অংশ এক্সপ্রেসওয়ের গার্ডারে স্পর্শ করলেও পুরো ভবন বা জমি অধিগ্রহণের ভুয়া বিল তৈরি করা হয়েছে। এতে হুহু করে প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়ে যায়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পের অন্তত ৫০-এর অধিক ভুয়া অধিগ্রহণ দেখিয়ে টাকা তুলে নেন মিজান সিন্ডিকেট। এমন অন্তত ১০টি দাগের কাগজপত্র পেয়েছে। একই দাগে ৪৬ নম্বর অ্যাওয়ার্ডে আমিনুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি দোতলা ভবন অধিগ্রহণ দেখিয়ে ২ কোটি ১১ লাখ টাকা বিল তুলে নেয়া হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় নজিরবিহীন জালিয়াতি করা হয় আর.এস ২১২ নম্বর দাগের ৬৫ নম্বর অ্যাওয়ার্ডধারী নাজমুল হোসেন ভূঁইয়াসহ আরও ১১ জন ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিকদের সঙ্গে। উক্ত দাগে অধিগ্রহণের সকল প্রক্রিয়া শেষে ভুক্তভোগীদের বিল উত্তোলনের কয়েক মাস আগে মিজানুর রহমান স্থাপনা থাকা জমি মালিকের কাছ থেকে ৩৬ শতাংশ জমির মাত্র ২ শতাংশ রেজিস্ট্রি করে নেন। পরে হাইকোর্ট ভুক্তভোগীদের পক্ষে রুল ইস্যু করেন। এ ছাড়া, প্রকল্পের আরএস ২৯৮ নম্বর দাগে আশুলিয়া গাজীরচট ডিইপিজেড রোড বাইতুন নুর মসজিদের অপরপাশে আব্দুর রাজ্জাক নামের এক ব্যক্তির তানভির কমপ্লেক্স ও এর পাশে আরেকটি ভবন অধিগ্রহণ দেখানো হয়।

এই জালিয়াতি ও লুটপাটের মূল ক্রীড়নক ছিলেন গণপূর্ত সাভার সার্কেলের তৎকালীন উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান। তিনি ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের আশুলিয়া, বাইপাইল ও ইপিজেড অংশে অবকাঠামোর মূল্য নির্ধারণ এবং ক্ষতিপূরণ পরিমাপের দায়িত্বে ছিলেন। ঢাকা জেলা প্রশাসনের এল.এ শাখার সঙ্গে যৌথভাবে সরজমিন পরিমাপের সুযোগ নিয়ে তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ২৩২ কোটি টাকা লুটের সুনির্দিষ্ট তথ্য মিললেও, দুদক সূত্রে জানা গেছে যে ভুয়া অধিগ্রহণের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া মোট অর্থের পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। বেশিরভাগ জমি ও অবকাঠামোর ভ্যালুয়েশন প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ৫ থেকে ১০ গুণ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল। সেই সুবাধে তিনি অধিগ্রহণের সময় শতাধিক স্থাপনা জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি পরিবার নিয়ে সেখানে বসবাস করছেন। এরপরও ভিকটিমরা প্রকৌশলী মিজানের সঙ্গে সমঝোতা করতে বাধ্য হয়।

প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে বাইপাইল অংশে এল.এ কেস নম্বর ০৩.১৫.১০/২০১৯-২০২০ এর আর.এস ২১২ নম্বর দাগে। সেখানকার ৬৭ নম্বর অ্যাওয়ার্ডের অধীনে আসল মালিক আওলাদ হোসেনসহ ৭ জনের অনুকূলে ৩ কোটি ৪৪ লাখ ৩৮ হাজার ৭৫১ টাকা ক্ষতিপূরণ মঞ্জুর হয়। কিন্তু মিজান সিন্ডিকেট জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ করে। পরবর্তীতে গত ১৪ই জুলাই ডিসি অফিস থেকে ভুক্তভোগী দোকান মালিকদের নামে ব্র্যাক ব্যাংকের উত্তরা জসিমউদ্দিন শাখায় হিসাব খুলে সব টাকা জমা করা হয়। এর পরের দিনই অর্থাৎ ১৫ই জুলাই মিজানুর ও তার সহযোগী আশরাফুল আলমের ব্যাংক হিসাবে ৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়। এখানেই শেষ নয়, একই দাগের ২৪/১ নম্বর অ্যাওয়ার্ড দেখিয়ে আরও ১ কোটি ২০ লাখ ৮২ হাজার ১০৮ টাকা হাতিয়ে নেন মিজান। কোন ভবনে কতো টাকা ক্ষতিপূরণ দেখানো হয়েছে, কাদের নামে অ্যাওয়ার্ড হয়েছে, এবং এল.এ শাখা থেকে কারা বিল তুলে নিয়েছে এর সমস্ত কাগজপত্র হাতে সংরক্ষিত আছে। এই দাগের ৬৭ নম্বর অ্যাওয়ার্ডে স্থাপনা মালিক আওলাদ হোসেনসহ আরও ৬ জন। একই কায়দায় আর.এস ২১২ নম্বর দাগের ৬৪ নম্বর অ্যাওয়ার্ডের স্থাপনা মালিক শামসুন্নাহার রেখাসহ তার ৭ ভাইবোনের নামে পাস হওয়া ২২ কোটি ৩২ লাখ ৯৮ হাজার ২৬৭ টাকার বিলও কাগজ জালিয়াতি করে নিজের নামে তুলে নেন প্রকল্পের ভ্যালুয়েশন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। একটি আপত্তি দাখিলে শামসুন্নাহার গংদের বিল কেটে মিজানুর রহমান ও তার বন্ধু আশরাফুল আলম, মোসলেহ উদ্দিন মৃধার নামে হয়ে যায়। পরে ঢাকা ডিসি অফিসের এল.এ শাখা থেকে ২০২৫ সালের ১৭ই জুলাই তাদের নামে চেক ছাড় করা হয়। উক্ত অ্যাওয়ার্ডের অনুকূলে মিজানুর রহমান প্রথমে প্রায় দশগুণ বাড়িয়ে সাড়ে ৩৪ কোটি টাকা বিল তৈরি করলেও পরে ডিসি অফিসের আপত্তিতে তা সংশোধন করে ২২ কোটি করা হয়। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে তাদের অনুকূলে পাস হওয়া ১৯ কোটি ৩৯ লাখ ৩৫ হাজার ৬৯ টাকার বিল আটকে দেন মিজানুর রহমান। এ কাজে মিজানুর রহমানকে ডিসি অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার সহায়তার প্রমাণ পেয়েছে। পরে ভুক্তভোগীদের উক্ত বিলের সাড়ে ১৯ কোটি টাকা থেকে ৭ কোটি ৫৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯ টাকা মিজানের ব্যাংক হিসাবে ট্রান্সফার হয়। যার এওয়ার্ড নম্বর ৫ এর অনুকূলে ২১ লাখ ৫৫ হাজার ৫৯২ টাকা এবং এওয়ার্ড নম্বর ৪৪ এর অনুকূলে ২ কোটি ১১ লাখ ২ হাজার ৬৪২ টাকা। স্থাপনা বিল করা হয় ৬৭ কোটি ২০ লাখ ৭৪ হাজার ৬৪২ টাকা।

অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পাওয়া স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জানান, সরকারি বিল ছাড় করার জন্য গণপূর্তের প্রকৌশলী মিজান ও তার মধ্যস্থতাকারী দালালদের মোট বিলের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়েছে। অন্যথায় বিলে বাধা সৃষ্টি করা হতো। অভিযোগ রয়েছে, অধিগ্রহণের আগেই স্থানীয় দালাল স্বপন ভুঁইয়া ও মোস্তফা হাজীর মাধ্যমে স্ট্যাম্পে চুক্তি করে বিল তৈরি করতেন মিজান। বিল অনুমোদনের পর সেই চুক্তি অনুযায়ী কমিশন বুঝিয়ে দেওয়া হতো। পাশাপাশি আরএস ২৯৯ নম্বর দাগের ৩০ ও ৩১ নম্বর অ্যাওয়ার্ডেও শেখ মিজানুর রহমানের নাম ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করা হয়েছে। উপায়ান্তর না পেয়ে ভুক্তভোগীরা উচ্চ আদালতে রিট করেন।

ইউসিবি ব্যাংকের পল্লী বিদ্যুৎ শাখায় মো. মিজানুর রহমানের একাধিক ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব ছাড়াও মমতাজ কনস্ট্রাকশন এবং তার ভাই কামরুজ্জামানের নামে বিভিন্ন হিসাব খোলা হয়েছিল। এসব অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তা ছাড়া ব্র্যাক ব্যাংকের উত্তরা জসিমউদ্দিন শাখাতেও তার মোটা অঙ্কের সন্দেহজনক লেনদেন হয়। গত জুলাই মাসে গণঅভ্যুত্থানের পর দুর্নীতির বিষয়টি ফাঁস হলে মিজানকে সাভার থেকে সরিয়ে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত উপ-বিভাগ-২ এ বদলি করা হয়। সেখান থেকে পরবর্তীতে তিনি সংসদ সচিবালয় ও জুলাই জাদুঘরের দায়িত্ব সামলান। বর্তমানে তিনি গণপূর্ত শেরেবাংলা নগর উপ-বিভাগ-২ এ উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে: কিলোমিটার প্রতি খরচ ১১২৭ কোটি টাকা

আপডেট সময় : ০৭:৫০:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উড়াল সড়ক নির্মাণের খরচের তুলনায় ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি ধরা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, চীনের সিচুয়ান প্রদেশে দুর্গম পাহাড় কেটে তৈরি ইবিন-পানঝিহুয়া এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় হয় ৩৬৫ কোটি টাকা। ভারতের আট লেনের দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়েতে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয়েছিল ৩২০ কোটি টাকা এবং ইন্দোনেশিয়ার শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ এক্সপ্রেসওয়েতে কিলোমিটার প্রতি খরচ দাঁড়ায় ৩৯০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে কিলোমিটার প্রতি খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। অস্বাভাবিক এই ব্যয় বৃদ্ধিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্ক। জাতীয় সংসদে সেতুমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রজেক্টটির অনিয়ম ও দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে দুদক ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে।

প্রকল্প এলাকায় সরজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এক্সপ্রেসওয়ের গার্ডার থেকে অন্তত ২০ থেকে ৩০ ফুট দূরে অবস্থিত স্থাপনাকেও অধিগ্রহণ তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। এমনকি প্রধান সড়ক থেকে ২০-২৫ ফুট ব্যবধানে থাকা ভবনগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারি তহবিল থেকে তুলে নেওয়া হয়। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকল্পের প্রায় ৫০টিরও বেশি ভুয়া অধিগ্রহণ দেখিয়ে অসাধু চক্র কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। এ ক্ষেত্রে সাভারের তৈয়বপুর মৌজার আরএস ৫৩৫, ৫৩৬, ৫৪৩, ৫৪৫, ৫৪৭, ৫৬২, ৮০০, ৮১১, ৮১৭, ৮১৮, ৮১৯, ৮২৪, ৮২৫, ৮২৬, ৮২৯, ৮৩১ ও ৮৩২ নম্বর দাগের ভূমি ও দালানকোঠা অধিগ্রহণ দেখিয়ে শত শত কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়। একইভাবে বাইপাইল মৌজার আরএস ১৯১, ২১১, ২১৩, ২১৪, ৮৪৫ ও ৮৪৬ নম্বর দাগেও চরম দুর্নীতি হয়েছে। এসব দাগের অনেক স্থাপনার মাত্র ২ থেকে ৩ ফিট অংশ এক্সপ্রেসওয়ের গার্ডারে স্পর্শ করলেও পুরো ভবন বা জমি অধিগ্রহণের ভুয়া বিল তৈরি করা হয়েছে। এতে হুহু করে প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়ে যায়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পের অন্তত ৫০-এর অধিক ভুয়া অধিগ্রহণ দেখিয়ে টাকা তুলে নেন মিজান সিন্ডিকেট। এমন অন্তত ১০টি দাগের কাগজপত্র পেয়েছে। একই দাগে ৪৬ নম্বর অ্যাওয়ার্ডে আমিনুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি দোতলা ভবন অধিগ্রহণ দেখিয়ে ২ কোটি ১১ লাখ টাকা বিল তুলে নেয়া হয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় নজিরবিহীন জালিয়াতি করা হয় আর.এস ২১২ নম্বর দাগের ৬৫ নম্বর অ্যাওয়ার্ডধারী নাজমুল হোসেন ভূঁইয়াসহ আরও ১১ জন ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিকদের সঙ্গে। উক্ত দাগে অধিগ্রহণের সকল প্রক্রিয়া শেষে ভুক্তভোগীদের বিল উত্তোলনের কয়েক মাস আগে মিজানুর রহমান স্থাপনা থাকা জমি মালিকের কাছ থেকে ৩৬ শতাংশ জমির মাত্র ২ শতাংশ রেজিস্ট্রি করে নেন। পরে হাইকোর্ট ভুক্তভোগীদের পক্ষে রুল ইস্যু করেন। এ ছাড়া, প্রকল্পের আরএস ২৯৮ নম্বর দাগে আশুলিয়া গাজীরচট ডিইপিজেড রোড বাইতুন নুর মসজিদের অপরপাশে আব্দুর রাজ্জাক নামের এক ব্যক্তির তানভির কমপ্লেক্স ও এর পাশে আরেকটি ভবন অধিগ্রহণ দেখানো হয়।

এই জালিয়াতি ও লুটপাটের মূল ক্রীড়নক ছিলেন গণপূর্ত সাভার সার্কেলের তৎকালীন উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান। তিনি ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের আশুলিয়া, বাইপাইল ও ইপিজেড অংশে অবকাঠামোর মূল্য নির্ধারণ এবং ক্ষতিপূরণ পরিমাপের দায়িত্বে ছিলেন। ঢাকা জেলা প্রশাসনের এল.এ শাখার সঙ্গে যৌথভাবে সরজমিন পরিমাপের সুযোগ নিয়ে তিনি একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ২৩২ কোটি টাকা লুটের সুনির্দিষ্ট তথ্য মিললেও, দুদক সূত্রে জানা গেছে যে ভুয়া অধিগ্রহণের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া মোট অর্থের পরিমাণ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। বেশিরভাগ জমি ও অবকাঠামোর ভ্যালুয়েশন প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ৫ থেকে ১০ গুণ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল। সেই সুবাধে তিনি অধিগ্রহণের সময় শতাধিক স্থাপনা জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি পরিবার নিয়ে সেখানে বসবাস করছেন। এরপরও ভিকটিমরা প্রকৌশলী মিজানের সঙ্গে সমঝোতা করতে বাধ্য হয়।

প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে বাইপাইল অংশে এল.এ কেস নম্বর ০৩.১৫.১০/২০১৯-২০২০ এর আর.এস ২১২ নম্বর দাগে। সেখানকার ৬৭ নম্বর অ্যাওয়ার্ডের অধীনে আসল মালিক আওলাদ হোসেনসহ ৭ জনের অনুকূলে ৩ কোটি ৪৪ লাখ ৩৮ হাজার ৭৫১ টাকা ক্ষতিপূরণ মঞ্জুর হয়। কিন্তু মিজান সিন্ডিকেট জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা আত্মসাৎ করে। পরবর্তীতে গত ১৪ই জুলাই ডিসি অফিস থেকে ভুক্তভোগী দোকান মালিকদের নামে ব্র্যাক ব্যাংকের উত্তরা জসিমউদ্দিন শাখায় হিসাব খুলে সব টাকা জমা করা হয়। এর পরের দিনই অর্থাৎ ১৫ই জুলাই মিজানুর ও তার সহযোগী আশরাফুল আলমের ব্যাংক হিসাবে ৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা স্থানান্তর করা হয়। এখানেই শেষ নয়, একই দাগের ২৪/১ নম্বর অ্যাওয়ার্ড দেখিয়ে আরও ১ কোটি ২০ লাখ ৮২ হাজার ১০৮ টাকা হাতিয়ে নেন মিজান। কোন ভবনে কতো টাকা ক্ষতিপূরণ দেখানো হয়েছে, কাদের নামে অ্যাওয়ার্ড হয়েছে, এবং এল.এ শাখা থেকে কারা বিল তুলে নিয়েছে এর সমস্ত কাগজপত্র হাতে সংরক্ষিত আছে। এই দাগের ৬৭ নম্বর অ্যাওয়ার্ডে স্থাপনা মালিক আওলাদ হোসেনসহ আরও ৬ জন। একই কায়দায় আর.এস ২১২ নম্বর দাগের ৬৪ নম্বর অ্যাওয়ার্ডের স্থাপনা মালিক শামসুন্নাহার রেখাসহ তার ৭ ভাইবোনের নামে পাস হওয়া ২২ কোটি ৩২ লাখ ৯৮ হাজার ২৬৭ টাকার বিলও কাগজ জালিয়াতি করে নিজের নামে তুলে নেন প্রকল্পের ভ্যালুয়েশন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। একটি আপত্তি দাখিলে শামসুন্নাহার গংদের বিল কেটে মিজানুর রহমান ও তার বন্ধু আশরাফুল আলম, মোসলেহ উদ্দিন মৃধার নামে হয়ে যায়। পরে ঢাকা ডিসি অফিসের এল.এ শাখা থেকে ২০২৫ সালের ১৭ই জুলাই তাদের নামে চেক ছাড় করা হয়। উক্ত অ্যাওয়ার্ডের অনুকূলে মিজানুর রহমান প্রথমে প্রায় দশগুণ বাড়িয়ে সাড়ে ৩৪ কোটি টাকা বিল তৈরি করলেও পরে ডিসি অফিসের আপত্তিতে তা সংশোধন করে ২২ কোটি করা হয়। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে তাদের অনুকূলে পাস হওয়া ১৯ কোটি ৩৯ লাখ ৩৫ হাজার ৬৯ টাকার বিল আটকে দেন মিজানুর রহমান। এ কাজে মিজানুর রহমানকে ডিসি অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার সহায়তার প্রমাণ পেয়েছে। পরে ভুক্তভোগীদের উক্ত বিলের সাড়ে ১৯ কোটি টাকা থেকে ৭ কোটি ৫৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯ টাকা মিজানের ব্যাংক হিসাবে ট্রান্সফার হয়। যার এওয়ার্ড নম্বর ৫ এর অনুকূলে ২১ লাখ ৫৫ হাজার ৫৯২ টাকা এবং এওয়ার্ড নম্বর ৪৪ এর অনুকূলে ২ কোটি ১১ লাখ ২ হাজার ৬৪২ টাকা। স্থাপনা বিল করা হয় ৬৭ কোটি ২০ লাখ ৭৪ হাজার ৬৪২ টাকা।

অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ পাওয়া স্থানীয় ভুক্তভোগীরা জানান, সরকারি বিল ছাড় করার জন্য গণপূর্তের প্রকৌশলী মিজান ও তার মধ্যস্থতাকারী দালালদের মোট বিলের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হয়েছে। অন্যথায় বিলে বাধা সৃষ্টি করা হতো। অভিযোগ রয়েছে, অধিগ্রহণের আগেই স্থানীয় দালাল স্বপন ভুঁইয়া ও মোস্তফা হাজীর মাধ্যমে স্ট্যাম্পে চুক্তি করে বিল তৈরি করতেন মিজান। বিল অনুমোদনের পর সেই চুক্তি অনুযায়ী কমিশন বুঝিয়ে দেওয়া হতো। পাশাপাশি আরএস ২৯৯ নম্বর দাগের ৩০ ও ৩১ নম্বর অ্যাওয়ার্ডেও শেখ মিজানুর রহমানের নাম ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করা হয়েছে। উপায়ান্তর না পেয়ে ভুক্তভোগীরা উচ্চ আদালতে রিট করেন।

ইউসিবি ব্যাংকের পল্লী বিদ্যুৎ শাখায় মো. মিজানুর রহমানের একাধিক ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব ছাড়াও মমতাজ কনস্ট্রাকশন এবং তার ভাই কামরুজ্জামানের নামে বিভিন্ন হিসাব খোলা হয়েছিল। এসব অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তা ছাড়া ব্র্যাক ব্যাংকের উত্তরা জসিমউদ্দিন শাখাতেও তার মোটা অঙ্কের সন্দেহজনক লেনদেন হয়। গত জুলাই মাসে গণঅভ্যুত্থানের পর দুর্নীতির বিষয়টি ফাঁস হলে মিজানকে সাভার থেকে সরিয়ে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত উপ-বিভাগ-২ এ বদলি করা হয়। সেখান থেকে পরবর্তীতে তিনি সংসদ সচিবালয় ও জুলাই জাদুঘরের দায়িত্ব সামলান। বর্তমানে তিনি গণপূর্ত শেরেবাংলা নগর উপ-বিভাগ-২ এ উপ-সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।