নদীপথে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে চ্যালেঞ্জ
- আপডেট সময় : ০৭:৩০:৫৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে
দেশের বিশাল নৌপথ জুড়ে বাড়ছে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। জেলে ও নৌশ্রমিকরা জলদস্যুদের কবলে পড়ে প্রায়ই প্রাণ হারাচ্ছেন কিংবা হামলার শিকার হচ্ছেন। পণ্যবাহী নৌযান থেকে লুট করা হচ্ছে বিভিন্ন মালামাল। এছাড়া নদীপথে অপহরণ, ছিনতাই, মাদক পাচার ও অবৈধ বালু উত্তোলনের মতো অপরাধ ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় নৌশ্রমিকদের পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করা হচ্ছে। নৌ পুলিশের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সন্ধ্যা নামলেই নদীপথে আতঙ্ক বাড়ে। যাত্রীবাহী ট্রলার, জেলেনৌকা, পণ্যবাহী কার্গো, বাল্কহেডসহ বিভিন্ন নৌযানে হামলা ও অপরাধের ঘটনা ঘটছে। মৎস্যজীবীদের জানমালের নিরাপত্তায় তখনো কোস্টগার্ড ও পুলিশের টহল জোরদার রাখা দরকার। স্রোতে ভাসে অপরাধের চিহ্ন, পচন ধরে মরদেহে। চাঁদা না দিলে হামলা, আক্রান্ত পুলিশও। পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করলে সাক্ষ্য না থাকায় আদালতে অপরাধ প্রমাণ করা যায় না। ছিনতাই ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
নদীপথের অপরাধচিত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা
নৌ পুলিশের তথ্যমতে, গত বছরের ১ ফেব্রুয়ারি রাতে ভোলা সদর উপজেলার মেঘনা নদীতে মাছ ধরার সময় জলদস্যুরা জেলেদের একটি ট্রলারে ডাকাতির চেষ্টা চালায়। দস্যুদের গুলি ও হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী জেলেদের পরিচয় নিচে দেওয়া হলো
- মো. হোসেন (৩০) নামের এক জেলে নিহত হন। গুলিতে আহত হন আব্বাস (৩২), কাঞ্চন (৩৪) ও সোহেল (২৯) নামের আরও তিন জেলে।
- তাঁদের সবার বাড়ি ভোলা সদর উপজেলার বাঘার হাওলা গ্রামে।
- জলদস্যুরা ডাকাতির সময় গুলি চালালে স্থানীয় জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম মল্লিক জানান, চাঁদপুর, শরীয়তপুরসহ পাঁচ জেলার সীমানাসংলগ্ন নদীপথগুলোতে সন্ধ্যার পর জলদস্যুদের তৎপরতা বাড়ে। তবে ইলিশ রক্ষা অভিযানের সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কিছুটা জোরদার থাকলেও অভিযান শেষে ফের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। এতে জেলে, নৌযানের চালক ও যাত্রীরা সন্ধ্যার পর আতঙ্কে থাকেন।
নরসিংদীর মেঘনা নদীতে গত বছরের ১০ অক্টোবর বাল্কহেড থেকে প্রায় ৩১৭ মেট্রিক টন সার ডাকাতির ঘটনা ঘটে। এছাড়া ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর চাঁদপুরের হাইমচরে এমভি আল-বাখেরা নামক জাহাজ থেকে সাত কর্মচারীকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা নদীপথের নিরাপত্তার ভয়াবহতাকে সামনে নিয়ে আসে। সাধারণত সন্ধ্যার পর চাঁদপুরের হাইমচর, শরীয়তপুরের লক্ষ্মীচর ও কাঁচিকাটা, মুন্সিগঞ্জের পদ্মা-মেঘনার মোহনা ও সংলগ্ন চরাঞ্চল, লক্ষ্মীপুরের রায়পুরসংলগ্ন মেঘনা এবং বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জসংলগ্ন মেঘনার চরাঞ্চলে এসব হামলা হয়। গত বছরের ১০ অক্টোবর নরসিংদীসংলগ্ন মেঘনা নদীতে একটি বাল্কহেড থেকে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার বস্তা বা ৩১৭ মেট্রিক টন সার ডাকাতি করে দুর্বৃত্তরা। বাংলাদেশ বাল্কহেড মালিক সমিতির সহসভাপতি আহমাদুল কবির মোল্লা বলেন, মানিকগঞ্জের হরিরামপুর সংলগ্ন নদীতে পণ্য বোঝাইয়ের সময় প্রতিটি নৌযান থেকে ২ হাজার টাকা, ভোলার ইলিশায় ৫০০ টাকা এবং সাভারের রুস্তমপুর ও আমিনবাজারে আড়াই হাজার টাকা করে টোলের নামে চাঁদা নেওয়া হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা
চাঁদাবাজি ও অবৈধ বালু উত্তোলন ঠেকাতে গিয়ে নৌ পুলিশ সদস্যরা নিয়মিত হামলার সম্মুখীন হচ্ছেন। গত বছরের ৭ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের মেঘনা নদীতে এমভি জয়নব বৃষ্টি পরিবহনের শ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনায় চালিভাঙ্গা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা অভিযানে যান। সেখানে চাঁদাবাজরা টেঁটা ও বল্লম দিয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালালে এএসআই মাকসুদসহ তিন কনস্টেবল জখম হন। পরে ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে নৌ পুলিশ। এই চাঁদাবাজি বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চান তিনি। গত বছরের ৭ অক্টোবর সকালে নারায়ণগঞ্জে মেঘনা নদীতে টেঁটা, বল্লম, রামদাসহ দেশি অস্ত্র নিয়ে নৌযান থামিয়ে চাঁদা দাবি করে একটি সংঘবদ্ধ দল। একপর্যায়ে আত্মরক্ষার্থে রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে রানা ও সাজ্জাদ নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বলেন, নদীতে চাঁদাবাজির অভিযোগ করলেও কেউ চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে মামলা করেন না।
এছাড়াও চলতি বছরের ২১ এপ্রিল পাবনার ঈশ্বরদীর লক্ষ্মীকুণ্ডা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পাঁচ সদস্য কুষ্টিয়ায় পদ্মা নদীতে অভিযানে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। পিরোজপুরের কাউখালীতে ১৯ আগস্ট টহল শেষে ফেরার পথে পাঁচ পুলিশ সদস্য দুর্বৃত্তদের হামলায় আহত হন।
পরিসংখ্যান ও নজরদারির ঘাটতি
নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১১টি অঞ্চলে বিভক্ত দেশের নৌপথে হত্যা, ডাকাতি, অপহরণ ও দস্যুতাসহ বিভিন্ন অপরাধে ২০২৪ সালে ২ হাজার ৮৫টি এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৩৯৯টি মামলা দায়ের হয়েছে।
এক বছরের ব্যবধানে মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৩১৪টি। এছাড়া চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে আরও ৫০৫টি মামলা হয়েছে। এসব মিলিয়ে গত প্রায় তিন বছরে মোট ৫ হাজার ৯৮৯টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। আগের দুই বছরের উল্লিখিত সব শ্রেণির মামলা এবং চলতি বছরের ৯ মাসের এই ৫ শ্রেণির মামলা মিলিয়ে সংখ্যা দাঁড়ায় ৫ হাজার ৯৮৯। খুলনার নদ–নদী থেকে এক বছরে ৫০ লাশ উদ্ধার।
নৌ পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, দেশের নদীসংলগ্ন এলাকায় ১২৪টি ফাঁড়ি দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ চলছে।
তবে মামলার চেয়েও অনেক অপরাধ নথিভুক্ত হয় না বলে মনে করছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক।
তিনি বলছেন, শুধু নদীতে টহল নয়, নজরদারি ও অপরাধী শনাক্তকরণের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা জরুরি। তাঁদের মতে, স্থলপথের তুলনায় দীর্ঘ নৌপথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি কম থাকায় অপরাধীরা এই পথ বেছে নিচ্ছে। জেলেরা প্রতিহত করতে চাইলে তাঁদের ওপর গুলি চালানো হয়।
বর্তমানে জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে অপরাধীদের ডেটাবেজ তৈরির কাজ চলছে বলেও নৌ পুলিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে বিশাল এই জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে।

























