মেহেরপুরে ১০ কোটির পানি শোধনাগার অচল, ভোগান্তিতে হাজারো পৌরবাসী
- আপডেট সময় : ০১:১৩:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে
মেহেরপুর পৌরসভার বাসিন্দারা দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র সুপেয় পানির সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। শহরের পানি সরবরাহ ব্যবস্থার বেহাল দশা ও আধুনিক শোধনাগারের অভাবে অর্ধলক্ষাধিক মানুষ মানবেতর পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। অথচ প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি নতুন পানি শোধনাগার চার বছর আগে কাজ শেষ হওয়ার পরও এখনো অচল অবস্থায় পড়ে আছে। আমরা এই পানি দিয়া গরু গোসল করাই, কাপড় পরিষ্কার করি। এই যে দেখছেন পানি ধরে রাখছি, এই পানি কি খাওয়া যায়?’।
পৌরসভার নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, মেহেরপুর শহরে প্রতিদিন ১ কোটি ২০ লাখ লিটার পানির চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে মাত্র ৫০ লাখ লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। অর্থাৎ, প্রতিদিন চাহিদার তুলনায় প্রায় ৭০ লাখ লিটার পানির ঘাটতি থেকে যাচ্ছে, যা শহরের বাসিন্দাদের পানির সংকটকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে পুরোনো শোধনাগারটির কার্যক্ষমতা কমে পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। তিনি বলেন, এখানে বদলি হয়ে আসার পর সুপেয় পানির সংকটকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখেছেন। পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, শহরের সুপেয় পানির গ্রাহক ৪ হাজার ৩৭০ জন।
নতুন এই শোধনাগারটি ২০১৫ সালে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর নির্মাণকাজ শুরু করেছিল। ২০২২ সালের এপ্রিলে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় এবং পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষে ২০২৪ সালের নভেম্বরে এটি পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই পৌর কর্তৃপক্ষ দক্ষ কারিগরি জনবল ও অর্থ সংকটের কারণ দেখিয়ে তা চালু করতে গড়িমসি করছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মেহেরপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন দাবি করেন, শোধনাগারটি পুরোপুরি সচল অবস্থায়ই পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাদের মতে, পৌরসভা চাইলে যেকোনো সময় এটি চালু করতে পারে। কিন্তু পৌর প্রকৌশলী হারুন উর রশিদ জানিয়েছেন ভিন্ন কথা। তাঁর ভাষ্যমতে, প্ল্যান্ট অপারেটর, ইলেকট্রিশিয়ান ও যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য প্রশিক্ষিত কারিগরি জনবল না থাকায় শোধনাগারটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
পৌরসভার প্রধান সহকারী এস এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, নতুন শোধনাগার চালু করলেই যে সমস্যার সমাধান হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ, শুধু শোধন নয়, পানি গ্রাহকের বাড়িতে পৌঁছানোর পাইপলাইনও ব্যবহারের অযোগ্য। শহরের মোট ১৫০ কিলোমিটার পাইপলাইনের প্রায় ৫৫ শতাংশে আয়রন জমে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। বড় বাজার, হালদারপাড়া ও মুখার্জিপাড়ার মতো এলাকায় পানি সরবরাহ কার্যত বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু পানির উৎপাদন নয়, সরবরাহব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে।
শহরের বাসিন্দারা পৌরসভার সরবরাহ করা পানির মান নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
স্টেডিয়াম পাড়ার বাসিন্দা সালেহা খাতুন জানান, সরবরাহকৃত পানি এতটাই নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত যে তা খাওয়ার অনুপযোগী। স্থানীয় আরেক বাসিন্দা ফয়সাল হোসেনের মতে, পানির সঙ্গে ময়লা ও কেঁচো আসায় বাধ্য হয়েই তাঁকে বাইরে থেকে বোতলজাত পানি কিনতে হচ্ছে। ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সুফিয়া বেগম ও প্রিয়া খাতুনের অভিযোগ, প্রায় সাত বছর ধরে পানিতে ময়লা ও শেওলা আসায় তাঁরা এটি কেবল ধোয়া-মোছার কাজে ব্যবহার করেন।
বস্ত্র ব্যবসায়ী মানিক হোসেন জানান, পানির দুর্গন্ধ ও ময়লার কারণে অতিষ্ঠ হয়ে অনেক গ্রাহক নিজ উদ্যোগে সাব-মারসিবল পাম্প বসিয়েছেন। এদিকে ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রাকিব আহমেদের মতে, এই সংকট দ্রুত নিরসন না করলে পৌরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করবে। দুটি প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের এমন পার্থক্যের মধ্যেই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে পৌরবাসীর নিরাপদ পানির প্রাপ্তি।
পৌর কর্তৃপক্ষ পুরোনো শোধনাগার সংস্কার ও নতুন পাইপলাইন বসানোর প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করলেও, এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নিয়ে তারা কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা সময়সীমা জানাতে পারেনি। সরকারি বরাদ্দ ছাড়া এত বড় বাজেটের কাজ সম্পন্ন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব বলে দাবি করেছেন কর্মকর্তারা। একই সমস্যায় পড়েছেন শহরের মল্লিকপাড়ায় পরিবারের সঙ্গে ভাড়া বাসায় থাকা সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা ফয়সাল হোসেন।


























