ব্যালন ডি’অর জিতে পুনর্জাগরণের গল্প লিখলেন আলেক্সিয়া পুতেয়াস
- আপডেট সময় : ১১:৩৭:১৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
ফুটবল বিশ্বে ‘লা রেইনা’ বা ‘রানি’ হিসেবে পরিচিত স্প্যানিশ মিডফিল্ডার আলেক্সিয়া পুতেয়াস আবারও প্রমাণ করলেন, ইচ্ছাশক্তি অজেয়। ৩২ বছর বয়সী এই তারকা তৃতীয়বারের মতো মেয়েদের ব্যালন ডি’অর জয়ের গৌরব অর্জন করেছেন। ২০২২ সালে হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্টের (এসিএল) গুরুতর চোট তাঁর ক্যারিয়ারকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যে ঠেলে দিয়েছিল। কিন্তু সেই অন্ধকার সময় পেরিয়ে তিনি যেভাবে ফিরে এসেছেন, তা বিশ্ব ফুটবলের জন্য এক অনুপ্রেরণার গল্প। বাড়িতে টেলিভিশনে ফুটবল চলত প্রায় সারাক্ষণ। রিভালদো আর রোনালদিনহোর ফুটবলও তাকে টানত চুম্বকের মতো। অথচ চার বছর পর সেই পুতেয়াস আবার বিশ্বসেরা। এ যেন হারিয়ে যাওয়া এক শিল্পীর আবার নিজের রংতুলি ফিরে পাওয়ার কাহিনি। সে বছর দ্বিতীয় ব্যালন ডি’অর জিতলেও মাঠে আগের সেই পুতেয়াসকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। হয়তো নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন, আগের সেই ফুটবল কি আর কখনো খেলতে পারবেন। রানির মতোই পালন করেছেন সেই দায়িত্ব। ব্যালন ডি’অর জয়ের পর কি তাহলে ‘স্যার’ হ্যারি কেইন।
এ নিয়ে ব্যালন ডি’অরে স্বদেশি আইতানা বোনমাতির টানা তিনবার পুরস্কার জয়ের রেকর্ডের পাশে নাম লেখালেন পুতেয়াস। ২০২১ ও ২০২২ সালে টানা দুবার এই ট্রফি জিতেছিলেন তিনি। এরপর ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টানা তিনবার সেরা হন বোনমাতি। মেয়েদের ফুটবলে পুরস্কারটি টানা ছয় বছর ধরে স্পেনের দখলে রয়েছে। ২০১৮ সালে আডা হেগেরবার্গ এবং ২০১৯ সালে মেগান র্যাপিনো ছাড়া আর কোনো দেশের ফুটবলার গত কয়েক বছরে এই খেতাব জেতেননি। এরপর ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বিশ্বসেরার মুকুট ওঠে বোনমাতির মাথায়। ২০২১-২২ মৌসুমে ক্যারোলিন গ্রাহাম হ্যানসেনের ৩৮টির পর এক আসরে এটাই সর্বোচ্চ। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ৫০ দেশের সাংবাদিকদের ভোটে তাই তিনিই সেরা।
চোটের সেই দুঃসময়ে পুতেয়াসের জন্য মাঠের লড়াই ছিল বড় পরীক্ষা। পুতেয়াসের জীবনেও এসেছিল তেমন এক সময়।
ইউরোর ঠিক আগে পাওয়া চোটের কারণে তিনি মাঠের বাইরে ছিলেন দীর্ঘদিন। এমনকি ২০২৩ সালের বিশ্বকাপ জয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্তটিতেও তাঁর ভূমিকা ছিল সীমিত। তবে ২০২৪ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল এবং ২০২৫-২৬ মৌসুমে নিজের পুরোনো ছন্দে ফিরে আসেন তিনি। বার্সেলোনার হয়ে চারটি ট্রফি জয় এবং অধিনায়ক হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা জেতানোয় তাঁর ভূমিকা ছিল অনবদ্য। বোনমাতির অনুপস্থিতিতে দলের আক্রমণভাগ সামলানো থেকে শুরু করে গোল করা ও করানোয় তিনি ছিলেন অনন্য। যে ফুটবলার একসময় ছিলেন দলের প্রাণ, তাঁকেই কি না বিশ্বজয়ের উৎসবে থাকতে হলো অনেকটা পার্শ্বচরিত্র হয়ে। ২০২৩ সালে স্পেন বিশ্বকাপ জিতল।
পরিসংখ্যান বলছে, শুধু গত মৌসুমে সব প্রতিযোগিতায় ২১ গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে ১৩টি গোল করিয়েছেন তিনি। পুতেয়াসের ফুটবলকে শুধু গোল দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। এই প্রতিযোগিতায় তাঁর চেয়ে বেশি গোল করেছেন শুধু এভা পায়োর (১১), আলেসিয়া রুসো (৯) ও পারনিলে হার্ডার (৮)। তাঁর ওপরে শুধু ক্লদিয়া পিনা (১৯৯), ভিকি লোপেজ (১৮৩) ও জর্জিয়া স্ট্যানওয়ে (১৬৮)।
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের খেলোয়াড়দের মধ্যে গোলসংখ্যার দিক থেকে তৃতীয় এবং অ্যাসিস্টে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন তিনি। তৃতীয় ম্যানচেস্টার সিটির ফরোয়ার্ড খাদিজা শ।
চ্যাম্পিয়নস লিগে তাঁর নামের পাশে যুক্ত হয়েছে ৭ গোল।
লিগে ৪০টি ওপেন প্লে সুযোগ তৈরির পাশাপাশি আক্রমণের ধারায় ১৫১ বার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল তাঁর। সুযোগ পেলেই ছুটে যেত ক্যাম্প ন্যুতে।
সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৮৯টি গোলের সুযোগ তৈরি এবং বড় ১৯টি সুযোগ সৃষ্টি করে তিনি আবারও নিজেকে ইউরোপের সেরাদের সারিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
বার্সেলোনার উত্তর প্রান্তের মোলেত দেল ভালেসে বেড়ে ওঠা পুতেয়াসের ফুটবল যাত্রা সহজ ছিল না। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার শৈলী দেখে মুগ্ধ হয়ে বড় হওয়া এই ফুটবলার লা মাসিয়া পেরিয়ে এসপানিওল ও লেভান্তে ঘুরে ২০১২ সালে শৈশবের ক্লাব বার্সেলোনায় ফিরে আসেন। দীর্ঘ ১৪ বছরের পথচলায় বার্সেলোনার হয়ে ৩৮টি শিরোপা জিতেছেন তিনি, যার মধ্যে ১০টি লিগ ও চারটি ইউরোপিয়ান কাপ অন্তর্ভুক্ত। পুতেয়াসের জন্ম বার্সেলোনা থেকে প্রায় ১২ মাইল উত্তর-পূর্বে মোলেত দেল ভালেসে।
২০২৫-২৬ মৌসুম শেষে বার্সেলোনার সাথে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় তিনি নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। যদিও এর আগে স্পেনকে ২০২৭ বিশ্বকাপে জায়গা করে দিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করেছিলেন, সেই ইংল্যান্ডেই তিনি পাড়ি জমান। মার্কিন ধনকুবের মিশেল কাংয়ের মালিকানাধীন লন্ডন সিটি লায়নেসেসে জুলাই মাসে যোগ দেন পুতেয়াস। নতুন ক্লাবে প্রথম সাত লিগ ম্যাচে ৩ গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে তিনি প্রমাণ করেছেন, ৩২ বছর বয়সেও তাঁর পায়ের জাদু শেষ হয়ে যায়নি। কখনো মাঝমাঠ থেকে এমন পাস দেন, যাতে প্রতিপক্ষের পুরো রক্ষণই এলোমেলো হয়ে যায়। আক্রমণভাগের শেষ এক-তৃতীয়াংশে সফল পাস দিয়েছেন ৯৬৫টি।
পুরস্কার জয়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে পুতেয়াস যে বার্তা দিয়েছেন, তা মাঠের ট্রফির চেয়েও বেশি অর্থবহ। তিনি বিশ্বের সব ছেলে ও মেয়েদের উদ্দেশে বলেছেন, স্বপ্ন দেখলে তা পূরণের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে। নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে এগিয়ে যেতে হবে, কেউ কিছু করতে পারবে না বললেও তা কানে না তোলার আহ্বান জানান তিনি। মোলেত দেল ভালেসের সেই ছোট্ট মেয়েটি, যে একসময় গ্যালারিতে বসে ফুটবল দেখত, আজ নিজেই হয়ে উঠেছেন লাখো কিশোর-কিশোরীর আদর্শ ও স্বপ্ন দেখার উৎস। সেখানকার রাস্তায় ফুটবল খেলত এক ছোট্ট মেয়ে। একসময় জাভির পরিচালিত গ্রীষ্মকালীন ফুটবল ক্যাম্পে অংশ নেন।

























