ঢাকা ০২:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

পিরোজপুরে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফন সম্পন্ন

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩৪:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পিরোজপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর শেষকৃত্য নিয়ে দিনভর যে অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল, তা অবশেষে শনিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে নিরসন হয়েছে। পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে তার পারিবারিক কবরস্থানে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে শেষ শয্যায় শায়িত করা হয়। আইনশৃঙ্খলার অবনতি এড়াতে এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দাফনের সময় পুরো এলাকা পুলিশি পাহারায় রাখা হয়েছিল। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশি পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর নিজ এলাকায় দাফন নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। প্রথমে আমরা তাকে দাফনের জন্য নিয়ে আসি। কিন্তু দাফন করতে না পারায় বিপাকে পড়ি। এখন দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, কবর খুঁড়ছি। পরে আলোচনার মাধ্যমে দাফনের বিষয়ে সমঝোতা হয়। এ সময় মরদেহ সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে বরফ ছাড়াই রাখতে হয়েছিল।

৮৭ বছর বয়সী এই বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফন নিয়ে জটিলতা শুরু হয় মূলত রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বা গার্ড অব অনার পাওয়ার প্রক্রিয়া ঘিরে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতারা তার শেষ বিদায়ে বাধা দিয়েছিলেন। এই নেতারা মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া এবং পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে না দেওয়ার জন্য হুমকি দিয়েছিলেন। এই বিরোধের ফলে পরিবার চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে দিন অতিবাহিত করে। পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের বাধার কারণে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিলম্ব হয়। পরে প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করা হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, তারা মরদেহ নিয়ে দুপুর ১২টার দিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৌঁছান। তবে সেখানে গার্ড অব অনার পাওয়ার কথা থাকলেও তা পেতে তাদের বিকেল ৫টা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। রিনা আক্তার নামের প্রয়াতের এক ছোট বোন অভিযোগ করেন, দাফনের পুরো বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের তরফ থেকে কোনো দায়িত্ব নেওয়া হয়নি।

অবশ্য পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকেল ৫টার দিকে পিরোজপুর পুলিশ লাইনসে মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, গার্ড অব অনারের পর মরদেহ পুলিশ লাইনসে একটি ফ্রিজিং গাড়িতে রাখা ছিল। পরে রাত দেড়টার দিকে কঠোর পুলিশ পাহারায় মরদেহ চিতলিয়া গ্রামে নিয়ে গিয়ে দাফন সম্পন্ন করা হয়।

মানিক পশারী ১৯৭১ সালের বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত ছিলেন। এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা মামলার প্রধান বাদী ছিলেন তিনি। এই মামলার কারণেই স্থানীয় পর্যায়ে একটি পক্ষ তার শেষ বিদায়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে। যদিও পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীম দাবি করেছেন, নির্ধারিত নিয়মানুযায়ীই মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়েছে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মানিক পশারী নিজ এলাকা ছেড়ে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাতার বাড়িতে আশ্রয় নেন। মানিক পশারীর মেয়ের জামাতা ফারুক হোসেন অভিযোগ করে বলেন, সকাল ১০টায় তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আবদুর রাজ্জাক।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

পিরোজপুরে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফন সম্পন্ন

আপডেট সময় : ০৯:৩৪:৩৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

পিরোজপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর শেষকৃত্য নিয়ে দিনভর যে অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল, তা অবশেষে শনিবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে নিরসন হয়েছে। পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে তার পারিবারিক কবরস্থানে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে শেষ শয্যায় শায়িত করা হয়। আইনশৃঙ্খলার অবনতি এড়াতে এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দাফনের সময় পুরো এলাকা পুলিশি পাহারায় রাখা হয়েছিল। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত দেড়টার দিকে পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশি পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর নিজ এলাকায় দাফন নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। প্রথমে আমরা তাকে দাফনের জন্য নিয়ে আসি। কিন্তু দাফন করতে না পারায় বিপাকে পড়ি। এখন দাফনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, কবর খুঁড়ছি। পরে আলোচনার মাধ্যমে দাফনের বিষয়ে সমঝোতা হয়। এ সময় মরদেহ সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে বরফ ছাড়াই রাখতে হয়েছিল।

৮৭ বছর বয়সী এই বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফন নিয়ে জটিলতা শুরু হয় মূলত রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বা গার্ড অব অনার পাওয়ার প্রক্রিয়া ঘিরে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতারা তার শেষ বিদায়ে বাধা দিয়েছিলেন। এই নেতারা মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া এবং পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে না দেওয়ার জন্য হুমকি দিয়েছিলেন। এই বিরোধের ফলে পরিবার চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে দিন অতিবাহিত করে। পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের বাধার কারণে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিলম্ব হয়। পরে প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির সমাধান করা হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, তারা মরদেহ নিয়ে দুপুর ১২টার দিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৌঁছান। তবে সেখানে গার্ড অব অনার পাওয়ার কথা থাকলেও তা পেতে তাদের বিকেল ৫টা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। রিনা আক্তার নামের প্রয়াতের এক ছোট বোন অভিযোগ করেন, দাফনের পুরো বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনের তরফ থেকে কোনো দায়িত্ব নেওয়া হয়নি।

অবশ্য পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকেল ৫টার দিকে পিরোজপুর পুলিশ লাইনসে মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, গার্ড অব অনারের পর মরদেহ পুলিশ লাইনসে একটি ফ্রিজিং গাড়িতে রাখা ছিল। পরে রাত দেড়টার দিকে কঠোর পুলিশ পাহারায় মরদেহ চিতলিয়া গ্রামে নিয়ে গিয়ে দাফন সম্পন্ন করা হয়।

মানিক পশারী ১৯৭১ সালের বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত ছিলেন। এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের সাবেক সংসদ সদস্য দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা মামলার প্রধান বাদী ছিলেন তিনি। এই মামলার কারণেই স্থানীয় পর্যায়ে একটি পক্ষ তার শেষ বিদায়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে। যদিও পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীম দাবি করেছেন, নির্ধারিত নিয়মানুযায়ীই মানিক পশারীকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়েছে। পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মানিক পশারী নিজ এলাকা ছেড়ে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাতার বাড়িতে আশ্রয় নেন। মানিক পশারীর মেয়ের জামাতা ফারুক হোসেন অভিযোগ করে বলেন, সকাল ১০টায় তার মৃত্যু হয়। অন্যদিকে মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আবদুর রাজ্জাক।