ঢাকা ০১:৫৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব: টিকাদান ব্যর্থতায় বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:৫৩:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ৩৯ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দীর্ঘ সময় হাম নিয়ন্ত্রণে রেখে সফলতার নজির গড়লেও বর্তমানে এক সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০২৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পটপরিবর্তন জনস্বাস্থ্য খাতের অর্জিত সেই সাফল্যকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি ও মাঠপর্যায়ে অব্যবস্থাপনার কারণে এই সংক্রামক রোগটি বর্তমানে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফের যৌথ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশে হামের প্রথম ডোজের কভারেজ ৯০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে। মহামারিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু ২০২৫ সালে রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির প্রভাবে এ সফলতায় বড় ধাক্কা লাগে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো দেশে মহামারি ঠেকাতে অন্তত ৯৫ ভাগ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ এই লক্ষ্যমাত্রার খুব কাছাকাছি থাকলেও ২০২৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিরতার জেরে সেই টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়। এছাড়া সাধারণ সময়ে টিকাদান অভিযানের আগে চারটি ধাপে প্রস্তুতি যাচাই করা হলেও সময় স্বল্পতার অজুহাতে মাত্র একটি ধাপে তা শেষ করা হয়েছিল।

চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে ২ লাখ ২ হাজার সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২২ হাজার জনের সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে। এ বছর বিশ্বে সন্দেহভাজন হামের রোগীর সংখ্যায় বাংলাদেশ শীর্ষে। এই অতি সংক্রামক ব্যাধিতে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার ৯৪ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এছাড়া সরকারি হিসাবেই শুধু সিলেট বিভাগে ১৮০ শিশুর প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মবিরতি, টিকা আমদানিতে বিলম্ব এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে নজরদারির অভাব এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরিতে মূল ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেসময় যাদের হামের টিকা দেয়া হয়নি বড় মূল্য চোকাতে হচ্ছে তাদের। ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করছে দেশের শিশুরা। সিলেটে ট্র্যাজেডি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ হামের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অন্যতম উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট বিভাগ। সেখানে সরকারি হিসাবেই ১৮০ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে।

নিইউয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল পাবলিক হেলথ স্কুলের অধ্যাপক এবং ডব্লিউএইচওর টিকা উপদেষ্টা মার্ক জিৎ মনে করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে সারা বিশ্বের জন্যই একটি বড় সতর্কবার্তা। তিনি জানান, মহামারির পর জরুরি মোকাবিলার চেয়ে নিয়মিত টিকাদান অনেক বেশি কার্যকর ও সাশ্রয়ী। রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সরকারের জরুরি টিকাদান কার্যক্রমেও ছিল বড় ধরনের ত্রুটি। এপ্রিলে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার দাবি করা হলেও জুনে চালানো জরিপে দেখা যায়, সমবয়সী ৪০ লাখ শিশু সেই কর্মসূচির বাইরে থেকে গেছে। ফলে ক্যাম্পেইনের আগেও আক্রান্ত শিশুদের ৮২ শতাংশ ছিল টিকাবিহীন, যা ক্যাম্পেইনের পরও ৮৫ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানের হার কমে গেলে কী ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে, বিশ্ববাসীর জন্য বাংলাদেশ এখন সেই বাস্তব সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় পর্যায়ে ভুক্তভোগী অনেক পরিবার অভিযোগ করেছে, সময়মতো স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের গ্রামে টিকা নিয়ে পৌঁছাননি। শিশুর মৃত্যুর পরই কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের তৎপরতা দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার জানিয়েছেন, প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে অভিভাবকদের অনীহা বা অসুস্থতাজনিত কারণে কিছু শিশু টিকাদানের বাইরে থাকতে পারে বলে দাবি তার। এদিকে সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৯৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে।

সিলেটের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি রোগী নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। ডেঙ্গুর প্রকোপের সঙ্গে হামের রোগীদের উপস্থিতিতে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নজিরবিহীন সংকট তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকরা বর্তমানে পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনার পরামর্শ দিচ্ছেন, কারণ মোট আক্রান্তের এক-তৃতীয়াংশই এই বয়সী শিশু। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত কেন কমে যাচ্ছে, তা নিয়েও এখন নিবিড় গবেষণা চলছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব: টিকাদান ব্যর্থতায় বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল

আপডেট সময় : ০৭:৫৩:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

দীর্ঘ সময় হাম নিয়ন্ত্রণে রেখে সফলতার নজির গড়লেও বর্তমানে এক সংকটময় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০২৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পটপরিবর্তন জনস্বাস্থ্য খাতের অর্জিত সেই সাফল্যকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি ও মাঠপর্যায়ে অব্যবস্থাপনার কারণে এই সংক্রামক রোগটি বর্তমানে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফের যৌথ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশে হামের প্রথম ডোজের কভারেজ ৯০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে। মহামারিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু ২০২৫ সালে রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির প্রভাবে এ সফলতায় বড় ধাক্কা লাগে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো দেশে মহামারি ঠেকাতে অন্তত ৯৫ ভাগ টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ এই লক্ষ্যমাত্রার খুব কাছাকাছি থাকলেও ২০২৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিরতার জেরে সেই টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়। এছাড়া সাধারণ সময়ে টিকাদান অভিযানের আগে চারটি ধাপে প্রস্তুতি যাচাই করা হলেও সময় স্বল্পতার অজুহাতে মাত্র একটি ধাপে তা শেষ করা হয়েছিল।

চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে ২ লাখ ২ হাজার সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ২২ হাজার জনের সংক্রমণ নিশ্চিত করা হয়েছে। এ বছর বিশ্বে সন্দেহভাজন হামের রোগীর সংখ্যায় বাংলাদেশ শীর্ষে। এই অতি সংক্রামক ব্যাধিতে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার ৯৪ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এছাড়া সরকারি হিসাবেই শুধু সিলেট বিভাগে ১৮০ শিশুর প্রাণহানির তথ্য পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মবিরতি, টিকা আমদানিতে বিলম্ব এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে নজরদারির অভাব এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরিতে মূল ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেসময় যাদের হামের টিকা দেয়া হয়নি বড় মূল্য চোকাতে হচ্ছে তাদের। ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করছে দেশের শিশুরা। সিলেটে ট্র্যাজেডি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ হামের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর অন্যতম উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট বিভাগ। সেখানে সরকারি হিসাবেই ১৮০ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে।

নিইউয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল পাবলিক হেলথ স্কুলের অধ্যাপক এবং ডব্লিউএইচওর টিকা উপদেষ্টা মার্ক জিৎ মনে করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে সারা বিশ্বের জন্যই একটি বড় সতর্কবার্তা। তিনি জানান, মহামারির পর জরুরি মোকাবিলার চেয়ে নিয়মিত টিকাদান অনেক বেশি কার্যকর ও সাশ্রয়ী। রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সরকারের জরুরি টিকাদান কার্যক্রমেও ছিল বড় ধরনের ত্রুটি। এপ্রিলে প্রায় ২ কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার দাবি করা হলেও জুনে চালানো জরিপে দেখা যায়, সমবয়সী ৪০ লাখ শিশু সেই কর্মসূচির বাইরে থেকে গেছে। ফলে ক্যাম্পেইনের আগেও আক্রান্ত শিশুদের ৮২ শতাংশ ছিল টিকাবিহীন, যা ক্যাম্পেইনের পরও ৮৫ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানের হার কমে গেলে কী ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে, বিশ্ববাসীর জন্য বাংলাদেশ এখন সেই বাস্তব সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় পর্যায়ে ভুক্তভোগী অনেক পরিবার অভিযোগ করেছে, সময়মতো স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের গ্রামে টিকা নিয়ে পৌঁছাননি। শিশুর মৃত্যুর পরই কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের তৎপরতা দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার জানিয়েছেন, প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে অভিভাবকদের অনীহা বা অসুস্থতাজনিত কারণে কিছু শিশু টিকাদানের বাইরে থাকতে পারে বলে দাবি তার। এদিকে সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৯৮ জন নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে।

সিলেটের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল ধারণক্ষমতার চেয়েও বেশি রোগী নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। ডেঙ্গুর প্রকোপের সঙ্গে হামের রোগীদের উপস্থিতিতে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নজিরবিহীন সংকট তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকরা বর্তমানে পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনার পরামর্শ দিচ্ছেন, কারণ মোট আক্রান্তের এক-তৃতীয়াংশই এই বয়সী শিশু। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত কেন কমে যাচ্ছে, তা নিয়েও এখন নিবিড় গবেষণা চলছে।