ঢাকা ০২:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

দেশজুড়ে চাহিদা বাড়ছে কমলগঞ্জের গ্রাফটিং টমেটো চারার

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৪৯:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ ২৬ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় উদ্ভাবনী গ্রাফটিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত টমেটোর চারা এখন কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এই পদ্ধতিতে তিত বা বনবেগুনের শক্ত শিকড়ের ওপর টমেটোর চারা জোড়া লাগানো হয়। পলিথিন দিয়ে বেঁধে তিন থেকে ছয় দিন বিশেষ পরিচর্যায় রাখার পর দুটি অংশ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়। এরপর আরও ১০ থেকে ১২ দিন নার্সারির বিশেষ ঘরে রেখে চারাগুলোকে পুরোপুরি শক্ত করে তোলা হয়। বর্তমানে আদমপুর, জালালপুর, বনগাঁও, কান্দিগাঁও, মধ্যগাঁও ও নাজাতকোনাসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩০০ নার্সারিতে বাণিজ্যিকভাবে এই চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে এসব নার্সারি ও গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ হয়েছে। ক্যাপশন ২: তিত বেগুনের শিকড়ের সঙ্গে টমেটোর অংশ জুড়ে তৈরি হচ্ছে গ্রাফটিং চারা। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আদমপুরে। কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রাফটিং পদ্ধতিতে চারা তৈরির জন্য প্রথমে তিত বেগুন বা বনবেগুন ও টমেটোর আলাদা বীজতলা তৈরি করা হয়।

উৎপাদিত এসব চারা কেবল স্থানীয় চাহিদা মেটাচ্ছে না, বরং কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জ, পটুয়াখালী, হবিগঞ্জ ও কক্সবাজারসহ দেশের নানা প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। প্রতি বছর এখান থেকে প্রায় ৬৫ লাখ চারা বিক্রি হয়, যার প্রতিটি ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে লেনদেন হয়। সব মিলিয়ে এ খাত থেকে বছরে সাত কোটি টাকার বেশি অর্থনৈতিক লেনদেন হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে এই পেশার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন প্রায় হাজারো কৃষক ও শ্রমিক, যাদের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। একজন দক্ষ শ্রমিক দিনে গড়ে ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০টি পর্যন্ত চারা গ্রাফটিং করতে পারেন। প্রতি চারার জন্য শ্রমিকরা এক টাকা করে মজুরি পান, যা তাদের জীবিকায় বড় ভূমিকা রাখছে। এসব চারার জীবনকাল বেশি হওয়ায় এর চাহিদা শুধু কমলগঞ্জেই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলাতেও ব্যাপক।ক্যাপশন ৩: বিভিন্ন স্থানে চারাগুলো পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। দৈনিক একেকজন শ্রমিক ১ হাজার ২০০ পর্যন্ত চারা তৈরি করতে পারেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষকেরা এসে চারা কিনে নিয়ে যান।

কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাকিবুল ইসলাম জানান, গ্রাফটিং করা টমেটোগাছ সাধারণ গাছের তুলনায় অনেক বেশি টেকসই হয়। সাধারণ টমেটোগাছ যেখানে তিন মাস পর্যন্ত বাঁচে, সেখানে গ্রাফটিং করা গাছ আট মাস পর্যন্ত টিকে থাকে। এছাড়া এগুলো সহজে ঢলে পড়ে না এবং রোগবালাইয়ের আক্রমণও তুলনামূলক কম হয়। চারা তৈরির প্রক্রিয়ায় তিত বেগুনের চারা বড় করতে প্রায় ৩৫ দিন এবং টমেটোর চারা তৈরিতে প্রায় ২৫ দিন সময় লাগে। এরপর সুস্থ ও সমান আকারের চারাগুলো বেছে নিয়ে গ্রাফটিংয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়। চাকরি থেকে অবসরের পর সেনাবাহিনীর একটা প্রজেক্টে রংপুরে গিয়ে গ্রাফটিং টমেটোর চারা তৈরির কাজ শেখেন।

এই শিল্পের পথিকৃৎদের একজন হলেন আরিফ হাইব্রিড টমেটো নার্সারি অ্যান্ড প্রোডাক্টসের মালিক এম এ করিম। অবসরপ্রাপ্ত এই সেনাসদস্য রংপুরে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজ এলাকায় এই উদ্যোগ শুরু করেছিলেন। তাঁর দেখাদেখিতে এখন অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন। তাঁর নার্সারিতে সপ্তাহে প্রায় ৮০ হাজার চারা তৈরি ও বিক্রি হয়, যেখানে তিন শিফটে ৬০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। শ্রমিক সুমন মিয়া জানান, এই কাজে পরিশ্রম কম এবং আয় ভালো, তাই একবার প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর কেউ আর এই পেশা ছাড়তে চান না।

উপজেলার এমন সম্ভাবনাময় কৃষি খাতের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সন্দ্বীপ তালুকদার। তিনি বিভিন্ন নার্সারি পরিদর্শন করেছেন এবং এই খাতে সম্পৃক্ত কৃষকদের সব ধরনের সরকারি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। তাঁর মতে, উৎপাদন ব্যবস্থা আরও উন্নত ও সহজতর করার মাধ্যমে দেশের কৃষকদের দোরগোড়ায় মানসম্মত চারা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। গ্রাফটিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারাগুলো দেশের কৃষিতে টমেটো চাষের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

দেশজুড়ে চাহিদা বাড়ছে কমলগঞ্জের গ্রাফটিং টমেটো চারার

আপডেট সময় : ১০:৪৯:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় উদ্ভাবনী গ্রাফটিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত টমেটোর চারা এখন কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। এই পদ্ধতিতে তিত বা বনবেগুনের শক্ত শিকড়ের ওপর টমেটোর চারা জোড়া লাগানো হয়। পলিথিন দিয়ে বেঁধে তিন থেকে ছয় দিন বিশেষ পরিচর্যায় রাখার পর দুটি অংশ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়। এরপর আরও ১০ থেকে ১২ দিন নার্সারির বিশেষ ঘরে রেখে চারাগুলোকে পুরোপুরি শক্ত করে তোলা হয়। বর্তমানে আদমপুর, জালালপুর, বনগাঁও, কান্দিগাঁও, মধ্যগাঁও ও নাজাতকোনাসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩০০ নার্সারিতে বাণিজ্যিকভাবে এই চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে এসব নার্সারি ও গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ হয়েছে। ক্যাপশন ২: তিত বেগুনের শিকড়ের সঙ্গে টমেটোর অংশ জুড়ে তৈরি হচ্ছে গ্রাফটিং চারা। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আদমপুরে। কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রাফটিং পদ্ধতিতে চারা তৈরির জন্য প্রথমে তিত বেগুন বা বনবেগুন ও টমেটোর আলাদা বীজতলা তৈরি করা হয়।

উৎপাদিত এসব চারা কেবল স্থানীয় চাহিদা মেটাচ্ছে না, বরং কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জ, পটুয়াখালী, হবিগঞ্জ ও কক্সবাজারসহ দেশের নানা প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। প্রতি বছর এখান থেকে প্রায় ৬৫ লাখ চারা বিক্রি হয়, যার প্রতিটি ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে লেনদেন হয়। সব মিলিয়ে এ খাত থেকে বছরে সাত কোটি টাকার বেশি অর্থনৈতিক লেনদেন হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে এই পেশার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন প্রায় হাজারো কৃষক ও শ্রমিক, যাদের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। একজন দক্ষ শ্রমিক দিনে গড়ে ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০টি পর্যন্ত চারা গ্রাফটিং করতে পারেন। প্রতি চারার জন্য শ্রমিকরা এক টাকা করে মজুরি পান, যা তাদের জীবিকায় বড় ভূমিকা রাখছে। এসব চারার জীবনকাল বেশি হওয়ায় এর চাহিদা শুধু কমলগঞ্জেই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলাতেও ব্যাপক।ক্যাপশন ৩: বিভিন্ন স্থানে চারাগুলো পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। দৈনিক একেকজন শ্রমিক ১ হাজার ২০০ পর্যন্ত চারা তৈরি করতে পারেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষকেরা এসে চারা কিনে নিয়ে যান।

কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাকিবুল ইসলাম জানান, গ্রাফটিং করা টমেটোগাছ সাধারণ গাছের তুলনায় অনেক বেশি টেকসই হয়। সাধারণ টমেটোগাছ যেখানে তিন মাস পর্যন্ত বাঁচে, সেখানে গ্রাফটিং করা গাছ আট মাস পর্যন্ত টিকে থাকে। এছাড়া এগুলো সহজে ঢলে পড়ে না এবং রোগবালাইয়ের আক্রমণও তুলনামূলক কম হয়। চারা তৈরির প্রক্রিয়ায় তিত বেগুনের চারা বড় করতে প্রায় ৩৫ দিন এবং টমেটোর চারা তৈরিতে প্রায় ২৫ দিন সময় লাগে। এরপর সুস্থ ও সমান আকারের চারাগুলো বেছে নিয়ে গ্রাফটিংয়ের কাজ সম্পন্ন করা হয়। চাকরি থেকে অবসরের পর সেনাবাহিনীর একটা প্রজেক্টে রংপুরে গিয়ে গ্রাফটিং টমেটোর চারা তৈরির কাজ শেখেন।

এই শিল্পের পথিকৃৎদের একজন হলেন আরিফ হাইব্রিড টমেটো নার্সারি অ্যান্ড প্রোডাক্টসের মালিক এম এ করিম। অবসরপ্রাপ্ত এই সেনাসদস্য রংপুরে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজ এলাকায় এই উদ্যোগ শুরু করেছিলেন। তাঁর দেখাদেখিতে এখন অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন। তাঁর নার্সারিতে সপ্তাহে প্রায় ৮০ হাজার চারা তৈরি ও বিক্রি হয়, যেখানে তিন শিফটে ৬০ জন শ্রমিক কাজ করছেন। শ্রমিক সুমন মিয়া জানান, এই কাজে পরিশ্রম কম এবং আয় ভালো, তাই একবার প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর কেউ আর এই পেশা ছাড়তে চান না।

উপজেলার এমন সম্ভাবনাময় কৃষি খাতের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সন্দ্বীপ তালুকদার। তিনি বিভিন্ন নার্সারি পরিদর্শন করেছেন এবং এই খাতে সম্পৃক্ত কৃষকদের সব ধরনের সরকারি সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। তাঁর মতে, উৎপাদন ব্যবস্থা আরও উন্নত ও সহজতর করার মাধ্যমে দেশের কৃষকদের দোরগোড়ায় মানসম্মত চারা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। গ্রাফটিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত চারাগুলো দেশের কৃষিতে টমেটো চাষের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।