জেএমসির ফান্ডরেইজিং ডিনারে এক রাতেই সংগৃহীত ১০ লাখ ডলার
- আপডেট সময় : ০৭:০০:৫০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে
নিউইয়র্কের প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঐক্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অসামান্য দানশীলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের (জেএমসি) আয়োজিত বিশেষ তহবিল সংগ্রহ অনুষ্ঠানে। কুইন্সের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বহুল প্রতীক্ষিত সম্প্রসারণ প্রকল্প এগিয়ে নিতে কমিউনিটির মানুষ এক রাতেই প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলারের অনুদান ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের মুসলিম কমিউনিটির সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি আধুনিক, সমৃদ্ধ ও যুগোপযোগী ইসলামিক সেন্টার গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন আয়োজকেরা। এ ধরনের উদ্যোগের সুফল বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মও ভোগ করতে পারে। আয়োজকেরা বিশেষভাবে নতুন প্রজন্মকে ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। অতীতের মতো এবারও প্রবাসীদের আন্তরিক অংশগ্রহণে চলমান প্রকল্প সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। দীর্ঘদিন ধরে মুসল্লিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশেষত জুমার নামাজ, রমজান ও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে স্থানসংকুলানের সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে জেএমসি কর্তৃপক্ষকে। বিশেষ করে লিফটের মাধ্যমে বিভিন্ন তলায় যাতায়াতের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে, যাতে প্রবীণ মুসল্লি এবং চলাচলে অসুবিধার সম্মুখীন ব্যক্তিরা সহজে ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন। গত ১২ অক্টোবর আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জেএমসি কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের অগ্রগতি ও অর্থসংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে জানায়, নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে আরও প্রায় ২০ লাখ ডলারের প্রয়োজন রয়েছে। শনিবারের অনুষ্ঠানে কমিউনিটির সদস্যদের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। নিউইয়র্কের বাংলাদেশি ও বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় মুসলিম কমিউনিটির ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের নাম। শুরুতে সীমিত পরিসরে নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা থাকলেও প্রবাসী মুসলমানদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ধাপে ধাপে এর পরিধি বৃদ্ধি পায়। প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও জুমার জামাতের পাশাপাশি কোরআন শিক্ষা, হিফজ কার্যক্রম, ধর্মীয় আলোচনা এবং বিভিন্ন বয়সের মানুষের জন্য শিক্ষামূলক আয়োজন পরিচালিত হয়। তাঁদের প্রত্যাশা, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন সম্প্রসারিত ভবনটি আগামী প্রজন্মের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক বন্ধন এবং পারস্পরিক সহযোগিতার একটি স্থায়ী কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
গত ২৪ অক্টোবর শনিবার সন্ধ্যায় নিউইয়র্কের ইস্ট এলমহার্স্টে অবস্থিত লাগোয়ার্ডিয়া এয়ারপোর্ট ম্যারিয়ট হোটেলে এই বিশেষ ফান্ডরেইজিং ডিনার অনুষ্ঠিত হয়। জমকালো এই আয়োজনে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও ধর্মীয় বক্তা শেখ উসমান বিন ফারুক। এছাড়া অতিথি বক্তা হিসেবে ইসলামি গবেষক শেখ ড. জাকির আহমেদ, জেএমসির পরিচালক ইমাম শামসি আলী এবং প্রধান ইমাম মাওলানা আবু জাফর বেগ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনায় ছিলেন জেএমসির সাধারণ সম্পাদক ও কমিউনিটি নেতা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম দেলোয়ার। সভায় বক্তব্য রাখেন প্রতিষ্ঠানটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ডা. মোহাম্মদ মাহমুদুর রহমান তুহিন, সভাপতি ডা. নাজমুল এইচ খান এবং সহসভাপতি ও ফান্ডরেইজিং কমিটির চেয়ারম্যান আফতাব মান। বক্তারা বলেন, ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী মসজিদ নির্মাণ ও দ্বীনি শিক্ষার প্রসারে আর্থিক সহযোগিতা সদকায়ে জারিয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। উপস্থিত দাতাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জেএমসি কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, কমিউনিটির সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ যাত্রার মূল শক্তি। বক্তারা মসজিদ নির্মাণ, ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার এবং সমাজকল্যাণমূলক কাজে দানের গুরুত্ব তুলে ধরেন। জেএমসির সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় ভবনের ব্যবহারিক সুবিধা ও অবকাঠামোগত আধুনিকায়নকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে এই সম্প্রসারণ কার্যক্রম শুরু হয়। বিদ্যমান দ্বিতল ভবনটিকে চারতলায় উন্নীত করার মাধ্যমে প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী, নতুন করে তৃতীয় ও চতুর্থ তলা যুক্ত হলে ভবনের সঙ্গে আরও প্রায় ৫ হাজার ৬৫০ বর্গফুট জায়গা যুক্ত হবে। এতে পুরো ভবনের মোট আয়তন দাঁড়াবে প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার বর্গফুট। এই পরিবর্তনের ফলে দ্বিতীয় তলায় অতিরিক্ত প্রায় ১৮০ জন মুসল্লির একসঙ্গে নামাজ আদায়ের পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি হবে। পুরো সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৪০ লাখ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন তলা সংযোজনের পাশাপাশি বিদ্যমান ভবনের বিভিন্ন অংশের সমন্বয়, অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং চলাচলের সুবিধা বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে কাজ শুরু হলেও নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং নির্মাণব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন দেখা দেয়।
উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সালে যাত্রা শুরু করা জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অর্ধশতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে যাচ্ছে। বর্তমানে কুইন্সের জ্যামাইকার ৮৫-৩৭, জেএমসি ওয়েতে (১৬৮ স্ট্রিট) অবস্থিত এই কেন্দ্রটি স্থানীয় মুসলিম কমিউনিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক সেবাকেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত। ১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে আল-মামুর মসজিদ ভবনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম চালুর পর থেকে এটি ধারাবাহিকভাবে বিস্তৃত হয়েছে। ২০০১ সালে এখানে হিফজ শিক্ষার কার্যক্রম শুরু হয়, যা পরবর্তীতে জামিয়া কোরআনিয়া একাডেমি নামে পরিচিতি পায়। এর দুই বছর পর ২০০৩ সালে আল-মামুর স্কুল ও ইকরা লাইব্রেরির কার্যক্রম শুরু হয়। এক রাতের এই অভাবনীয় সাড়া আবারও প্রমাণ করল যে, একটি অভিন্ন লক্ষ্য সামনে থাকলে প্রবাসী কমিউনিটির সম্মিলিত উদ্যোগ কতটা শক্তিশালী ও সফল হয়ে উঠতে পারে। প্রবাসে বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোর ও তরুণদের জন্য নিরাপদ, শিক্ষামূলক ও ধর্মীয় পরিবেশ গড়ে তুলতে জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারের সম্প্রসারণকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হয়। নব্বইয়ের দশকে বর্তমান স্থানে নতুন মসজিদ ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।


























