ঢাকা ১১:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

হুমা কুরেশির নতুন ওয়েব সিনেমা

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২৪:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ ২৬ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নাচিকেত সামন্ত পরিচালিত হিন্দি সিনেমা ‘বেবি ডু ডাই ডু’ এখন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সের দর্শকদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। গত জুলাই মাসে সিনেমা হলে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রটি বর্তমানে বাংলাদেশের নেটফ্লিক্স ব্যবহারকারীদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছে। সিনেমার মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন হুমা কুরেশি, যিনি একজন মূক ও বধির তরুণীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। শৈশবের গভীর ক্ষত ও একাকিত্বকে সঙ্গী করে গড়ে ওঠা বেবি কারমারকর পেশাদার খুনি হিসেবে আন্ডারওয়ার্ল্ডে বেশ পরিচিত। এই নির্মম খুনির বুকেই জমে আছে শৈশবের গভীর ক্ষত, একাকিত্ব আর ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। গত জুলাইয়ে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি সম্প্রতি এসেছে নেটফ্লিক্সে। মুক্তির পর থেকেই বাংলাদেশে প্ল্যাটফর্মটির জনপ্রিয় সিনেমার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে এটি। আততায়ীকে ঘিরে নির্মিত থ্রিলার হিসেবে ‘বেবি ডু ডাই ডু’ খুব একটা নতুন কিছু দেখায় না। শৈশবের এক মর্মান্তিক ঘটনা বেবি কারমারকরকে (হুমা কুরেশি) পরিণত করেছে নির্মম এক ভাড়াটে খুনিতে।

সিনেমার গল্পে বেবি ‘পাপা’ নামক এক ব্যক্তির অধীনে কাজ করে। তার নিশানায় ভুলের কোনো অবকাশ নেই, আর কাজের সহায়তায় সে ব্যবহার করে একটি বিশেষ ছাতা। পেশার প্রয়োজনে সে কথা বলা বা শোনার সক্ষমতা না থাকার বিষয়টিকেই একধরনের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে। সিনেমার ইংরেজি শিরোনাম ‘বেবি ডু ডাই ডু’ এবং মহারাষ্ট্রীয় নাম ‘বেবি কারমারকর’-এর মধ্যে ধ্বনিগত মিল গল্পের এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। তার ব্যক্তিগত জীবনের জটিলতা সামনে আসে যখন রচিত সিং অভিনীত প্রেমিকের সঙ্গে তার সম্পর্ক গভীর হয়। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকাঙ্ক্ষা করলেও অপরাধজগতের টানাপোড়েনে সে এক রক্তাক্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। তার অস্ত্র একটি ছাতা, যার আড়াল থেকে অব্যর্থ নিশানায় গুলি চালাতে পারে সে। বেবি এই পেশা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়।

পরিচালক এই সিনেমাটি নির্মাণে দৃশ্যপট ও শব্দের ব্যবহারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। বেবির নীরব জগতকে ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহৃত হয়েছে সাদা-কালো ফ্ল্যাশব্যাক, নির্বাক চলচ্চিত্রের বিভিন্ন কৌশল ও বিশেষ সংগীত। বিশেষ করে লাল রঙের ব্যবহার এখানে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। সিনেমাটিকে গতানুগতিক থ্রিলারের বাইরে আনতে সিসিটিভি ফুটেজের অভিনব ব্যবহার, বিভক্ত পর্দা ও ভয়েস নোটের মতো প্রযুক্তিগত কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া সমকামীদের ক্লাবে বাজানো গান কিংবা বিয়ের দৃশ্যের নেপথ্যে মিউচুয়াল ফান্ডের ঝুঁকি নিয়ে গানের ব্যবহার নির্মাতার রসবোধের পরিচয় দেয়।

সিনেমার গল্প বলার ধরন যতটা আকর্ষণীয়, নির্মাণশৈলীর দিক থেকে এটি কিছুটা অগোছালো। অনেকগুলো পার্শ্বচরিত্র—যেমন বেবির প্রেমিক, এক রহস্যময় আইনজীবী, কাজে ভুল করা পুরুষ সহকর্মী, দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ কর্মকর্তা, পরামর্শদাতা, বস্তির এক তরুণ প্রতিবেশী, একজন খলনায়ক ও তার ভাই, এবং এক অসৎ ধনকুবের—সব মিলিয়ে গল্পের মূল মনোযোগ অনেক সময় হারিয়ে যায়। দ্বিতীয়ার্ধে অনেকগুলো কাকতালীয় ঘটনার ভিড়ে চরিত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের সমীকরণ বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে, যদিও শেষদিকে সূত্রগুলো মেলানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অভিনবত্ব বলতে, রহস্যময় খুনি একজন নারী, যে কথা বলতে ও শুনতে পারে না।

অভিনয়ের দিক থেকে হুমা কুরেশি এক অসাধারণ কাজ করেছেন। মূক ও বধির চরিত্রটির আবেগ ও একাকিত্ব তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। পাশাপাশি রচিত সিং, চাঙ্কি পান্ডে ও সিকান্দার খের তাদের স্ব-স্ব চরিত্রে মানানসই অভিনয় উপহার দিয়েছেন। বিশেষ করে খলনায়কের চরিত্রে সিকান্দার খের প্রতিবারই দর্শককে চমকে দেন।

সিনেমাটির সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো মুম্বাই শহরের উপস্থাপনা।

নির্মাতা এখানে মুম্বাইকে কেবল পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করেননি, বরং সময়ের পরিবর্তনে বদলে যাওয়া শহরটিকে একটি চরিত্র হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।

ফ্ল্যাশব্যাকের সাদা-কালো মুম্বাইয়ের সাথে বর্তমানের বৃষ্টিভেজা নিয়ন আলোর শহরের বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে।

উন্নয়নের আড়ালে নৈতিক অবক্ষয় এবং পুরোনো মুম্বাইয়ের সংস্কৃতির সাথে আধুনিক নগরীর সংঘাত ফুটে উঠেছে সিনেমাটিতে। এটি অনেকটা অনুরাগ কশ্যপের ‘কেনেডি’ সিনেমার আবহের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও নিজস্ব স্বতন্ত্র থ্রিলার কাঠামোর মধ্যেই শহরকে দেখার চেষ্টা করেছে। সবশেষে সিনেমাটি যেন এক কংক্রিটের জঙ্গল ও তার ভেতরের মানুষের অস্তিত্ব সংকটের গল্প বলে যায়।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

হুমা কুরেশির নতুন ওয়েব সিনেমা

আপডেট সময় : ০৯:২৪:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬

নাচিকেত সামন্ত পরিচালিত হিন্দি সিনেমা ‘বেবি ডু ডাই ডু’ এখন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সের দর্শকদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। গত জুলাই মাসে সিনেমা হলে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রটি বর্তমানে বাংলাদেশের নেটফ্লিক্স ব্যবহারকারীদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে রয়েছে। সিনেমার মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন হুমা কুরেশি, যিনি একজন মূক ও বধির তরুণীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। শৈশবের গভীর ক্ষত ও একাকিত্বকে সঙ্গী করে গড়ে ওঠা বেবি কারমারকর পেশাদার খুনি হিসেবে আন্ডারওয়ার্ল্ডে বেশ পরিচিত। এই নির্মম খুনির বুকেই জমে আছে শৈশবের গভীর ক্ষত, একাকিত্ব আর ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। গত জুলাইয়ে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি সম্প্রতি এসেছে নেটফ্লিক্সে। মুক্তির পর থেকেই বাংলাদেশে প্ল্যাটফর্মটির জনপ্রিয় সিনেমার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে এটি। আততায়ীকে ঘিরে নির্মিত থ্রিলার হিসেবে ‘বেবি ডু ডাই ডু’ খুব একটা নতুন কিছু দেখায় না। শৈশবের এক মর্মান্তিক ঘটনা বেবি কারমারকরকে (হুমা কুরেশি) পরিণত করেছে নির্মম এক ভাড়াটে খুনিতে।

সিনেমার গল্পে বেবি ‘পাপা’ নামক এক ব্যক্তির অধীনে কাজ করে। তার নিশানায় ভুলের কোনো অবকাশ নেই, আর কাজের সহায়তায় সে ব্যবহার করে একটি বিশেষ ছাতা। পেশার প্রয়োজনে সে কথা বলা বা শোনার সক্ষমতা না থাকার বিষয়টিকেই একধরনের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে। সিনেমার ইংরেজি শিরোনাম ‘বেবি ডু ডাই ডু’ এবং মহারাষ্ট্রীয় নাম ‘বেবি কারমারকর’-এর মধ্যে ধ্বনিগত মিল গল্পের এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। তার ব্যক্তিগত জীবনের জটিলতা সামনে আসে যখন রচিত সিং অভিনীত প্রেমিকের সঙ্গে তার সম্পর্ক গভীর হয়। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকাঙ্ক্ষা করলেও অপরাধজগতের টানাপোড়েনে সে এক রক্তাক্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। তার অস্ত্র একটি ছাতা, যার আড়াল থেকে অব্যর্থ নিশানায় গুলি চালাতে পারে সে। বেবি এই পেশা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়।

পরিচালক এই সিনেমাটি নির্মাণে দৃশ্যপট ও শব্দের ব্যবহারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। বেবির নীরব জগতকে ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহৃত হয়েছে সাদা-কালো ফ্ল্যাশব্যাক, নির্বাক চলচ্চিত্রের বিভিন্ন কৌশল ও বিশেষ সংগীত। বিশেষ করে লাল রঙের ব্যবহার এখানে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে। সিনেমাটিকে গতানুগতিক থ্রিলারের বাইরে আনতে সিসিটিভি ফুটেজের অভিনব ব্যবহার, বিভক্ত পর্দা ও ভয়েস নোটের মতো প্রযুক্তিগত কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া সমকামীদের ক্লাবে বাজানো গান কিংবা বিয়ের দৃশ্যের নেপথ্যে মিউচুয়াল ফান্ডের ঝুঁকি নিয়ে গানের ব্যবহার নির্মাতার রসবোধের পরিচয় দেয়।

সিনেমার গল্প বলার ধরন যতটা আকর্ষণীয়, নির্মাণশৈলীর দিক থেকে এটি কিছুটা অগোছালো। অনেকগুলো পার্শ্বচরিত্র—যেমন বেবির প্রেমিক, এক রহস্যময় আইনজীবী, কাজে ভুল করা পুরুষ সহকর্মী, দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ কর্মকর্তা, পরামর্শদাতা, বস্তির এক তরুণ প্রতিবেশী, একজন খলনায়ক ও তার ভাই, এবং এক অসৎ ধনকুবের—সব মিলিয়ে গল্পের মূল মনোযোগ অনেক সময় হারিয়ে যায়। দ্বিতীয়ার্ধে অনেকগুলো কাকতালীয় ঘটনার ভিড়ে চরিত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের সমীকরণ বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে, যদিও শেষদিকে সূত্রগুলো মেলানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অভিনবত্ব বলতে, রহস্যময় খুনি একজন নারী, যে কথা বলতে ও শুনতে পারে না।

অভিনয়ের দিক থেকে হুমা কুরেশি এক অসাধারণ কাজ করেছেন। মূক ও বধির চরিত্রটির আবেগ ও একাকিত্ব তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। পাশাপাশি রচিত সিং, চাঙ্কি পান্ডে ও সিকান্দার খের তাদের স্ব-স্ব চরিত্রে মানানসই অভিনয় উপহার দিয়েছেন। বিশেষ করে খলনায়কের চরিত্রে সিকান্দার খের প্রতিবারই দর্শককে চমকে দেন।

সিনেমাটির সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা হলো মুম্বাই শহরের উপস্থাপনা।

নির্মাতা এখানে মুম্বাইকে কেবল পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করেননি, বরং সময়ের পরিবর্তনে বদলে যাওয়া শহরটিকে একটি চরিত্র হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।

ফ্ল্যাশব্যাকের সাদা-কালো মুম্বাইয়ের সাথে বর্তমানের বৃষ্টিভেজা নিয়ন আলোর শহরের বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে।

উন্নয়নের আড়ালে নৈতিক অবক্ষয় এবং পুরোনো মুম্বাইয়ের সংস্কৃতির সাথে আধুনিক নগরীর সংঘাত ফুটে উঠেছে সিনেমাটিতে। এটি অনেকটা অনুরাগ কশ্যপের ‘কেনেডি’ সিনেমার আবহের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও নিজস্ব স্বতন্ত্র থ্রিলার কাঠামোর মধ্যেই শহরকে দেখার চেষ্টা করেছে। সবশেষে সিনেমাটি যেন এক কংক্রিটের জঙ্গল ও তার ভেতরের মানুষের অস্তিত্ব সংকটের গল্প বলে যায়।