রিয়াদের মিসাইল আতঙ্কে নির্ঘুম প্রবাসী বাংলাদেশিরা
- আপডেট সময় : ০২:০২:৪৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ৪৬ বার পড়া হয়েছে
সৌদি আরবের রিয়াদে হুতি বিদ্রোহীদের একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় সেখানে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা গভীর সংকটে পড়েছেন। প্রতিনিয়ত মৃত্যুভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন তারা। মোবাইল ফোনে বারবার ভেসে আসা সতর্কবার্তা এবং হঠাৎ হামলার আশঙ্কা তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত করে তুলেছে। জীবিকার প্রয়োজনে ঝুঁকি নিয়েই কর্মক্ষেত্রে ছুটছেন অনেকে, কিন্তু দিন শেষে স্বজনদের উৎকণ্ঠা আর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়ছে না। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় তাদের মতো অনেক প্রবাসীই কাটাচ্ছেন নির্ঘুম রাত। প্রায় প্রতিদিনই ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতি বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে রিয়াদসহ সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায়।
গত ১০ই অক্টোবর রাতে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩ লক্ষ্য করে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ভয়াবহ এই হামলায় মোট ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুইজন বাংলাদেশি রয়েছেন, যারা হলেন বগুড়ার মো. শাহেদ আহম্মদ ও কুমিল্লার মো. নাসরুল্লাহ বদরপুরী। তাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এছাড়াও এই হামলায় ২৪ জন প্রবাসী বাংলাদেশি আহত হয়েছেন।
আহতদের মধ্যে ১১ জন কর্মী এবং ১৩ জন ওমরাহ যাত্রী রয়েছেন। বর্তমানে তাদের রিয়াদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। কিং আব্দুল্লাহ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন হাফেজ হাসান (ঢাকা), কাজী নুরুল্লাহ (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) এবং মো. ওমর ফারুক (সৌদিপ্রবাসী)। ন্যাশনাল গার্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন নওগাঁর সাফকাত রহমান ও কুমিল্লার মো. দাউদুল ইসলাম, যার মধ্যে সাফকাত রহমান অচেতন অবস্থায় আছেন। রিয়াদ মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন মো. সাইমুল ইসলাম সৌরভ ও আবুল মনসুর মো. রিয়াজ উদ্দীন। এছাড়াও প্রিন্স সুলতান মিলিটারি হাসপাতালে মো. আব্দুল্লাহ, সুলাইমান আলহাবিব হাসপাতালের তাখাসসুসি শাখায় আরমান হোসেনসহ তিন বাংলাদেশি, কিংডম হাসপাতালে মো. রফিক মিয়া এবং কিং খালেদ মেডিকেল সিটিতে ইসমাইল হোসাইন, মো. মিসবাহ উদ্দিন হীরক ও মো. রায়হানুল ইসলাম চিকিৎসাধীন আছেন। প্রিন্স মোহাম্মদ বিন আব্দুল আজিজ হাসপাতালে সালমা আক্তার, মো. শাহাদাত হোসেন, মোশাহিদ আহমেদ সৈকত, জাহিদ আহমেদ এবং সোহবে সাদেক মো. শাহজাহান সরকার ভর্তি আছেন। এছাড়া এজতাহ সনদ হাসপাতালে মো. আসাদুল ইসলাম ও মো. জামাল, সুলাইমান ফকিহ হাসপাতালে নাজমা আক্তার এবং সুলাইমান আলহাবিব হাসপাতালের আলসাহাফা শাখায় উমায়ের ও আব্দুল্লাহ কামিল চিকিৎসা নিচ্ছেন।
রিয়াদে কর্মরত প্রবাসী নাজমুল ইসলাম জানান, পরিবার ও নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে তারা সারাক্ষণ তটস্থ থাকেন। দিনের মধ্যে আট-দশবার সতর্কবার্তার কারণে চরম আতঙ্ক কাজ করে। একইভাবে আরিফুল ইসলাম ও আনোয়ার হোসেনের মতো প্রবাসীরা জানান, কাজের প্রয়োজনে বের হতে হলেও সব সময় এক ধরনের ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নোয়াখালীর এক প্রবাসী জানান, এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা যারা না দেখেছেন তাদের বলে বোঝানো সম্ভব নয়, বিশেষ করে দেশে থাকা স্বজনরাও তাদের নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন। রিয়াদে থাকা প্রবাসী নাজমুল ইসলাম বলেন, আমরা থাকি মিসাইল আতঙ্কে আর পরিবারের লোকজন থাকেন আমাদের মৃত্যুর আতঙ্কে। রিয়াদের বাসিন্দা আরেক প্রবাসী আনোয়ার হোসেন বলেন, যেভাবে দিন যাচ্ছে, তাতে কতোদিন এমন পরিস্থিতি চলবে, তা ভেবেই চিন্তা হচ্ছে। রিয়াদ বিমানবন্দরের অদূরে অবস্থানকারী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নোয়াখালীর এক প্রবাসী বলেন, হুতিদের হামলা নিয়ে আমরা যে কী অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, যারা এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়নি তাদের বলে বোঝাতে পারবো না। কখন মিসাইল এসে পড়ে- এই আতঙ্ক নিয়ে যাচ্ছেন কর্মক্ষেত্রে। এরপর থেকেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ভৌগোলিক পরিস্থিতির কারণে অনেক প্রবাসীর দেশে ফেরা এবং ছুটিতে থাকা প্রবাসীদের সৌদি আরবে ফিরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হওয়ার ফলে অনেকেই নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। ইকামার খরচ মেটানোর পাশাপাশি এই অস্থিরতার মধ্যে টিকে থাকা যেন এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রবাসীদের জন্য।


























