মহাবিপন্ন চালমুগরা গাছ: প্রাকৃতিক আবাসে টিকে আছে শতাধিক
- আপডেট সময় : ১১:৩৯:৪০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে
আমাদের বন ও পাহাড়ের সৌন্দর্যবর্ধক ও ঔষধি গুণসম্পন্ন গাছ চালমুগরা বা ডালমুগরি বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম এবং আইইউসিএন-এর প্রকাশিত রেড লিস্টে এটিকে মহাবিপন্ন উদ্ভিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গবেষকদের তথ্যমতে, গাছটির প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধির হার অত্যন্ত ধীর এবং দ্রুত বিলুপ্তির অন্যতম কারণ হলো এর বীজের অত্যধিক আহরণ। বীজের তেল কুষ্ঠ ও বিভিন্ন চর্মরোগের চিকিৎসায় কার্যকর হওয়ায় বন থেকে নির্বিচারে বীজ সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা এই প্রজাতির টিকে থাকাকে অসম্ভব করে তুলছে। বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রাকৃতিক উৎস থেকে গাছ সংগ্রহ করা হলেও, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আফ্রিকা এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দক্ষিণ আমেরিকার মতো অঞ্চলেও এ গাছ চাষাবাদ করা হয়।
সর্বশেষ ২০২২ সালের জরিপ অনুযায়ী, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি এবং মৌলভীবাজারের মোট ১০টি স্থানে এই গাছের প্রাকৃতিক আবাস শনাক্ত করা গেছে। প্রতিটি স্থানে মাত্র ১ থেকে ৩টি পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদ জীবিত রয়েছে। উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাকৃতিক পরিবেশে বর্তমানে এই গাছের মোট সংখ্যা ১০০-এর কম। গড়পড়তা প্রতিটি স্থানে ৫টিরও কম উদ্ভিদ টিকে আছে, যা ‘অত্যন্ত বিপন্ন’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আন্তর্জাতিক সূচকের চেয়েও অনেক নিচে। ২০১৪ সালে ঢাকার মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে প্রথম এই গাছটি দেখার পর এর অস্তিত্বের গভীর সংকটের বিষয়টি সামনে আসে। গত এক দশকে বাংলাদেশ ও ভারতে এই প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। গড়পড়তা প্রতিটি স্থানে এই সংখ্যা ৫-এর নিচে; যা ‘অত্যন্ত বিপন্ন’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার নির্ধারিত সূচকের চেয়েও অনেক কম। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ-ভারতে গত ১০ বছরে এই প্রজাতির সংখ্যা ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
চালমুগরা (Hydnocarpus kurzii) হলো ১২ থেকে ১৫ মিটার উঁচু একটি চিরসবুজ মাঝারি বৃক্ষ। এর কাণ্ড সোজা ও গোলাকার এবং বাকল মসৃণ, পুরু ও সবুজাভ ধূসর বর্ণের। এর পুরু গাঢ় সবুজ পাতা ও হালকা হলুদ সুগন্ধি ফুল গ্রীষ্ম থেকে বর্ষা পর্যন্ত দেখা যায়। হেমন্তকালে এর গোলাকার বাদামি ফলগুলো পরিপক্ব হয়, যার ভেতরে বীজ থাকে। এটি মূলত আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের উদ্ভিদ, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৮০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত জন্মাতে পারে। দিনে ২৮ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং বছরে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতযুক্ত এলাকা এই গাছের বৃদ্ধির জন্য আদর্শ। পাতা পুরু, ভল্লাকার বা আয়ত ভল্লাকার, আগা সুচালো, কিনারা সমান, তবে পাতার দুই পাশ ঢেউখেলানো। হালকা হলুদ রঙের সুগন্ধি ফুলগুলো কখনো এককভাবে, আবার কখনো থোকায় থোকায় ফোটে। পূর্ণ সূর্যালোক এবং হালকা ছায়াযুক্ত স্থানও পছন্দ। প্রায় সব ধরনের মাটিতে জন্মাতে পারে; তবে সুনিষ্কাশিত বেলে-পলিযুক্ত সমতল ভূমি অথবা আর্দ্র কিন্তু সুনিষ্কাশিত পরিবেশেও ভালো বৃদ্ধি পায়।
ঔষধি গুণের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত এই বৃক্ষটি নানা রোগের মহৌষধ। চুলকানি বা ত্বকের প্রদাহে চালমুগরার তেল সরাসরি ব্যবহার করলে দ্রুত আরাম পাওয়া যায়। আমাশয় নিরাময়ে এর পাতা সেদ্ধ করা পানি গরম অবস্থায় পান করা কার্যকর। এছাড়া কুষ্ঠরোগ ও চর্মরোগের চিকিৎসায় বীজতেল এবং খুশকি তাড়াতে চুলে তেল মালিশের বিকল্প নেই। এমনকি ডায়াবেটিসের প্রাথমিক অবস্থায় প্রতিদিন সকাল-বিকেল ১ গ্রাম বীজগুঁড়া গরম পানির সঙ্গে সেবন করলে সুগার নিয়ন্ত্রণে থাকে। খোসপাঁচড়া ও সাধারণ ঘা সারিয়ে তুলতে এই তেল ও মৌচাকের মোমের মিশ্রণে মলম তৈরির রীতিও প্রচলিত। চীন ও আর্জেন্টিনায় এই তেল ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। শরীরের কোথাও চুলকানি বা চুলকানির কারণে শরীর লাল হয়ে ফুলে গেলে চালমুগরার তেল চুলকানির স্থানে ভালোভাবে লাগিয়ে দিলে দ্রুত ভালো ফল পাওয়া যাবে। চর্মরোগে চালমুগরার পাতা বেটে নিয়ে তেলের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে চর্মরোগ ভালো হয়ে যায়।
স্থানীয় পর্যায়ে এই গাছ বান্দরবানের পলি ও রেমাক্রি প্রাংসা; চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, হাজারীখিল, বারোইয়াধলা ও ধোপাছড়ি; কক্সবাজারের ভোমারিঘোনা; খাগড়াছড়ির আলুটিলা; রাঙামাটির রামপাহাড়, দামাইছড়ি, ফারুয়া, কাসালং-মাসালং ও পাবলাখালী; এবং মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া ও শ্রীমঙ্গলে দেখা পাওয়া যায়। যদিও সম্প্রতি কিছু এলাকায় নতুন করে গাছটি রোপণ করা হচ্ছে, তবু প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে এর বিলুপ্তি ঠেকাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। পরের বছর খাগড়াছড়ির আলুটিলা ডাউনের বটগাছ দেখতে গিয়ে প্রাকৃতিক আবাসে আবার গাছটি দেখার সুযোগ হয়। মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক।


























