দেশে একের পর এক হত্যাকাণ্ডে বাড়ছে জনমনে আতঙ্ক
- আপডেট সময় : ০৭:০০:৩৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬ ৩২ বার পড়া হয়েছে
দেশের বিভিন্ন জেলায় গত ১০ দিনে অন্তত সাতটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। কখনও দিনদুপুরে জনসম্মুখে, আবার কখনও গভীর রাতে টার্গেট করে গুলি ও কুপিয়ে এসব হামলা চালানো হচ্ছে। সাংবাদিক থেকে রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এই সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, যা জনমনে তীব্র আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। সাংবাদিক থেকে রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ মানুষ কেউ রেহাই পাচ্ছেন না। এরপর তারা এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। আত্মরক্ষার চেষ্টা করেও তারা হামলাকারীদের হাত থেকে রেহাই পাননি। গুলি ছোড়ার পর তারা খালের পানিতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ভোরে খুলনা নগরীর পূর্ব-বানিয়াখামার এলাকায় তাওহিদুল ইসলাম (৩২) নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে আনসার আলী গলির সামনে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এদিকে বুধবার রাতে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি জহির ফকিরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ফার্মেসি বন্ধ করে বাসায় ফেরার পথে ১৫-২০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল তার গতিরোধ করে হামলা চালায়। নিহতের ভাগিনা ইসমাইল হোসেনের অভিযোগ, স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে দ্বন্দ্ব এবং আসন্ন ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে আলোচনার কারণেই পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। একই দিন ভোরে মাগুরা বাস টার্মিনালের রয়েল এক্সপ্রেস কাউন্টার থেকে পৌর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সাকের হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন সাংবাদিকও। গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলায় রূপসী বাংলার প্রতিনিধি লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার সময় তিনি শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের তেলনজিয়া বাজারে অবস্থান করছিলেন। পাশাপাশি ১৬ অক্টোবর রাতে রাজবাড়ীতে পিয়ারুল ইসলাম (৩০) নামের এক ব্যক্তি দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন। পুলিশ জানায়, পিয়ারুলের বিরুদ্ধে হত্যা ও ডাকাতিসহ ১৫টি মামলা ছিল। এশার নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হওয়ার পরপরই হেলমেট পরিহিত হামলাকারীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন তিনি। এ সময় দুই যুবক এসে তাকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়ে। ১৬ই অক্টোবর রাত পৌনে ৮টার দিকে রাজবাড়ীতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে ১৪ মামলার আসামি পিয়ারুল ইসলাম (৩০) নামে ব্যক্তি নিহত হন। গুলির শব্দে স্থানীয় লোকজন ছুটে এলে হামলাকারীরা কিছুটা দূরে রাখা মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়। হামলার শেষ পর্যায়ে তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পিয়ারুল বাড়ি থেকে বের হয়ে সজ্জনকান্দা পূর্বপাড়া জামে মসজিদে এশার নামাজ পড়তে যান। তাদের মাথায় হেলমেট ও মুখে মাস্ক ছিল।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডেও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত ১৬ অক্টোবর তারেক হোসেন বাপ্পি (২৬) নামের এক যুবদল কর্মীকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এতে আহত হয়েছেন তাফসির আলম শাওন নামের আরেক কর্মী। এর আগে ১২ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন শীর্ষ সন্ত্রাসী সাহেব আলী (৪৫)। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, মারামারির একপর্যায়ে তাকে গুলি করা হয় এবং পরে খালে পড়ে গেলেও তাকে লক্ষ্য করে পুনরায় গুলি ছোড়া হয়। তার বিরুদ্ধে অন্তত ২০টি মামলা ছিল। পরবর্তীতে স্থানীয়রা আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তাফসির আলম শাওন (২২) নামের আরেক যুবদলকর্মী গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, কয়েকজন দুর্বৃত্ত যুবদল নেতা সাদ্দামের কার্যালয়ের সামনে তারেক ও শাওনের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, সাম্প্রতিক এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকেই নির্দেশ করে। তিনি বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেয়ে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করছে। অপরাধীরা যখন শাস্তির ভয় পায় না বা রাজনৈতিক সুরক্ষা পাওয়ার আশা করে, তখনই এমন অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পায়। তাই সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। দিনের আলো ফোটার আগেই এমন হত্যাকাণ্ড নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ নির্দেশকের পরিবর্তে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রাধান্য দেয়ার প্রবণতা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করছে। হত্যাকাণ্ড, টার্গেট কিলিং, আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক সংঘাতের মতো ঘটনাকে অস্বীকার করা বা রাজনৈতিক দোষারোপে সীমাবদ্ধ রাখার ফলে প্রকৃত অপরাধী ও ভুক্তভোগীরা আড়ালে থেকে যায়। অপরাধীরা যখন মনে করে যে তারা শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারবে কিংবা রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পাবে, তখন অপরাধপ্রবণতা বাড়ে। উৎসবকেন্দ্রিক ব্যস্ততার সুযোগও অপরাধীরা কাজে লাগায়।
অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি ভাষ্য ভিন্ন। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স) কামারুম মুনিরা জানান, বিগত বছরের তুলনায় বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। তারপরও প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের উৎস খুঁজে বের করতে ও অপরাধীদের হাতে পৌঁছানো রোধে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। প্রশ্ন উঠেছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার এবং অপরাধী দমনে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে।

























