ঢাকা ১০:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, ২৭ শতাংশ শিশুর অ্যান্টিবডি নেই

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২৮:০৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশের শিশুদের শরীরে হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রথমবারের মতো একটি বড়সড় গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়ম মেনে টিকা দেওয়ার পরও ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুর শরীরে হাম প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। বিশেষ করে ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই প্রতিরোধক্ষমতা না গড়ে ওঠার হার বেশি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখন টিকা এবং পুরো টিকাদান ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবনার তাগিদ দিচ্ছেন। টিকা ও টিকাদানব্যবস্থা নিয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিজ্ঞানী বলেছেন, এই ২১ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে এটা বলা যাবে না, অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি এটাও বলা যাবে না। গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০৯ শিশুর মধ্যে ৮৫টির শরীরে কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। রোগ প্রতিরোধ গড়ে ওঠার প্রবণতা ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের তুলনায় ১৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে বেশি। ধরেই নেওয়া হয় টিকার মানে কোনো ঘাটতি নেই। টিকা উৎপাদন থেকে শুরু করে বিমানবন্দর হয়ে নানা পথ ঘুরে অবশেষে টিকা শিশুর কাছে পৌঁছায়।

গবেষণাটি পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, ইস্টার্ন মেডিটেরানিয়ান পাবলিক হেলথ নেটওয়ার্ক এবং ঢাকা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজের ১২ জন গবেষক ও কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন। এই বছর সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও মুন্সিগঞ্জ জেলার ছয়টি উপশহর ও গ্রামের ৩০৯টি শিশুকে এই গবেষণার আওতায় আনা হয়, যাদের বয়স ৯ থেকে ৫৯ মাসের মধ্যে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের কাছ থেকে গবেষণার সারসংক্ষেপ পেয়েছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ৩০৯টি শিশুর মধ্যে মাত্র ২০৩টির বা ৬৫.৭ শতাংশের শরীরে হামের অ্যান্টিবডি শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া ২১টি বা ৬.৮ শতাংশ শিশুর ফলাফল বর্ডার লাইন বা সীমান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সব মিলিয়ে ৮৫টি বা ২৭.৫ শতাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি একেবারেই তৈরি হয়নি। গবেষকদের মতে, সংক্রমণের বিস্তার রোধে যতটুকু রোগ প্রতিরোধক্ষমতা থাকা জরুরি, শিশুদের মধ্যে তার চেয়ে অনেক কম হার দেখা যাচ্ছে।

চলতি বছরের ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশজুড়ে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেছিল স্বাস্থ্য বিভাগ। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য ছিল এই ক্যাম্পেইনের। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা আগে দাবি করেছিলেন যে, ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার তিন-চার সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে সেই সময় পেরিয়ে পাঁচ মাস পার হলেও এখনো হামের সংক্রমণ পুরোপুরি থামেনি। ৪৬ লাখ শিশুকে হিসাবের বাইরে রেখে হামের টিকা।

টিকা কার্যকর না হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। টিকাবিশেষজ্ঞ তাজুল এ বারির মতে, টিকা সংরক্ষণ ও পরিবহনের সময় নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া শিশুদের তীব্র অপুষ্টিও টিকার কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়া শিশুদের শরীরে টিকা বেশি কার্যকর হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। তিনি বলেন, ঠিক কোন পর্যায়ে ত্রুটির কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা দ্রুত অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। টিকা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে হয় এবং পরিবহন করতে হয়। তাজুল এ বারি আরও বলেন, শিশু যদি অতিমাত্রায় অপুষ্টির শিকার হয়, তাহলে তার শরীরে টিকা কম কার্যকর হয়। এর অর্থ বিপুলসংখ্যক শিশু হামে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।

সরকারি সূত্রমতে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) ব্যবহৃত টিকাগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত হলেও স্থানীয় পর্যায়ে এর মান যাচাইয়ের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে প্রতিবছর প্রায় ২০ শতাংশ শিশু বাদ পড়ে যাচ্ছে বলে ১৪ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে জানানো হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সে সময় শিশুদের বিশুদ্ধ টিকা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা কামনা করেন। শিশুরা টিকা পেয়েছে কি না, গবেষকেরা তা নিশ্চিত হন টিকা কার্ড দেখে এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে। ৭০ জন দেশি–বিদেশ বিশেষজ্ঞকে নিয়ে গঠিত যৌথ স্বাধীন পর্যালোচনা দল ১৪ অক্টোবর রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ তুলে ধরে। এ ব্যাপারে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, গ্যাভিসহ সবার সহযোগিতা চান।

তবে এই গবেষণার ফলাফল নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

তিনি বলেন, এই গবেষণাটি বেশ ছোট এবং নমুনার সংখ্যা কম হওয়ায় একে চূড়ান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তিনি টিকার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন। এদিকে বিষয়টি আরও গভীরে পর্যবেক্ষণের জন্য বর্তমানে তিন হাজার শিশুর নমুনা নিয়ে একটি বড় গবেষণা চলছে, যার ফলাফল নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এস এম এ সাফি। এদের রক্তের নমুনা আইইডিসিআরের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। ৩০টি উপজেলার প্রতিটি থেকে ১০০ করে শিশুর নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, এ বছর হামের উপসর্গ নিয়ে সারা দেশের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে ২ লাখ ২২ হাজার ৫৫২ জন। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১০৪ জন এবং উপসর্গের কারণে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ১২৯ জনের। অর্থাৎ হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ২৩৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। মৃত শিশুদের মধ্যে ৯২ শতাংশই কোনো ধরনের হামের টিকা পায়নি। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ৩৮৮ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, বর্তমান তথ্য অনুযায়ী হামের টিকা ঠিকমতো কাজ করছে না। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, টিকার কভারেজ অবশ্যই ৯৫ শতাংশের ওপরে নিতে হবে। পাশাপাশি টিকার বয়সসীমা বাড়িয়ে ১৮ বছর পর্যন্ত করা এবং প্রতি চার বছর অন্তর জাতীয় পর্যায়ে ক্যাম্পেইন নিশ্চিত করা জরুরি। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের টিকা ঠিকমতো কাজে আসছে না। বড় পরিকল্পনা হাতে না নিলে হামের জটিল পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ বের হতে পারবে না।’।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে যে, বয়স বাড়ার সঙ্গে টিকার কার্যকারিতার সম্পর্ক রয়েছে। ছয় মাস বয়সে টিকা দিলে ৫০ শতাংশ শিশুর দেহে, নয় মাসে দিলে ৮৫ শতাংশ শিশুর দেহে এবং ১২ মাসে দিলে ৯০ শতাংশ শিশুর দেহে প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠে। এখন টিকার কার্যকারিতা বাড়াতে এবং শিশুদের সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে নতুন করে কৌশল নির্ধারণের ওপর জোর দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, ২৭ শতাংশ শিশুর অ্যান্টিবডি নেই

আপডেট সময় : ০৯:২৮:০৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

দেশের শিশুদের শরীরে হামের টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রথমবারের মতো একটি বড়সড় গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়ম মেনে টিকা দেওয়ার পরও ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুর শরীরে হাম প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। বিশেষ করে ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই প্রতিরোধক্ষমতা না গড়ে ওঠার হার বেশি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখন টিকা এবং পুরো টিকাদান ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবনার তাগিদ দিচ্ছেন। টিকা ও টিকাদানব্যবস্থা নিয়ে সরকারকে নতুন করে ভাবতে হবে। স্বাস্থ্য খাতের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিজ্ঞানী বলেছেন, এই ২১ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে এটা বলা যাবে না, অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি এটাও বলা যাবে না। গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০৯ শিশুর মধ্যে ৮৫টির শরীরে কোনো অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। রোগ প্রতিরোধ গড়ে ওঠার প্রবণতা ৯ থেকে ১৪ মাস বয়সী শিশুদের তুলনায় ১৫ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে বেশি। ধরেই নেওয়া হয় টিকার মানে কোনো ঘাটতি নেই। টিকা উৎপাদন থেকে শুরু করে বিমানবন্দর হয়ে নানা পথ ঘুরে অবশেষে টিকা শিশুর কাছে পৌঁছায়।

গবেষণাটি পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, ইস্টার্ন মেডিটেরানিয়ান পাবলিক হেলথ নেটওয়ার্ক এবং ঢাকা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজের ১২ জন গবেষক ও কর্মকর্তা যুক্ত ছিলেন। এই বছর সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও মুন্সিগঞ্জ জেলার ছয়টি উপশহর ও গ্রামের ৩০৯টি শিশুকে এই গবেষণার আওতায় আনা হয়, যাদের বয়স ৯ থেকে ৫৯ মাসের মধ্যে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের কাছ থেকে গবেষণার সারসংক্ষেপ পেয়েছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ৩০৯টি শিশুর মধ্যে মাত্র ২০৩টির বা ৬৫.৭ শতাংশের শরীরে হামের অ্যান্টিবডি শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া ২১টি বা ৬.৮ শতাংশ শিশুর ফলাফল বর্ডার লাইন বা সীমান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সব মিলিয়ে ৮৫টি বা ২৭.৫ শতাংশ শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি একেবারেই তৈরি হয়নি। গবেষকদের মতে, সংক্রমণের বিস্তার রোধে যতটুকু রোগ প্রতিরোধক্ষমতা থাকা জরুরি, শিশুদের মধ্যে তার চেয়ে অনেক কম হার দেখা যাচ্ছে।

চলতি বছরের ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশজুড়ে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেছিল স্বাস্থ্য বিভাগ। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য ছিল এই ক্যাম্পেইনের। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা আগে দাবি করেছিলেন যে, ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার তিন-চার সপ্তাহের মধ্যে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে সেই সময় পেরিয়ে পাঁচ মাস পার হলেও এখনো হামের সংক্রমণ পুরোপুরি থামেনি। ৪৬ লাখ শিশুকে হিসাবের বাইরে রেখে হামের টিকা।

টিকা কার্যকর না হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। টিকাবিশেষজ্ঞ তাজুল এ বারির মতে, টিকা সংরক্ষণ ও পরিবহনের সময় নির্দিষ্ট তাপমাত্রা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া শিশুদের তীব্র অপুষ্টিও টিকার কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়া শিশুদের শরীরে টিকা বেশি কার্যকর হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। তিনি বলেন, ঠিক কোন পর্যায়ে ত্রুটির কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তা দ্রুত অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। টিকা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে হয় এবং পরিবহন করতে হয়। তাজুল এ বারি আরও বলেন, শিশু যদি অতিমাত্রায় অপুষ্টির শিকার হয়, তাহলে তার শরীরে টিকা কম কার্যকর হয়। এর অর্থ বিপুলসংখ্যক শিশু হামে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।

সরকারি সূত্রমতে, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) ব্যবহৃত টিকাগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত হলেও স্থানীয় পর্যায়ে এর মান যাচাইয়ের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে প্রতিবছর প্রায় ২০ শতাংশ শিশু বাদ পড়ে যাচ্ছে বলে ১৪ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে জানানো হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সে সময় শিশুদের বিশুদ্ধ টিকা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতা কামনা করেন। শিশুরা টিকা পেয়েছে কি না, গবেষকেরা তা নিশ্চিত হন টিকা কার্ড দেখে এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে। ৭০ জন দেশি–বিদেশ বিশেষজ্ঞকে নিয়ে গঠিত যৌথ স্বাধীন পর্যালোচনা দল ১৪ অক্টোবর রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ তুলে ধরে। এ ব্যাপারে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, গ্যাভিসহ সবার সহযোগিতা চান।

তবে এই গবেষণার ফলাফল নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

তিনি বলেন, এই গবেষণাটি বেশ ছোট এবং নমুনার সংখ্যা কম হওয়ায় একে চূড়ান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তিনি টিকার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন। এদিকে বিষয়টি আরও গভীরে পর্যবেক্ষণের জন্য বর্তমানে তিন হাজার শিশুর নমুনা নিয়ে একটি বড় গবেষণা চলছে, যার ফলাফল নভেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে পাওয়া যেতে পারে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের পরিচালক এস এম এ সাফি। এদের রক্তের নমুনা আইইডিসিআরের ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। ৩০টি উপজেলার প্রতিটি থেকে ১০০ করে শিশুর নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, এ বছর হামের উপসর্গ নিয়ে সারা দেশের হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে ২ লাখ ২২ হাজার ৫৫২ জন। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১০৪ জন এবং উপসর্গের কারণে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ১২৯ জনের। অর্থাৎ হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ২৩৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। মৃত শিশুদের মধ্যে ৯২ শতাংশই কোনো ধরনের হামের টিকা পায়নি। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ৩৮৮ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, বর্তমান তথ্য অনুযায়ী হামের টিকা ঠিকমতো কাজ করছে না। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, টিকার কভারেজ অবশ্যই ৯৫ শতাংশের ওপরে নিতে হবে। পাশাপাশি টিকার বয়সসীমা বাড়িয়ে ১৮ বছর পর্যন্ত করা এবং প্রতি চার বছর অন্তর জাতীয় পর্যায়ে ক্যাম্পেইন নিশ্চিত করা জরুরি। জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের টিকা ঠিকমতো কাজে আসছে না। বড় পরিকল্পনা হাতে না নিলে হামের জটিল পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশ বের হতে পারবে না।’।

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে যে, বয়স বাড়ার সঙ্গে টিকার কার্যকারিতার সম্পর্ক রয়েছে। ছয় মাস বয়সে টিকা দিলে ৫০ শতাংশ শিশুর দেহে, নয় মাসে দিলে ৮৫ শতাংশ শিশুর দেহে এবং ১২ মাসে দিলে ৯০ শতাংশ শিশুর দেহে প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠে। এখন টিকার কার্যকারিতা বাড়াতে এবং শিশুদের সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে নতুন করে কৌশল নির্ধারণের ওপর জোর দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।