অতিরিক্ত ডিআইজি জহিরের কুকীর্তি ফাঁস
- আপডেট সময় : ০১:৩৪:০৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ৩২ বার পড়া হয়েছে
অবশেষে ফাঁস হলো পুলিশ হাউজিংয়ে বাড়ি তৈরি করে সেখানে নারী, মদ ও জুয়ার আসর বসিয়ে টাকা উপার্জনে জড়িত এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিতর্কিত পতিত স্বৈরাচারের দোসর অ্যাডিশনাল ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের সকল কুকীর্তি। পুলিশ সদরদপ্তরের রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখায় কর্মরত অ্যাডিশনাল ডিআইজি (সুপারনিউমারারি) আব্দুল্লাহ আল জহিরকে সদর দপ্তরের হেডকোয়ার্টার্স শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এ-সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়। আইজিপি আলী হোসেন ফকির স্বাক্ষরিত আদেশে বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আব্দুল্লাহ আল জহিরকে হেডকোয়ার্টার্স শাখায় সংযুক্ত করা হলো। আদেশে আরও বলা হয়, এ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে।
অভিযানে ৮৪ জন আটক
এর আগে গত সোমবার রাজধানীর ভাটারা থানাধীন পুলিশ হাউজিং-১ এলাকায় জহিরের বাড়িতে অভিযান চালায় ডিবির গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের একটি দল। অভিযানে মাদকদ্রব্য উদ্ধারসহ নারী ও পুরুষ মিলিয়ে মোট ৮৪ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ২৬ জন নারী ও ৫৮ জন পুরুষ এবং একজন আফগানিস্তানের নাগরিকও আছেন। সোমবার রাত থেকে শুরু হওয়া এই অভিযান মঙ্গলবার বিকেলে শেষ হয়। মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম। ডিবি প্রধান বলেন, ওই পুলিশ কর্মকর্তা বাড়িটি ভাড়া দিয়েছেন। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ও অবৈধ ডিজে পার্টি চলছিল। এসব পার্টির জন্য তারা অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিতেন। ডিবির একটি সূত্র জানায়, বাসাটিতে ডিজে পার্টির নামে মাদকের আসর বসত। এসব পার্টিতে তরুণ-তরুণী ছাড়াও বিভিন্ন বয়সী মানুষ অংশ নিতেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাড়িটি অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের। তার বাড়িতে মাদকের কারবারের অভিযোগে ডিবির অভিযানের বিষয়ে জানতে তাকে গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। ডিবি সূত্রে জানা গেছে, অভিযান চালিয়ে ওই বাড়ি থেকে গাঁজা, ইয়াবা, মদ এবং ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের ডিসি ইলিয়াস কবির জানান, এয়ারবিএনবির মাধ্যমে বাড়িটি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। একজন হোস্ট ও একজন কো-হোস্টের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হচ্ছিল। কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ডিবির একটি সূত্র জানায়, অ্যাডিশনাল ডিআইজি আটক কো-হোস্টকে ছেড়ে দেওয়ার জন্য তদবিরও করেছিলেন। আড়াই তলার থ্রিপ্লেক্স বাড়িটিতে প্রতি রাতেই অবৈধভাবে মদসহ ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো। অদ্যাবধি উক্ত টাকার বিনিময়ে ১ বিঘা জমিও ক্রয় করা হয়নি।
জহিরের অন্যান্য বিতর্কিত কর্মকাণ্ড
অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির অতিরিক্ত আইজি এডমিন মোখলেছুর রহমানের স্টাফ অফিসার হিসেবে ৪ বছর দায়িত্বরত ছিলেন। মোখলেছুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহের ছাত্রলীগের সভাপতি ও পুলিশে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের অন্যতম নেতা। তার স্টাফ অফিসার থাকাকালে জহির বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা বাগিয়ে নেন। পুলিশের আরেক কর্মকর্তা প্রলয় জোয়ারদারের সাথে মিলে রিমঝিম পুলিশ টাউন নামে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলেন তিনি। এ সময় ২৪ বিসিএসের কর্মকর্তাদের জোরপূর্বক এ প্রকল্পের প্লট কিনতে বাধ্য করা হতো। যারা প্লট কিনতে অস্বীকার করতেন তাদের পদোন্নতি আটকে দেওয়া হতো। রিমঝিম পুলিশ টাউনের মূল হোতা প্রলয় জোয়ারদার এবং জহির। অলিউর রহমান নামে জহিরের বন্ধুকে দিয়ে কোম্পানি গঠন করে গড়ে তোলে এই আবাসন প্রকল্প। জোরপূর্বক জমি দখল, ফসলী জমি না কিনেই বালু দিয়ে দখল করে নেওয়া এবং কম মূল্যে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করার হাজার হাজার অভিযোগ রয়েছে এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে। এলাকাবাসী তাদের অত্যাচারের প্রতিবাদে বহুবার মানববন্ধন করেছেন। হাইকোর্ট রিমঝিম পুলিশ টাউনকে চিরতরে অবৈধ ঘোষণা করে সকল জমি পূর্বাবস্থায় ফেরত দেওয়ার নির্দেশনা প্রদান করে। এছাড়া মোখলেছুর রহমানের অবসনের পর জহির আশ্রয় নেন প্রলয় জোয়ারদারের সহযোগী ও মনিরুল ইসলামের কাছে। প্রলয়-মনিরুল ছিলেন পুলিশের একই গ্রুপের। সেই সুযোগে অল্প সময়েই জহির পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সাবেক প্রধান পলাতক মনিরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তাকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, ইয়াবা পাচারকারীদের নিকট থেকে নিয়মিত মাসোহারা সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল জহিরের। মনিরুলের সহযোগিতায় পিওএইচএস-২ প্রকল্পের জমি ক্রয়ের ঠিকাদারি বাগিয়ে নেয় রিমঝিম তথা জহির চক্র। এ সময় তাদের সাথে যুক্ত হন নারায়ণগঞ্জের সাবেক এসপি গোলাম রাসেল এবং ঢাকার এসপি, সাভার আশুলিয়ার জুলাই আন্দোলনে গণহত্যা ও লাশ পোড়ানোর হুকুমদাতা আসাদুজ্জামান। এছাড়া পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্ট কনস্ট্রাকশন কোম্পানীর মালামাল ক্রয়েও চরম অনিয়ম-দুর্নীতি করেছেন জহির। প্রতিটি পণ্য পূর্বতন সাপ্লাইয়ারের চেয়ে কমপক্ষে ১৫% বেশি দরে ক্রয় করতে বাধ্য করা হয় কর্মকর্তাদের। জুলাই আন্দোলনের পর ভোল পাল্টে পুলিশের হেড কোয়ার্টারের ক্ষমতাধর কর্মকর্তার নিকট আশ্রয় নেন জহির। প্রথমে হেডকোয়ার্টারের ডেভেলপমেন্ট শাখায় নিজ পছন্দে পোস্টিং নেন, পরে আর্থিক সুবিধার আশায় পোর্সোনাল ম্যানেজমেন্ট-২ শাখায় বদলি হন। এ চক্রের আরেক দুর্নীতিবাজ সাবেক ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুকের সহায়তায় পিওএইচিএস-২ এর জমি ক্রয়ের চুক্তি করে ২০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে রিমঝিম আবাসন কোম্পানী তথা জহির চক্র। পরে সেখানে আর্থিকভাবে কোনো সুযোগ নেই দেখে বদলী হন পোর্সোনাল ম্যানেজমেন্ট-২ শাখায়।


























