ঢাকা ১০:৫৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

এলেনা সাদিকু: ফুটবলে সব হারিয়ে জিতে যাওয়া মেয়েটি

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১০:০৭:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

কেউ বলেন একবার। কেউ বলেন বারবার। আবার কারও জীবনে প্রথম প্রেমটাই এমন সর্বনাশা হয়ে ওঠে যে দ্বিতীয়বার প্রেমে পড়ার সাহস থাকে না। প্রথম প্রেম তাঁকে প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছিল। কেড়ে নিয়েছিল শরীরের ১০ কেজি ওজন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুনতে হয়েছিল, ফুটবলার হিসেবে তোমার সময় শেষ। অথচ সেই এলেনাই আবার প্রেমে পড়েছেন। সেই ফুটবলেরই। শুধু প্রেমের ধরনটা বদলে গেছে। আগে মাঠে নেমে বল পায়ে খেলতেন, এখন ডাগআউটে দাঁড়িয়ে তৈরি করছেন নতুন প্রজন্মের ফুটবলার। আর কী আশ্চর্য, প্রথম প্রেমে প্রত্যাখ্যাত মেয়েটি দ্বিতীয় প্রেমে এমন সফল যে ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কারের মঞ্চেও পৌঁছে গেছেন! বাড়ির বাগানে ভাইয়ের সঙ্গে খেলতে খেলতে কখন যে বলটার প্রেমে পড়ে গেলেন, নিজেও বুঝতে পারেননি, ‘ফুটবল হয়ে ওঠে আমার আবেগ, আমার ভালোবাসা, আমার নিরাপত্তার আশ্রয়, আমার সবকিছু।’। গোল করাই ছিল কাজ; কিন্তু কোচরা আবিষ্কার করলেন, মেয়েটি শুধু গোল করতে জানে না, খেলাটাও অন্যদের চেয়ে একটু আগে পড়ে ফেলতে পারে। ইএসপিএনকে নিজের চোটের বিবরণ দিতে গিয়ে এমনভাবে বলেছিলেন, যেন শরীরের ভেতর আস্ত একটা হাসপাতালের ইতিহাস নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনবার এসিএল চোটে পড়া ছাড়াও পা পুনর্গঠন করতে হয়। এবার অস্ত্রোপচারে তাঁর টিবিয়া বা জঙ্ঘাস্থির একটি অংশ কেটে ফেলতে হয়। প্রথমবার এসিএল পুনর্গঠনে ব্যবহার করা হয়েছিল নিজের হ্যামস্ট্রিংয়ের টিস্যু। দ্বিতীয়বার লাগল ক্যাডাভার গ্রাফট, অর্থাৎ মৃতদেহ থেকে সংগৃহীত টিস্যু।চিকিৎসকেরা এবার আর কোনো আশার কথা শোনালেন না। যে মেয়ের কাছে ফুটবলই জীবন, তাঁর কাছে কথাটা কতটা নিষ্ঠুর শোনাতে পারে, ভাবুন একবার।

ব্যালন ডি’অরের সংক্ষিপ্ত তালিকায়

৩২ বছর বয়সী এলেনা সাদিকু এখন ব্যালন ডি’অরের বর্ষসেরা নারী কোচের পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায়। নারী ও পুরুষ কোচ মিলিয়ে এই স্বীকৃতি পাওয়া সর্বকনিষ্ঠ কোচ তিনি। সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘আঠারো বছর বয়স মাথা নোয়াবার নয়।’ এলেনাকে দেখলে কবি হয়তো বত্রিশ বছর বয়স নিয়েও অমন একটা কবিতা লিখতেন!

শৈশবের অনিশ্চয়তা ও ফুটবলের টান

নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় যুদ্ধের আগুন জ্বলছে। সেই আগুন থেকে বাঁচতে কসোভো ছেড়ে জার্মানিতে আশ্রয় নেওয়া এলেনার পরিবার বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। শৈশবের সেই অনিশ্চিত দিনগুলোয় একটা ফুটবলই হয়ে উঠেছিল তাঁর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু। ১৩ বছর বয়সে এলেনা ঠিক করে ফেলেন পেশাদার ফুটবলার হবেন। ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই তিনি মাঠের বাইরে হাসিখুশি ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা তরুণী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু মাঠে নামলেই হয়ে উঠতেন পরিণত এক খেলোয়াড়। ২৩ বছর বয়সেই হ্যামারবির অধিনায়ক হয়ে ওঠা তারই প্রমাণ; কিন্তু ভাগ্য তাঁর জন্য অন্য চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল। ৯ বছর পর সেই কথাগুলো পড়লে মনে হয়, মানুষ কখনো কখনো নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই লিখে রাখে। অবশ্য এলেনার জীবনটা শুরু থেকেই খুব সহজ ছিল না। কসোভো-আলবেনিয়ান বংশোদ্ভূত পরিবারটি পরে নিজেদের দেশে ফিরেছিল; কিন্তু যুদ্ধ আবারও তাঁদের ঘরছাড়া করে। দ্য টাইমসকে এলেনা বলেন, ‘তারা বলেছিল, এলেনা, আমরা মনে করি, তোমার খেলা ছেড়ে দেওয়া উচিত, যাতে তুমি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারো।’।

চোটের অভিশাপ ও ১৩টি অস্ত্রোপচার

১৯ বছর বয়সে প্রথমবার বাঁ হাঁটুর এসিএলে চোট পান। চোট পাওয়ার পরও কীভাবে যে আরও ২০ মিনিট খেলেছি, ভাবতেই পারছি না। ফুটবলারদের কাছে যে চোটের নামই দুঃস্বপ্ন।

খেলোয়াড়জীবনে অস্ত্রোপচার হয়েছে মোট ১৩টি! পায়ের হাড় সঠিক অবস্থানে রাখতে বসানো হয় চারটি স্ক্রু।

২০১৪ সালে এসিএল, এমসিএল এবং ল্যাটারাল কোলাটারাল লিগামেন্টের চোট তাঁকে জর্জরিত করে।

চিকিৎসকরা তখন জানিয়েছিলেন, খেলা চালিয়ে যাওয়া তাঁর জন্য বিপজ্জনক।

কিন্তু ফুটবলপ্রেমী এলেনা বারবার ফিরে আসার চেষ্টা করেছেন। তবে এই সাফল্যের গল্প বুঝতে ফিরে যেতে হবে ২০১৭ সালের জুনে।

২০১৫ সালে মাঠে ফিরে হ্যাটট্রিক করলেও, পরবর্তী দুই বেলার অনুশীলনে আবারও লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। প্রতিপক্ষের পরের চালটা যেন আগেই বুঝে যায়। এসকিলস্টুনা ইউনাইটেডের কোচিং স্টাফ তখন ভাবতে শুরু করেছিলেন, মেয়েটিকে এবার পুরোদমে অনুশীলনে নামানো যাবে।

তৃতীয় অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে সেপসিসের ঝুঁকি তৈরি হয়।

সেই সময় হাসপাতাল থেকে এলেনার শরীরের ১০ কেজি ওজন ঝরে গিয়েছিল। তবে সেই কঠিন সময়েও তিনি ফুটবলকে ভুলে থাকতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘খেলোয়াড় হিসেবে আমার বাঁ হাঁটুতে ১৩টি অস্ত্রোপচার হয়েছে। যে মেয়েটি কিছুদিন আগেও মাঠে প্রজাপতির মতো ছুটে বেড়াত, সে তখন মৃত্যুর মুখোমুখি।’ তখন কি আর জানতাম, ওটাই আমার শেষ ম্যাচ হতে পারে। ফুটবলে মাঝমাঠের খেলোয়াড়দের অনেকটা দাবাড়ুর মতো হতে হয়। ১১ বছর পর প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে ফিরছেন রোনালদিনিও।

দ্বিতীয় প্রেমের শুরু: কোচ হিসেবে পুনর্জন্ম

সেপসিস থেকে বেঁচে ফেরার পর এলেনার মনে হয়েছিল, জীবনে যা ঘটে, তার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ থাকে। ক্যারিয়ারের সেই চরম মুহূর্তে তিনি কোচিংয়ের দিকে ঝুঁকলেন। চীনের বেইজিং বিজি ফোনিক্স এবং সুইডেনের ক্লাবগুলোতে কাজ করার পর এভারটনের অনূর্ধ্ব-২১ দলের কোচ ব্রায়ান সোরেনসন তাঁকে নতুন সুযোগ করে দেন। ২০২৪ সালে তিনি সেল্টিকের নারী দলের দায়িত্ব নেন। হ্যাকেনের ৫৬ বছরের ইতিহাসে প্রথম ইউরোপিয়ান শিরোপা জয় বা সেল্টিকের সাফল্য—সবই তাঁর কোচিং দর্শনের প্রমাণ। এলেনার শরীরে একটি ট্যাটু আছে যার মর্মার্থ হলো, জীবনে যা-ই ঘটুক, সবকিছুর মধ্যে ইতিবাচক কিছু খুঁজে নেওয়া। তিনি আজ সেই দর্শনেই ফুটবল বিশ্বে আলো ছড়াচ্ছেন। সুযোগ কাজে লাগিয়ে সিটির পাশে আর্সেনাল। আবারও ভিলা পার্কে হোঁচট, মৌসুমে প্রথম হার ম্যানচেস্টার সিটির।

  • ১৩ বছর বয়সেই পেশাদার ফুটবলার হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ।
  • খেলোয়াড় হিসেবে মোট ১৩টি অস্ত্রোপচারের ধকল সহ্য করা।
  • সেপসিসে আক্রান্ত হয়ে ১০ কেজি ওজন হারানো ও ক্যারিয়ারের সমাপ্তি।
  • ২০১৭ সালের জুনের সেই কঠিন সময় আজ সাফল্যের গল্পে রূপান্তরিত।
  • মাত্র ৩২ বছর বয়সে ব্যালন ডি’অর সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান।
  • সুইডেন থেকে শুরু করে সেল্টিক পর্যন্ত কোচিংয়ের এক দীর্ঘ যাত্রা।
  • যুদ্ধকবলিত জীবন থেকে বিশ্ব ফুটবলের মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে আসা।
  • প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে নতুন প্রজন্মের পথপ্রদর্শক হওয়া।
  • নারী ফুটবলের ইতিহাসে কোচ হিসেবে অনন্য নজির সৃষ্টি।
  • হ্যামারবি থেকে শুরু করে সেল্টিক পর্যন্ত ক্লাবগুলোর প্রতি দায়বদ্ধতা।
  • ব্যক্তিগত অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক হয়ে ওঠা।
  • ভবিষ্যৎ কোচদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

এলেনা সাদিকু: ফুটবলে সব হারিয়ে জিতে যাওয়া মেয়েটি

আপডেট সময় : ১০:০৭:৫০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

কেউ বলেন একবার। কেউ বলেন বারবার। আবার কারও জীবনে প্রথম প্রেমটাই এমন সর্বনাশা হয়ে ওঠে যে দ্বিতীয়বার প্রেমে পড়ার সাহস থাকে না। প্রথম প্রেম তাঁকে প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছিল। কেড়ে নিয়েছিল শরীরের ১০ কেজি ওজন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুনতে হয়েছিল, ফুটবলার হিসেবে তোমার সময় শেষ। অথচ সেই এলেনাই আবার প্রেমে পড়েছেন। সেই ফুটবলেরই। শুধু প্রেমের ধরনটা বদলে গেছে। আগে মাঠে নেমে বল পায়ে খেলতেন, এখন ডাগআউটে দাঁড়িয়ে তৈরি করছেন নতুন প্রজন্মের ফুটবলার। আর কী আশ্চর্য, প্রথম প্রেমে প্রত্যাখ্যাত মেয়েটি দ্বিতীয় প্রেমে এমন সফল যে ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কারের মঞ্চেও পৌঁছে গেছেন! বাড়ির বাগানে ভাইয়ের সঙ্গে খেলতে খেলতে কখন যে বলটার প্রেমে পড়ে গেলেন, নিজেও বুঝতে পারেননি, ‘ফুটবল হয়ে ওঠে আমার আবেগ, আমার ভালোবাসা, আমার নিরাপত্তার আশ্রয়, আমার সবকিছু।’। গোল করাই ছিল কাজ; কিন্তু কোচরা আবিষ্কার করলেন, মেয়েটি শুধু গোল করতে জানে না, খেলাটাও অন্যদের চেয়ে একটু আগে পড়ে ফেলতে পারে। ইএসপিএনকে নিজের চোটের বিবরণ দিতে গিয়ে এমনভাবে বলেছিলেন, যেন শরীরের ভেতর আস্ত একটা হাসপাতালের ইতিহাস নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তিনবার এসিএল চোটে পড়া ছাড়াও পা পুনর্গঠন করতে হয়। এবার অস্ত্রোপচারে তাঁর টিবিয়া বা জঙ্ঘাস্থির একটি অংশ কেটে ফেলতে হয়। প্রথমবার এসিএল পুনর্গঠনে ব্যবহার করা হয়েছিল নিজের হ্যামস্ট্রিংয়ের টিস্যু। দ্বিতীয়বার লাগল ক্যাডাভার গ্রাফট, অর্থাৎ মৃতদেহ থেকে সংগৃহীত টিস্যু।চিকিৎসকেরা এবার আর কোনো আশার কথা শোনালেন না। যে মেয়ের কাছে ফুটবলই জীবন, তাঁর কাছে কথাটা কতটা নিষ্ঠুর শোনাতে পারে, ভাবুন একবার।

ব্যালন ডি’অরের সংক্ষিপ্ত তালিকায়

৩২ বছর বয়সী এলেনা সাদিকু এখন ব্যালন ডি’অরের বর্ষসেরা নারী কোচের পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায়। নারী ও পুরুষ কোচ মিলিয়ে এই স্বীকৃতি পাওয়া সর্বকনিষ্ঠ কোচ তিনি। সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘আঠারো বছর বয়স মাথা নোয়াবার নয়।’ এলেনাকে দেখলে কবি হয়তো বত্রিশ বছর বয়স নিয়েও অমন একটা কবিতা লিখতেন!

শৈশবের অনিশ্চয়তা ও ফুটবলের টান

নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে সাবেক যুগোস্লাভিয়ায় যুদ্ধের আগুন জ্বলছে। সেই আগুন থেকে বাঁচতে কসোভো ছেড়ে জার্মানিতে আশ্রয় নেওয়া এলেনার পরিবার বারবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। শৈশবের সেই অনিশ্চিত দিনগুলোয় একটা ফুটবলই হয়ে উঠেছিল তাঁর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বন্ধু। ১৩ বছর বয়সে এলেনা ঠিক করে ফেলেন পেশাদার ফুটবলার হবেন। ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেই তিনি মাঠের বাইরে হাসিখুশি ও প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা তরুণী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, কিন্তু মাঠে নামলেই হয়ে উঠতেন পরিণত এক খেলোয়াড়। ২৩ বছর বয়সেই হ্যামারবির অধিনায়ক হয়ে ওঠা তারই প্রমাণ; কিন্তু ভাগ্য তাঁর জন্য অন্য চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল। ৯ বছর পর সেই কথাগুলো পড়লে মনে হয়, মানুষ কখনো কখনো নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই লিখে রাখে। অবশ্য এলেনার জীবনটা শুরু থেকেই খুব সহজ ছিল না। কসোভো-আলবেনিয়ান বংশোদ্ভূত পরিবারটি পরে নিজেদের দেশে ফিরেছিল; কিন্তু যুদ্ধ আবারও তাঁদের ঘরছাড়া করে। দ্য টাইমসকে এলেনা বলেন, ‘তারা বলেছিল, এলেনা, আমরা মনে করি, তোমার খেলা ছেড়ে দেওয়া উচিত, যাতে তুমি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারো।’।

চোটের অভিশাপ ও ১৩টি অস্ত্রোপচার

১৯ বছর বয়সে প্রথমবার বাঁ হাঁটুর এসিএলে চোট পান। চোট পাওয়ার পরও কীভাবে যে আরও ২০ মিনিট খেলেছি, ভাবতেই পারছি না। ফুটবলারদের কাছে যে চোটের নামই দুঃস্বপ্ন।

খেলোয়াড়জীবনে অস্ত্রোপচার হয়েছে মোট ১৩টি! পায়ের হাড় সঠিক অবস্থানে রাখতে বসানো হয় চারটি স্ক্রু।

২০১৪ সালে এসিএল, এমসিএল এবং ল্যাটারাল কোলাটারাল লিগামেন্টের চোট তাঁকে জর্জরিত করে।

চিকিৎসকরা তখন জানিয়েছিলেন, খেলা চালিয়ে যাওয়া তাঁর জন্য বিপজ্জনক।

কিন্তু ফুটবলপ্রেমী এলেনা বারবার ফিরে আসার চেষ্টা করেছেন। তবে এই সাফল্যের গল্প বুঝতে ফিরে যেতে হবে ২০১৭ সালের জুনে।

২০১৫ সালে মাঠে ফিরে হ্যাটট্রিক করলেও, পরবর্তী দুই বেলার অনুশীলনে আবারও লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। প্রতিপক্ষের পরের চালটা যেন আগেই বুঝে যায়। এসকিলস্টুনা ইউনাইটেডের কোচিং স্টাফ তখন ভাবতে শুরু করেছিলেন, মেয়েটিকে এবার পুরোদমে অনুশীলনে নামানো যাবে।

তৃতীয় অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে সেপসিসের ঝুঁকি তৈরি হয়।

সেই সময় হাসপাতাল থেকে এলেনার শরীরের ১০ কেজি ওজন ঝরে গিয়েছিল। তবে সেই কঠিন সময়েও তিনি ফুটবলকে ভুলে থাকতে পারেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘খেলোয়াড় হিসেবে আমার বাঁ হাঁটুতে ১৩টি অস্ত্রোপচার হয়েছে। যে মেয়েটি কিছুদিন আগেও মাঠে প্রজাপতির মতো ছুটে বেড়াত, সে তখন মৃত্যুর মুখোমুখি।’ তখন কি আর জানতাম, ওটাই আমার শেষ ম্যাচ হতে পারে। ফুটবলে মাঝমাঠের খেলোয়াড়দের অনেকটা দাবাড়ুর মতো হতে হয়। ১১ বছর পর প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে ফিরছেন রোনালদিনিও।

দ্বিতীয় প্রেমের শুরু: কোচ হিসেবে পুনর্জন্ম

সেপসিস থেকে বেঁচে ফেরার পর এলেনার মনে হয়েছিল, জীবনে যা ঘটে, তার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ থাকে। ক্যারিয়ারের সেই চরম মুহূর্তে তিনি কোচিংয়ের দিকে ঝুঁকলেন। চীনের বেইজিং বিজি ফোনিক্স এবং সুইডেনের ক্লাবগুলোতে কাজ করার পর এভারটনের অনূর্ধ্ব-২১ দলের কোচ ব্রায়ান সোরেনসন তাঁকে নতুন সুযোগ করে দেন। ২০২৪ সালে তিনি সেল্টিকের নারী দলের দায়িত্ব নেন। হ্যাকেনের ৫৬ বছরের ইতিহাসে প্রথম ইউরোপিয়ান শিরোপা জয় বা সেল্টিকের সাফল্য—সবই তাঁর কোচিং দর্শনের প্রমাণ। এলেনার শরীরে একটি ট্যাটু আছে যার মর্মার্থ হলো, জীবনে যা-ই ঘটুক, সবকিছুর মধ্যে ইতিবাচক কিছু খুঁজে নেওয়া। তিনি আজ সেই দর্শনেই ফুটবল বিশ্বে আলো ছড়াচ্ছেন। সুযোগ কাজে লাগিয়ে সিটির পাশে আর্সেনাল। আবারও ভিলা পার্কে হোঁচট, মৌসুমে প্রথম হার ম্যানচেস্টার সিটির।

  • ১৩ বছর বয়সেই পেশাদার ফুটবলার হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ।
  • খেলোয়াড় হিসেবে মোট ১৩টি অস্ত্রোপচারের ধকল সহ্য করা।
  • সেপসিসে আক্রান্ত হয়ে ১০ কেজি ওজন হারানো ও ক্যারিয়ারের সমাপ্তি।
  • ২০১৭ সালের জুনের সেই কঠিন সময় আজ সাফল্যের গল্পে রূপান্তরিত।
  • মাত্র ৩২ বছর বয়সে ব্যালন ডি’অর সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান।
  • সুইডেন থেকে শুরু করে সেল্টিক পর্যন্ত কোচিংয়ের এক দীর্ঘ যাত্রা।
  • যুদ্ধকবলিত জীবন থেকে বিশ্ব ফুটবলের মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে আসা।
  • প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে নতুন প্রজন্মের পথপ্রদর্শক হওয়া।
  • নারী ফুটবলের ইতিহাসে কোচ হিসেবে অনন্য নজির সৃষ্টি।
  • হ্যামারবি থেকে শুরু করে সেল্টিক পর্যন্ত ক্লাবগুলোর প্রতি দায়বদ্ধতা।
  • ব্যক্তিগত অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক হয়ে ওঠা।
  • ভবিষ্যৎ কোচদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস।