পাঁচ সপ্তাহে পাঁচ বিশিষ্টজনের হেনস্থা: নেপথ্যে কী?
- আপডেট সময় : ০৭:২১:০৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২৩ বার পড়া হয়েছে
গত পাঁচ সপ্তাহে বাংলাদেশের পাঁচ খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব বিভিন্নভাবে নাজেহাল পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। এদের কেউ নিজ দেশে, আবার কেউ দেশের বাইরে অবস্থানকালে হেনস্থার সম্মুখীন হয়েছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না; কাউকে সরাসরি মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, আবার কাউকে পড়তে হচ্ছে ধরপাকড়ের আতঙ্কে। এই ঘটনাগুলো কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ের নয়, বরং সামগ্রিক সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মাত্র ৫ সপ্তাহে ৫ খ্যাতিমান নাজেহাল। দলীয় দৃষ্টিকোণে অনেকে প্রশংসাও করছেন। তবে হেনস্থাকারীরা পাল্টা হেনস্থার শিকারও হচ্ছেন। হচ্ছে মামলা-মোকদ্দমা, চলছে ধর-পাকড়ও। এই সময়েই ঢাকায় ঘটলো সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলা।
হেনস্থার শিকার ব্যক্তিদের তালিকায় প্রথমেই আসে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম। যদিও তিনি অনেক আগেই প্রয়াত হয়েছেন, কিন্তু তাকে জড়িয়ে বিভিন্ন সময় নানা বিতর্ক ও হেনস্থার প্রচেষ্টা চালানো হয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৮৬১ সালের ৭ মে বা ২৫ বৈশাখ জন্মগ্রহণ করা রবীন্দ্রনাথ ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৯২৬ সালে তিনি অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন। অথচ, সম্প্রতি তাকে ঘিরে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছে এবং তার পরিবারের প্রধান পেশা নিয়ে কুৎসা রটানো হয়েছে। অথচ ১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট তার প্রয়াণের পরও তার সাহিত্যিক ও মানবিক অবদান বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। প্রথম আঘাত রবীন্দ্রনাথ কৌশলে নিয়ন্ত্রিত সংঘাত অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে হিন্দু সম্প্রদায়ের পবিত্র ‘মহালয়া’। আটদিন পরই পবিত্র দুর্গা পূজর মহোৎসব।
রাজনৈতিক অঙ্গনের ব্যক্তিদের হেনস্থা করার চিত্র আরও প্রকট। জাপা-প্রধান জিএম কাদেরকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্ক তার বড় প্রমাণ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে যে তিনি আওয়ামীপন্থী এবং শেখ হাসিনার সাথে আঁড়ি পেতে ফোনে কথোপকথন চালিয়েছেন। টেলিভিশনের পর্দায় তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, তিনি বিএনপি আতঙ্কে ভুগছেন এবং ভবিষ্যতে কোনোভাবেই আর বিএনপিতে ফেরার সম্ভাবনা নেই। এই বক্তব্য কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি হয় এবং বিষয়টি থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়ায়। সবাই হেনস্থা হয়েছেন স্বদেশীদের দ্বারাই। ‘মব’ সংস্কৃতির বিষয়টি এখন সর্বত্র আলোচিত।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার পুত্র ও সাবেক প্রযুক্তি উপদেষ্টার বিষয়েও বিভিন্ন সময় নেতিবাচক প্রচারণা ও হেনস্থার খবর পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা, যেমন রুমিন ফারহানা বা জয়কেও নানা সময় বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। কোথাও কোথাও পুলিশি অভিযান ও রিমান্ডের ঘটনাও ঘটেছে। যেমন, নেতা আয়াসকে গ্রেপ্তারের পর তাকে আদালতে তোলা হলে জামিন আবেদন খারিজ করে তাকে পুলিশ রিমান্ডে নেওয়া হয়। যদিও অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে ছিল, তবুও জনরোষ বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চাপের মুখে সাধারণ মানুষকে প্রায়ই হেনস্থার শিকার হতে দেখা যাচ্ছে।
এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীলদের ক্ষেত্রেও নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি এক পুলিশ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানামুখী আলোচনা। সব মিলিয়ে গত ৩৫ দিনে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা দেশের সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক অঙ্গনের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। খ্যাতিমানদের হেনস্থা করার এই প্রবণতা অদূর ভবিষ্যতে জাতীয় জীবনের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পেছনে কোনো না কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা ব্যক্তিগত রেষারেষি কাজ করছে কি না, তা নিয়েও জনমনে সন্দেহ দানা বাঁধছে।

























