ঢাকা ১১:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

নিষিদ্ধ হয়েছিল নাটকটি, স্তালিন দেখেছিলেন ১৪ বার

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:৩১:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ২৪ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

১০০ বছর আগে কথা। বিপ্লব হয়ে গেছে, জারের পতন ঘটেছে। কিন্তু গৃহযুদ্ধ থামেনি। একের পর এক বদলাচ্ছে কিয়েভের নিয়ন্ত্রণ। সেই অস্থির সময়ে একটি পরিবার নিজেদের ঘরের ভেতর আঁকড়ে ধরে আছে আগের জীবন, মূল্যবোধ আর স্মৃতি। বাইরে গোলাগুলি, মৃত্যু আর অনিশ্চয়তা। আজ যারা ক্ষমতাসীন, কাল তারাই পালিয়ে বেড়াচ্ছে। দরজা ভেঙে যেন ঘরে ঢুকে পড়ছে ইতিহাস। রুশ ইতিহাসের সেই টালমাটাল সময়ে মিখাইল বুলগাকভের লেখা ‘দ্য হোয়াইট গার্ড’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি নাটক ‘দ্য ডেজ অব দ্য টারবিনস’ আজ বিশ্বসাহিত্যের ও মঞ্চের এক অবিস্মরণীয় দলিল। নাটকটির প্রথম মঞ্চায়নের শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে ৫ অক্টোবর। বাইরে যে পক্ষই ক্ষমতায় আসুক, ঘরের ভেতর মানুষ স্বাভাবিক জীবনের কিছুটা ধরে রাখতে চায়। ওই বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রথম সংস্করণটি লেখেন।

উপন্যাস থেকে মঞ্চে উত্তরণ

১৯১৮ সালের কিয়েভকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই নাটকের পটভূমিতে দেখা যায় জারের পতনের পর বলশেভিকদের ক্ষমতা দখল এবং সাবেক রুশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। বুলগাকভ জাদুঘরের তথ্য অনুযায়ী, উপন্যাসটি অবলম্বনে ১৯২৫ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে তিনি নাটকটি তৈরি করেন। মস্কো আর্ট থিয়েটারের ওয়েবসাইটে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক পর্যালোচনা থেকে জানা যায়, ১৯২৫ সালে মস্কো আর্ট থিয়েটার ও ভাখতাঙ্গভ থিয়েটার—দুই প্রতিষ্ঠানই উপন্যাসটির নাট্যরূপ নিয়ে দারুণ আগ্রহ দেখিয়েছিল। তবে উপন্যাসের বিস্তৃত ঘটনাপ্রবাহকে মঞ্চের সীমিত পরিসরে আনার জন্য গল্প পুনর্গঠন ও চরিত্রের বিন্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়েছিল, যা ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এক ভারসাম্য রক্ষার লড়াই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নাটকের বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে নাটকটির কথা উঠে আসছে। এই নাটকের ইতিহাসে পাশাপাশি রয়েছে দুটি বিপরীত ছবি। জারের পতন পুরোনো শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটালেও নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কার অবস্থান কোথায় হবে, তা তখনো অনিশ্চিত। বিশেষ করে কিয়েভে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে বদলে যাচ্ছিল মানুষের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের হিসাব। কিয়েভে বসবাসকারী টারবিন পরিবারকে ঘিরে এগিয়েছে উপন্যাসের গল্প। যুদ্ধ ও রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যে একটি শিক্ষিত পরিবারের পরিচিত পৃথিবী কীভাবে ভেঙে পড়ছে, বুলগাকভ তুলে ধরেছেন সেই অভিজ্ঞতা। পরিবারের সদস্য ও তাদের ঘনিষ্ঠজনদের কথাবার্তা, ভয়, সংশয় আর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সামনে আসে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিপর্যয়। পরিচিত মানুষ, সম্পর্ক ও জীবনযাপনের ধারাবাহিকতাও। চরিত্রের সংখ্যা কমানো, ঘটনাকে সংক্ষিপ্ত করা এবং সংলাপের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি স্পষ্ট করার কাজ চলছিল। ফলে নাটকটির পরিবর্তন শুধু মঞ্চের প্রয়োজনেই হয়নি; অনুমতি পাওয়ার লড়াইও তার চূড়ান্ত রূপ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল। এই চরিত্রগুলোকে কীভাবে দেখানো হবে, সেটিই ছিল বড় প্রশ্ন। নাটকটি ঘিরে আপত্তির কেন্দ্রে ছিল এমন টানাপোড়েন। গল্প সংক্ষিপ্ত করতে হয়েছে, বাদ দিতে হয়েছে চরিত্র ও দৃশ্য। অনুমতি ছিল নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও মৌসুমের জন্য।

রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও গোপন পরিপত্র

বলশেভিকদের প্রতিপক্ষ শ্বেতরক্ষীদের সঙ্গে যুক্ত বা সহানুভূতিশীল মানুষ নিয়ে গল্প বলাটা সেই সময়ে ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

বুলগাকভ জাদুঘরের সংগ্রহভুক্ত ১৯২৬ সালের ১ অক্টোবরের একটি গোপন পরিপত্রে সেই সময়ের কঠোর বিধিনিষেধের প্রমাণ মেলে। প্রধান রেপার্টরি কমিটির ওই পরিপত্রে চলতি মৌসুমে শুধু মস্কো আর্ট থিয়েটারকে নাটকটি মঞ্চস্থ করার সীমিত অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ১৯২৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সোভিয়েত গোপন পুলিশ সংস্থা ওজিপিইউও মঞ্চায়নের বিরুদ্ধে আপত্তি জানায়। তাদের অভিযোগ ছিল, পরিবর্তনগুলো করার পরও নাটকটিতে শ্বেতরক্ষী অফিসারদের আদর্শায়িত করা হয়েছে। ফলে শুরু থেকেই নাটকটি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে এবং নানা মহলে বিতর্ক তৈরি হয়। একদিকে দর্শকের ভিড়, অন্যদিকে মঞ্চায়ন বন্ধের দাবি—এই দোলাচলেই চলতে থাকে এর প্রদর্শনী। কঠিন শর্ত সাপেক্ষে নাটকটি মঞ্চস্থ করার অনুমতি দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ।

স্তালিনের দৃষ্টি ও নাটকের ভাগ্য

স্তালিন নাটকটি কতবার দেখেছিলেন, তা নিয়ে বিবরণে পার্থক্য থাকলেও মস্কো আর্ট থিয়েটারের নথিপত্র অনুযায়ী এটি ১৪ থেকে ১৫ বার মঞ্চস্থ হতে দেখেছেন তিনি। নাটকটির রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তিনি নিজের মতো করে গ্রহণ করেছিলেন। তবে স্তালিনের ব্যক্তিগত আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ১৯২৯ সালে নাটকটির প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যায়। বুলগাকভ নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন, নাটকটি ২৮৯তম প্রদর্শনীর পর নিষিদ্ধ হয়েছিল। এই সময় বুলগাকভের জীবন চরম সংকটের মুখে পড়ে। ১৯৩০ সালের ২৮ মার্চ তিনি সোভিয়েত সরকারকে দীর্ঘ একটি চিঠি লিখে কাজের সুযোগ না থাকলে দেশ ছাড়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। ১৮ এপ্রিল বুলগাকভকে সরাসরি ফোন করেন স্তালিন, যা নাট্যকারের ভাগ্যে নতুন মোড় আনে। অথচ কমিউনিস্ট শাসক জোসেফ স্তালিন নিজেই নাটকটি দেখতে গেছেন বারবার। সামরিক পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক আনুগত্যও হয়ে উঠতে পারত বিপদের কারণ। প্রথম প্রদর্শনীর আগে গোপন নির্দেশনা বিপ্লবের এক দশকও তখন পেরোয়নি। প্রথম প্রদর্শনীর চার দিন আগে জারি করা এই নির্দেশনায় অনুমতির সঙ্গে মঞ্চায়নের সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়।

শতবর্ষের উত্তরাধিকার

স্তালিনের হস্তক্ষেপে মস্কো আর্ট থিয়েটারে কাজের সুযোগ পেলেও নাটকটি মঞ্চে ফিরতে অপেক্ষা করতে হয় আরও প্রায় দুই বছর। ১৯৩২ সালের শুরুতে পুনরায় ‘দ্য ডেজ অব দ্য টারবিনস’ মঞ্চায়নের সুযোগ পায় মস্কো আর্ট থিয়েটার। শতবর্ষ উপলক্ষে ৫ অক্টোবর প্রকাশিত মস্কো আর্ট থিয়েটারের মিডিয়া সেন্টারের নিবন্ধ অনুযায়ী, প্রথম প্রযোজনাটি সব মিলিয়ে ৯৮৭ বার মঞ্চস্থ হয়েছিল। যদিও ১৯৪১ সালের জুনে মিনস্কে থিয়েটারের সফরের সময় বোমার আঘাতে এই ঐতিহাসিক প্রযোজনার মঞ্চসজ্জা ধ্বংস হয়ে যায়, তবুও সাহিত্যের পাতায় ও ইতিহাসের বয়ানে এই নাটকটি আজও টিকে আছে সোভিয়েত আমলের জটিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামের নীরব সাক্ষী হিসেবে। তাঁর আগ্রহও অবশ্য নাটকটিকে নিষেধাজ্ঞা থেকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারেনি। পরাজিত রাজনৈতিক পক্ষের মানুষও কি মঞ্চে দর্শকের সহানুভূতি পেতে পারে। অর্থাৎ একটি থিয়েটারে মঞ্চায়নের ছাড়পত্র মিললেও নাটকটি অন্যত্র ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল না।

  • উপন্যাসটির নাট্যরূপ: ১৯২৫-১৯২৬ সাল।
  • ঐতিহাসিক রেকর্ড: ৯৮৭ বার প্রথম প্রযোজনা মঞ্চস্থ।
  • স্তালিনের দেখা প্রদর্শনী: অন্তত ১৪ বার।
  • নিষিদ্ধ হওয়ার তারিখ: ১৯২৯ সাল (২৮৯তম প্রদর্শনীর পর)।
  • মূল পটভূমি: ১৯১৮ সালের অস্থির কিয়েভ।
  • বুলগাকভের চিঠির তারিখ: ১৯৩০ সালের ২৮ মার্চ।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

নিষিদ্ধ হয়েছিল নাটকটি, স্তালিন দেখেছিলেন ১৪ বার

আপডেট সময় : ০৭:৩১:৩৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

১০০ বছর আগে কথা। বিপ্লব হয়ে গেছে, জারের পতন ঘটেছে। কিন্তু গৃহযুদ্ধ থামেনি। একের পর এক বদলাচ্ছে কিয়েভের নিয়ন্ত্রণ। সেই অস্থির সময়ে একটি পরিবার নিজেদের ঘরের ভেতর আঁকড়ে ধরে আছে আগের জীবন, মূল্যবোধ আর স্মৃতি। বাইরে গোলাগুলি, মৃত্যু আর অনিশ্চয়তা। আজ যারা ক্ষমতাসীন, কাল তারাই পালিয়ে বেড়াচ্ছে। দরজা ভেঙে যেন ঘরে ঢুকে পড়ছে ইতিহাস। রুশ ইতিহাসের সেই টালমাটাল সময়ে মিখাইল বুলগাকভের লেখা ‘দ্য হোয়াইট গার্ড’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি নাটক ‘দ্য ডেজ অব দ্য টারবিনস’ আজ বিশ্বসাহিত্যের ও মঞ্চের এক অবিস্মরণীয় দলিল। নাটকটির প্রথম মঞ্চায়নের শতবর্ষ পূর্ণ হয়েছে ৫ অক্টোবর। বাইরে যে পক্ষই ক্ষমতায় আসুক, ঘরের ভেতর মানুষ স্বাভাবিক জীবনের কিছুটা ধরে রাখতে চায়। ওই বছরের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রথম সংস্করণটি লেখেন।

উপন্যাস থেকে মঞ্চে উত্তরণ

১৯১৮ সালের কিয়েভকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই নাটকের পটভূমিতে দেখা যায় জারের পতনের পর বলশেভিকদের ক্ষমতা দখল এবং সাবেক রুশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। বুলগাকভ জাদুঘরের তথ্য অনুযায়ী, উপন্যাসটি অবলম্বনে ১৯২৫ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে তিনি নাটকটি তৈরি করেন। মস্কো আর্ট থিয়েটারের ওয়েবসাইটে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক পর্যালোচনা থেকে জানা যায়, ১৯২৫ সালে মস্কো আর্ট থিয়েটার ও ভাখতাঙ্গভ থিয়েটার—দুই প্রতিষ্ঠানই উপন্যাসটির নাট্যরূপ নিয়ে দারুণ আগ্রহ দেখিয়েছিল। তবে উপন্যাসের বিস্তৃত ঘটনাপ্রবাহকে মঞ্চের সীমিত পরিসরে আনার জন্য গল্প পুনর্গঠন ও চরিত্রের বিন্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়েছিল, যা ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এক ভারসাম্য রক্ষার লড়াই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নাটকের বিভিন্ন অনলাইন গ্রুপে নাটকটির কথা উঠে আসছে। এই নাটকের ইতিহাসে পাশাপাশি রয়েছে দুটি বিপরীত ছবি। জারের পতন পুরোনো শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটালেও নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কার অবস্থান কোথায় হবে, তা তখনো অনিশ্চিত। বিশেষ করে কিয়েভে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে বদলে যাচ্ছিল মানুষের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের হিসাব। কিয়েভে বসবাসকারী টারবিন পরিবারকে ঘিরে এগিয়েছে উপন্যাসের গল্প। যুদ্ধ ও রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যে একটি শিক্ষিত পরিবারের পরিচিত পৃথিবী কীভাবে ভেঙে পড়ছে, বুলগাকভ তুলে ধরেছেন সেই অভিজ্ঞতা। পরিবারের সদস্য ও তাদের ঘনিষ্ঠজনদের কথাবার্তা, ভয়, সংশয় আর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সামনে আসে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিপর্যয়। পরিচিত মানুষ, সম্পর্ক ও জীবনযাপনের ধারাবাহিকতাও। চরিত্রের সংখ্যা কমানো, ঘটনাকে সংক্ষিপ্ত করা এবং সংলাপের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি স্পষ্ট করার কাজ চলছিল। ফলে নাটকটির পরিবর্তন শুধু মঞ্চের প্রয়োজনেই হয়নি; অনুমতি পাওয়ার লড়াইও তার চূড়ান্ত রূপ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল। এই চরিত্রগুলোকে কীভাবে দেখানো হবে, সেটিই ছিল বড় প্রশ্ন। নাটকটি ঘিরে আপত্তির কেন্দ্রে ছিল এমন টানাপোড়েন। গল্প সংক্ষিপ্ত করতে হয়েছে, বাদ দিতে হয়েছে চরিত্র ও দৃশ্য। অনুমতি ছিল নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও মৌসুমের জন্য।

রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও গোপন পরিপত্র

বলশেভিকদের প্রতিপক্ষ শ্বেতরক্ষীদের সঙ্গে যুক্ত বা সহানুভূতিশীল মানুষ নিয়ে গল্প বলাটা সেই সময়ে ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

বুলগাকভ জাদুঘরের সংগ্রহভুক্ত ১৯২৬ সালের ১ অক্টোবরের একটি গোপন পরিপত্রে সেই সময়ের কঠোর বিধিনিষেধের প্রমাণ মেলে। প্রধান রেপার্টরি কমিটির ওই পরিপত্রে চলতি মৌসুমে শুধু মস্কো আর্ট থিয়েটারকে নাটকটি মঞ্চস্থ করার সীমিত অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ১৯২৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সোভিয়েত গোপন পুলিশ সংস্থা ওজিপিইউও মঞ্চায়নের বিরুদ্ধে আপত্তি জানায়। তাদের অভিযোগ ছিল, পরিবর্তনগুলো করার পরও নাটকটিতে শ্বেতরক্ষী অফিসারদের আদর্শায়িত করা হয়েছে। ফলে শুরু থেকেই নাটকটি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে এবং নানা মহলে বিতর্ক তৈরি হয়। একদিকে দর্শকের ভিড়, অন্যদিকে মঞ্চায়ন বন্ধের দাবি—এই দোলাচলেই চলতে থাকে এর প্রদর্শনী। কঠিন শর্ত সাপেক্ষে নাটকটি মঞ্চস্থ করার অনুমতি দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ।

স্তালিনের দৃষ্টি ও নাটকের ভাগ্য

স্তালিন নাটকটি কতবার দেখেছিলেন, তা নিয়ে বিবরণে পার্থক্য থাকলেও মস্কো আর্ট থিয়েটারের নথিপত্র অনুযায়ী এটি ১৪ থেকে ১৫ বার মঞ্চস্থ হতে দেখেছেন তিনি। নাটকটির রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তিনি নিজের মতো করে গ্রহণ করেছিলেন। তবে স্তালিনের ব্যক্তিগত আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ১৯২৯ সালে নাটকটির প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যায়। বুলগাকভ নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন, নাটকটি ২৮৯তম প্রদর্শনীর পর নিষিদ্ধ হয়েছিল। এই সময় বুলগাকভের জীবন চরম সংকটের মুখে পড়ে। ১৯৩০ সালের ২৮ মার্চ তিনি সোভিয়েত সরকারকে দীর্ঘ একটি চিঠি লিখে কাজের সুযোগ না থাকলে দেশ ছাড়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। ১৮ এপ্রিল বুলগাকভকে সরাসরি ফোন করেন স্তালিন, যা নাট্যকারের ভাগ্যে নতুন মোড় আনে। অথচ কমিউনিস্ট শাসক জোসেফ স্তালিন নিজেই নাটকটি দেখতে গেছেন বারবার। সামরিক পরিচয় কিংবা রাজনৈতিক আনুগত্যও হয়ে উঠতে পারত বিপদের কারণ। প্রথম প্রদর্শনীর আগে গোপন নির্দেশনা বিপ্লবের এক দশকও তখন পেরোয়নি। প্রথম প্রদর্শনীর চার দিন আগে জারি করা এই নির্দেশনায় অনুমতির সঙ্গে মঞ্চায়নের সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়।

শতবর্ষের উত্তরাধিকার

স্তালিনের হস্তক্ষেপে মস্কো আর্ট থিয়েটারে কাজের সুযোগ পেলেও নাটকটি মঞ্চে ফিরতে অপেক্ষা করতে হয় আরও প্রায় দুই বছর। ১৯৩২ সালের শুরুতে পুনরায় ‘দ্য ডেজ অব দ্য টারবিনস’ মঞ্চায়নের সুযোগ পায় মস্কো আর্ট থিয়েটার। শতবর্ষ উপলক্ষে ৫ অক্টোবর প্রকাশিত মস্কো আর্ট থিয়েটারের মিডিয়া সেন্টারের নিবন্ধ অনুযায়ী, প্রথম প্রযোজনাটি সব মিলিয়ে ৯৮৭ বার মঞ্চস্থ হয়েছিল। যদিও ১৯৪১ সালের জুনে মিনস্কে থিয়েটারের সফরের সময় বোমার আঘাতে এই ঐতিহাসিক প্রযোজনার মঞ্চসজ্জা ধ্বংস হয়ে যায়, তবুও সাহিত্যের পাতায় ও ইতিহাসের বয়ানে এই নাটকটি আজও টিকে আছে সোভিয়েত আমলের জটিল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামের নীরব সাক্ষী হিসেবে। তাঁর আগ্রহও অবশ্য নাটকটিকে নিষেধাজ্ঞা থেকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারেনি। পরাজিত রাজনৈতিক পক্ষের মানুষও কি মঞ্চে দর্শকের সহানুভূতি পেতে পারে। অর্থাৎ একটি থিয়েটারে মঞ্চায়নের ছাড়পত্র মিললেও নাটকটি অন্যত্র ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ ছিল না।

  • উপন্যাসটির নাট্যরূপ: ১৯২৫-১৯২৬ সাল।
  • ঐতিহাসিক রেকর্ড: ৯৮৭ বার প্রথম প্রযোজনা মঞ্চস্থ।
  • স্তালিনের দেখা প্রদর্শনী: অন্তত ১৪ বার।
  • নিষিদ্ধ হওয়ার তারিখ: ১৯২৯ সাল (২৮৯তম প্রদর্শনীর পর)।
  • মূল পটভূমি: ১৯১৮ সালের অস্থির কিয়েভ।
  • বুলগাকভের চিঠির তারিখ: ১৯৩০ সালের ২৮ মার্চ।