বেতন নেন ডিএসসিসির চালক, ময়লার গাড়ি চালান অন্যরা
- আপডেট সময় : ১০:২৪:৫৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ৩১ বার পড়া হয়েছে
৪ অক্টোবর রাত প্রায় পৌনে একটা। সায়েদাবাদের পৌর ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) একটি ময়লার গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-শ ১১-৪৩০৩)। গাড়িটি পাম্পে এসে পৌঁছালে চালকের আসনে বসা যুবক সাজু আহমেদকে দেখে সন্দেহ তৈরি হয়। নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা গেছে, গাড়িটি বরাদ্দ ছিল ভারী যানবাহন চালক সরদার হুমায়ন কবিরের নামে। অথচ সাজু সরাসরি স্বীকার করেন, তিনি করপোরেশনের কোনো নিয়মিত বা মাস্টাররোলের কর্মী নন। তিনি মাসে ১০ হাজার টাকায় সহকারীর কাজ করেন। ভারী যান চালিয়ে পাম্পে আসলেও সাজুর দাবি, তাঁর কাছে কেবল হালকা গাড়ি চালানোর লাইসেন্স রয়েছে। মূল চালক কোথায় জানতে চাইলে তিনি প্রথমে নানা অজুহাত দেন এবং পরে জানান যে তাঁর চাচা (মূল চালক) গোলাপবাগ মোড়ে আড্ডা দিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর কোনো তেল না নিয়েই গাড়িটি দ্রুত পাম্প এলাকা ত্যাগ করে। তবে একজনের মৃত্যুও কেন হবে, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি জানান, লাইসেন্স ছাড়া কাউকে গাড়ি চালাতে না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্তত ৩৫ জন চালক জড়ো হয়ে আমার কাছে জানতে চান, কী নিয়ে কাজ করছি। একপর্যায়ে করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার মধ্যস্থতায় ফিরে আসি। গাড়ি দুটির চালকের সঙ্গে সেদিন আর কথা বলা সম্ভব হয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাম্পে কর্মরত একজন কর্মকর্তা বলেন, করপোরেশনের চালকদের কিছুটা কম দামে তেল বিক্রির বিষয়টি সবাই জানেন। তাঁর বক্তব্য, কিছু গাড়িতে হাইড্রলিক ব্যবস্থা চালাতে ইঞ্জিন চালু রাখতে হয়।
লাইসেন্সহীন ও বহিরাগতদের হাতে ময়লার গাড়ি
দক্ষিণ সিটির বর্জ্য পরিবহনের গাড়ি নিয়ে করা একটি অনুসন্ধানে ২২টি গাড়ি নিবন্ধিত চালক ছাড়া অন্যদের দিয়ে চালানোর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সিটি করপোরেশনেরই একাধিক সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বহিরাগত কিংবা চালকের সহকারী বা স্বজনদের দিয়ে চালানো এমন অনিয়মপ্রবণ গাড়ির সংখ্যা আসলে অন্তত ৫৬টি। বরাদ্দপ্রাপ্ত চালকদের একাংশ নিজেরা গাড়ি না চালিয়ে নিয়মিত বেতন তুলে নিচ্ছেন, আর গাড়ি চালাচ্ছেন লাইসেন্সহীন কিংবা অনুপযুক্ত চালকেরা। রাত পৌনে একটার দিকে আসে ১১-৪৩০৩ নম্বরের গাড়িটির মতোই আরও অনেক যান নিয়মিত রাতে ও দিনে নগরজুড়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলাচল করে। গাড়ি চালাচ্ছেন তাঁদের রাখা সহকারী বা বাইরের লোক। তাঁর ভাষায়, ‘একদম যে ভালো, আমি এটা বলব না। তবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, চালকেরা দিন–রাত মিলিয়ে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা গাড়ি চালান। তবে ১১-৪২৭০ ও ১১-৪৩০৭ নম্বরের গাড়ি দুটি বের হচ্ছিল না। তবে লোক বাড়ানোর সঙ্গে বেতন দেওয়ার সামর্থ্যের বিষয়টিও দেখতে হচ্ছে।
একই রাতে অর্থাৎ ৪ অক্টোবর রাত ১১টার দিকে সায়েদাবাদের পৌর ফিলিং স্টেশনে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় অনিয়মের আরও একাধিক চিত্র। করপোরেশনের এই নিজস্ব পাম্পটি থেকে বর্জ্য ও অন্যান্য কাজের ভারী যানগুলোতে নিয়মিত তেল সরবরাহ করা হয়। রাত ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে ১১-৪২৭৮ নম্বরের আরেকটি গাড়ি পাম্পে তেল নিতে আসে। সরকারি নথি অনুাদায়ী গাড়িটি মো. কাইয়ুম নামের এক চালকের নামে বরাদ্দ হলেও চালকের আসনে পাওয়া যায় সজিব খান নামের এক তরুণকে। গাড়ি চালানোর বৈধ কোনো লাইসেন্স তিনি দেখাতে পারেননি। মূল চালক কাইয়ুম সম্পর্কে সজিব বলেন, তিনি পাম্পের বাইরে অবস্থান করছেন। পরবর্তীতে অনুসন্ধান চালিয়ে চালক কাইয়ুমের দেখা মেলেনি। পাম্পের লোকেরা কাগজে হিসাব লিখে রাখেন। ফলে শুধু চলার দূরত্ব দিয়ে সব গাড়ির জ্বালানি খরচ একভাবে হিসাব করা যায় না।
গ্যারেজে অবস্থান ও সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে সতর্কতা
পরদিন ৫ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের পাশে ডিএসসিসির গাড়ি রাখার গ্যারেজে গিয়ে দেখা যায় অন্য চিত্র। পদ্মা সেতুর অভিমুখে যাওয়া রেললাইনের সন্নিকটে অবস্থিত এই গ্যারেজে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থান করে দেখা যায়, একাধিক গাড়িতে মূল চালকের অনুপস্থিতি। চালকের আসনে বসা যুবকেরা সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্রই স্থান ত্যাগ করতে শুরু করেন। ৪ অক্টোবর রাতে পাম্পে আসা ১১-৪৩০৩ নম্বর গাড়ির সাজু আহমেদ সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে অন্য চালকদের আগেভাগেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। এরপর প্রায় দুই ঘণ্টা পাম্পে অপেক্ষা করেছি। সেই গাড়িও চালাচ্ছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত চালকের বদলে অন্য একজন। একপর্যায়ে সাংবাদিকের উপস্থিতির খবর ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চালককে না পাওয়ায় ওই রাতে তাঁর পরিচয় যাচাই করা যায়নি। খিলগাঁওয়ে ডিএসসিসির ময়লার গাড়িচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত।
প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ও দীর্ঘদিনের প্রাণহানির চিত্র
প্রায় পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর গুলিস্তানে রাস্তা পার হওয়ার সময় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির চাপায় মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান। ওই ঘটনার পর তদন্তে দেখা যায়, গাড়িটি মূল চালক রানার নামে বরাদ্দ থাকলেও তা পর্যায়ক্রমে হাতবদল হয়ে এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর হাতে চলে গিয়েছিল। নাঈমের নির্মম মৃত্যুর পর সহপাঠী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যাপক আন্দোলন, সড়ক অবরোধ এবং নগর ভবন ঘেরাও কর্মসূচির মুখে পড়ে সিটি করপোরেশন। সে সময় ডিএসসিসি ঘটনার সঠিক বিচার, অপরাধীদের শাস্তি এবং চালক বরখাস্তের মতো পদক্ষেপ নেয়। তবে তদন্ত ও চালক বরখাস্তের পরও অন্যের হাতে গাড়ির চাবি তুলে দেওয়ার এই বিপজ্জনক প্রবণতা বন্ধ হয়নি।
পরবর্তী সময়েও একই ধরনের অনিয়ম ও হাতবদলের কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় একাধিক তাজা প্রাণ ঝরে গেছে। নাঈম হত্যাকাণ্ডের পর স্কুলছাত্র মাহিন আহমেদ ও লন্ড্রির দোকানের কর্মী ইকবাল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনাতেও পাওয়া যায় একই অনিয়ম। প্রাপ্ত তথ্য ও নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৮ সাল থেকে চলতি বছরের ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত ১৫টি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় ১৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালে বাসাবো এলাকায় ঘটাই এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান আরও দুজন। সব মিলিয়ে ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত সিটি করপোরেশনের বর্জ্যবাহী যানের ধাক্কায় অন্তত ১৬টি পৃথক দুর্ঘটনায় ১৮ জন মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে।
জ্বালানি তেল ভাগাভাগি ও দুর্নীতির অভিযোগ
গাড়ি হস্তান্তর ও ভুয়া চালক দিয়ে যান চালানোর পাশাপাশি দক্ষিণ সিটির পরিবহন খাতে যুক্ত হয়েছে বরাদ্দের জ্বালানি তেল পুরোটা না তুলে বাকি অংশের টাকা ভাগাভাগি করার এক বিশাল চক্র। দক্ষিণ সিটির ৭৫টি ওয়ার্ডের বাসাবাড়ি থেকে সংগৃহীত বর্জ্য প্রথমে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন বা এসটিএসে জড়ো করা হয়। সেখান থেকে বিশেষ গাড়িতে করে ময়লা নেওয়া হয় মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে। এসব বর্জ্য বহনের কাজে ৩, ৫, ১০, ১৫ ও ২০ টন ধারণক্ষমতার গাড়ি ব্যবহৃত হয়। চালক ও যানের ধরন অনুযায়ী মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে যাতায়াতের প্রতি ট্রিপে ৮ থেকে ১৪ লিটার পর্যন্ত ডিজেল বা তেল বরাদ্দ থাকে। লেনদেনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, কোনো ট্রিপে ১২ লিটার বরাদ্দ থাকলে চালক ৮ বা ৯ লিটার তেল নেন।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তেলের চেয়ে ট্রিপপ্রতি ৩ থেকে ৪ লিটার কম তেল পাম্প থেকে নেওয়া হয়। সায়েদাবাদ ফিলিং স্টেশনের নথিতে পূর্ণ বরাদ্দের তেল তোলা দেখানো হলেও চালক ও পাম্প কর্মীদের যোগসাজশে বাকি তেলের সমপরিমাণ নগদ টাকা ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়। মাসে গড়ে ৫ হাজার ৮৪২টি ট্রিপ অনুষ্ঠিত হলে, প্রতি ট্রিপে ৩ লিটার করে তেল কম তোলা হলে মাসে মোট ১৭ হাজার ৫২৬ লিটার তেল চুরি বা আত্মসাৎ হয়। সরকারি বাজারদর অনুযায়ী প্রতি মাসে এই তেলের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২২ lac টাকা। এই অবৈধ লেনদেনের টাকা গাড়ি চালক, শ্রমিক ইউনিয়নের কতিপয় নেতা এবং পরিবহন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পরিবহন শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে সমঝোতা করে অনেকে এমন সুযোগ নেন।
ইউনিয়ন নেতা ও প্রশাসকের বক্তব্য
এই অনিয়মের বিষয়ে ডিএসসিসির পরিবহন চালক শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি শাহ আলম তালুকদার প্রথমা আলোকে জানান, মূল চালকদের অনুপস্থিতিতে মাঝে মধ্যে পরিচিত বা সহকারীদের দিয়ে গাড়ি চালানোর ঘটনা ঘটে। তিনি স্বীকার করেন যে দীর্ঘদিনের চালক সংকটের কারণে অনেক সময় বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়। তবে তেলের টাকা আত্মসাতের বিষয়ে তিনি বলেন, গাড়ি চালকেরা চাকরি করেন ও নির্ধারিত বেতন পান; তেল চুরির সঙ্গে তাঁর বা সংগঠনের কোনো সম্পর্ক নেই। ডিএসসিসির নথিমতে, সংস্থায় মোট ৬০৮টি যানবাহন ও যন্ত্রপাতি থাকলেও স্থায়ী চালকের সংখ্যা মাত্র ২৫২ জন। চালক সংকট মেটাতে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে বলে কর্তৃপক্ষ জানায়।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রতিটি বিভাগে তদারকি বৃদ্ধি করেছেন। বহিরাগত দিয়ে গাড়ি চালানো বা জ্বালানি তেলের অনিয়মের নির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ পেলে কঠোর শাস্তিমূলক আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হলে কোনো কর্মকর্তা বা চালককে ছাড় দেওয়া হবে না। বিভিন্ন বিভাগে জনবলের প্রয়োজন জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
বিশেষজ্ঞের মতামত
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামছুল হক এ বিষয়ে বলেন, করপোরেশনের ময়লার গাড়ি দিয়ে বারবার দুর্ঘটনা ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানির মূল দায় কেবল অদক্ষ বা ভুয়া চালকের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। এর পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক দায় সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, সিটি করপোরেশন প্রশাসকদের বৈষম্যহীন ও কঠোর প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে এই শৃঙ্খলা ফেরানো জরুরি।


























