কক্সবাজারে ৩৮০ প্রতিমা বিসর্জন: সৈকতে লাখো মানুষের জনস্রোত
- আপডেট সময় : ০৭:০৭:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ২৭ বার পড়া হয়েছে
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে বুধবার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অংশগ্রহণে সম্পন্ন হলো দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জন। দুপুর থেকেই শহর ও আশপাশের এলাকা থেকে ট্রাকে, ভ্যানে করে কিংবা কাঁধে বহন করে প্রতিমাগুলো সৈকতের বালুচরে নিয়ে আসতে শুরু করেন ভক্তরা। বিকেল চারটা নাগাদ পুরো বালুচর শত শত প্রতিমায় ভরে ওঠে, যেখানে একদিকে চলে শেষ মুহূর্তের পূজা-অর্চনা ও সিঁদুর খেলা, অন্যদিকে মঞ্চে ছিল অতিথিদের আলোচনা। বেলা দুইটা থেকে সেখানে আসতে শুরু করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। দেবীর কপালে ও পায়ে সিঁদুর ছুঁইয়ে প্রণাম করেন। তবে মা চলে যাওয়ায় মন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছে।
বিকেল ৫টা ৯ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় বঙ্গোপসাগরে বিসর্জন কার্যক্রম। মাত্র ৪৫ মিনিটের ব্যবধানে ৩৮০টি প্রতিমা সাগরে বিসর্জন দেওয়া হয়। এর আগে বিকেল ৫টার দিকে শহরের প্রাচীন সরস্বতীবাড়ি মন্দিরের পুরোহিত রানা ভট্টাচার্য মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে বিদায়বেলার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। ছয় দিনের পূজার আনন্দ শেষে দেবীকে বিদায় জানানোর ক্ষণে ভক্তদের মধ্যে বিষাদের ছায়া নেমে আসে। আয়োজকদের দাবি অনুযায়ী, এই উৎসবে সৈকতের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে প্রায় তিন লক্ষাধিক দর্শনার্থী সমবেত হয়েছিলেন। দেবী দুর্গার বিদায়বেলায় এই আয়োজন দেখতে লাবণী, সিগাল, সুগন্ধা ও কলাতলী—সৈকতের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক মানুষ। আয়োজকদের হিসাবে, দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল তিন লাখের বেশি। এর আগে মণ্ডপগুলোতে পুরোহিতদের মন্ত্রপাঠ, পূজার ঘণ্টা, ঢাকের বাদ্য, ধূপ ও ফুলের অঞ্জলিতে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান ভক্তরা। বিকেল পাঁচটায় মন্ত্রপাঠের পর বিসর্জন শুরু হলে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শহরের বৈদ্যঘোনার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ পাল বলেন, দেবীর বিদায়ে মন খারাপ হলেও উৎসবের আনন্দ সবাই ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।
কক্সবাজার জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি উদয় শংকর পাল জানান, প্রতিবারের মতো এবারও অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে বিসর্জন উৎসব সম্পন্ন হয়েছে। এটি পর্যটন শহর কক্সবাজারের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত। কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই দেশের অন্যতম বৃহত্তম এই বিসর্জন উৎসব সম্পন্ন হওয়ায় তিনি জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
চলতি বছর কক্সবাজার জেলায় মোট ৩২৪টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৫টি মণ্ডপে ছিল প্রতিমা পূজা এবং ১৬৯টিতে ঘট পূজা। উপজেলাওয়ারি হিসেবে চকরিয়ায় সর্বোচ্চ ৭১টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া কুতুবদিয়ায় ৪৪টি, রামুতে ৩৭টি, কক্সবাজার সদরে ৩১টি, ঈদগাঁওয়ে ২৯টি, মহেশখালীতে ২৮টি, কক্সবাজার পৌরসভায় ২৬টি, চকরিয়া পৌরসভায় ২৫টি, পেকুয়ায় ৯টি, উখিয়ায় ৯টি, মহেশখালী পৌরসভায় ৬টি এবং টেকনাফে ৬টি মণ্ডপে পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে। বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে কক্সবাজার শহর, সদর উপজেলা, উখিয়া, টেকনাফ, রামু ও ঈদগাঁওয়ের বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে প্রতিমা বিসর্জনের জন্য সৈকতে আনা হয়।
নিরাপত্তা নিশ্চিতে দুপুর থেকেই পুরো সৈকত এলাকায় সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে চার স্তরের কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, সরকার কক্সবাজার সৈকতকে পরিবেশবান্ধব ও আরও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের এই বৃহৎ মিলনমেলাকে বাঙালি চেতনা ও সম্প্রীতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অভিহিত করেন। ঘোনাপাড়ার কলেজছাত্রী আলপনা দাশ বলেন, লাখো মানুষের উপস্থিতিতে মাকে বিদায় জানাতে পেরে তিনি শান্তি পেয়েছেন। তাঁরা জগতের সব মানুষের মঙ্গল কামনা করেন। পরিবেশ রক্ষা করে কক্সবাজারকে আরও আকর্ষণীয় করার পাশাপাশি ঢেলে সাজানোর কাজ চলছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, লুৎফর রহমান কাজল, শামীম আরা স্বপ্না, জেলা প্রশাসক মো. আ.
মান্নান, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন, পুলিশ সুপার এ এম সাজেদুর রহমান, রামকৃষ্ণ মিশন কক্সবাজারের সভাপতি সোমেশ্বর চক্রবর্তী, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি দোলন ধর এবং দীপক শর্মা। যেকোনো মূল্যে এই সম্প্রীতি ধরে রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি উদয় শংকর পাল এবং অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক স্বপন দাশ। বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, এই বিশাল জনসমাগম বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।


























