ঢাকা ০৩:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসে ছেঁউড়িয়ায় সাধু-ভক্তদের ঢল

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১০:০৬:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ৪৩ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় ফকির লালন শাহের তিরোধান দিবস উপলক্ষে শুরু হয়েছে তিন দিনের বর্ণিল আয়োজন। শনিবার বিকেল থেকে আখড়াবাড়িতে সাধু, ফকির ও ভক্তদের ব্যাপক সমাগম ঘটেছে। প্রিয় সাঁইজিকে স্মরণ করতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের পদচারণায় এলাকা এখন মুখর। কারো হাতে একতারা, কারো হাতে ডুগি—সব মিলিয়ে একতারার টুংটাং শব্দের সাথে লালনের গানে মেতেছেন নানা বয়সী ভক্তরা।

আখড়াবাড়ির সামনে জাতীয় পতাকা হাতে ঘুরছিলেন ৭১ বছর বয়সী আবু বক্কর। ভেড়ামারার ফকিরাবাদ গ্রামের বাসিন্দা আবু বক্কর প্রায় ৫০ বছর ধরে নিয়ম করে এই ধামে আসছেন। তাঁর গুরু ভেড়ামারার গোলাপনগরের সোলেমান শাহ, যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। গুরুর পথ ধরে পাঁচ দশক ধরে এখানে আসা আবু বক্কর বলেন, ছেঁউড়িয়ার এই আঙিনায় না এলে তাঁর মন টেকে না। এটি কেবল তীর্থস্থান নয়, বরং আত্মিক শান্তির এক ঠিকানা।

আখড়াবাড়ির ভেতরে চলছে সাধু-ফকিরদের গুরুকার্য। নিজস্ব রীতি অনুযায়ী রাখালসেবা, অধিবাস ও বাল্যসেবার মতো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করছেন তারা। রোববার দুপুরের পুনঃ সেবার মাধ্যমে এই সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। সাধকদের কাছে এই আয়োজন কেবল উৎসব নয়, বরং লালনের মানবতাবাদী দর্শন চর্চা ও আত্মশুদ্ধির এক বিশেষ মুহূর্ত।

কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে প্রশাসনের আয়োজনে আয়োজিত আলোচনা সভার মূল মঞ্চে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, লালন ফকিরের জীবনদর্শন শুধু দেশে নয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে। বিশেষ অতিথি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জায়েদ উর রহমান বর্তমান অশান্ত বিশ্বে লালনের অসাম্প্রদায়িক দর্শনকে জরুরি বলে অভিহিত করেন। তিনি এই দর্শনের আলোকে একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসান। স্বাগত বক্তব্য দেন লালন সাধক ফকির হৃদয় শাহ ও ফকিরানী আসমা খানম। আসমা খানম বলেন, মানুষের মধ্যেই সব সত্য নিহিত, তাই মানুষকে ভালোবাসা একান্ত প্রয়োজন। অনুষ্ঠানে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন, পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম এবং প্রাবন্ধিক অধ্যাপক রশিদুন নবীও বক্তব্য রাখেন। আলোচনায় দেশ-বিদেশে লালনের মরমি চিন্তা ও গানের প্রসার ঘটানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।

আলোচনা শেষে প্রবীণ সাধু-ফকিররা উদ্বোধনী গান ‘তোমার মতো দয়াল বন্ধু আর পাবো না’ পরিবেশন করেন। এরপর রাতভর চলে গানের আসর। ভক্তদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’, ‘জাত গেল জাত গেল বলে, এ কী আজব কারখানা’ ও ‘সময় গেলে সাধন হবে না’র মতো জনপ্রিয় সব গান। শনিবার সন্ধ্যা ছয়টায় আয়োজিত আলোচনা সভায় খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আবদুল্লাহ হারুন প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন। এরপর গভীর রাত পর্যন্ত চলে শিল্পীদের গানের পরিবেশনা।

আখড়াবাড়ির পাশাপাশি কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে বসেছে জমজমাট মেলা। সেখানে অস্থায়ী দোকানে পসরা সাজিয়েছেন ব্যবসায়ীরা, যেখানে দর্শনার্থীরা ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করছেন। উল্লেখ্য, ১৮৯০ সালের ১ কার্তিক কুমারখালীর চাপড়া ইউনিয়নের ছেঁউড়িয়া গ্রামে ফকির লালন সাঁই দেহত্যাগ করেন। তাঁর সেই তিরোধান দিবসকে ঘিরে প্রতিবছরই এমন মিলনমেলা গড়ে ওঠে। তরুণ প্রজন্মের কাছে লালনের অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী দর্শন পৌঁছে দেওয়াই এই আয়োজনের অন্যতম মূল লক্ষ্য।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবসে ছেঁউড়িয়ায় সাধু-ভক্তদের ঢল

আপডেট সময় : ১০:০৬:৩৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় ফকির লালন শাহের তিরোধান দিবস উপলক্ষে শুরু হয়েছে তিন দিনের বর্ণিল আয়োজন। শনিবার বিকেল থেকে আখড়াবাড়িতে সাধু, ফকির ও ভক্তদের ব্যাপক সমাগম ঘটেছে। প্রিয় সাঁইজিকে স্মরণ করতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের পদচারণায় এলাকা এখন মুখর। কারো হাতে একতারা, কারো হাতে ডুগি—সব মিলিয়ে একতারার টুংটাং শব্দের সাথে লালনের গানে মেতেছেন নানা বয়সী ভক্তরা।

আখড়াবাড়ির সামনে জাতীয় পতাকা হাতে ঘুরছিলেন ৭১ বছর বয়সী আবু বক্কর। ভেড়ামারার ফকিরাবাদ গ্রামের বাসিন্দা আবু বক্কর প্রায় ৫০ বছর ধরে নিয়ম করে এই ধামে আসছেন। তাঁর গুরু ভেড়ামারার গোলাপনগরের সোলেমান শাহ, যিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। গুরুর পথ ধরে পাঁচ দশক ধরে এখানে আসা আবু বক্কর বলেন, ছেঁউড়িয়ার এই আঙিনায় না এলে তাঁর মন টেকে না। এটি কেবল তীর্থস্থান নয়, বরং আত্মিক শান্তির এক ঠিকানা।

আখড়াবাড়ির ভেতরে চলছে সাধু-ফকিরদের গুরুকার্য। নিজস্ব রীতি অনুযায়ী রাখালসেবা, অধিবাস ও বাল্যসেবার মতো ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করছেন তারা। রোববার দুপুরের পুনঃ সেবার মাধ্যমে এই সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। সাধকদের কাছে এই আয়োজন কেবল উৎসব নয়, বরং লালনের মানবতাবাদী দর্শন চর্চা ও আত্মশুদ্ধির এক বিশেষ মুহূর্ত।

কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে প্রশাসনের আয়োজনে আয়োজিত আলোচনা সভার মূল মঞ্চে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, লালন ফকিরের জীবনদর্শন শুধু দেশে নয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে। বিশেষ অতিথি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জায়েদ উর রহমান বর্তমান অশান্ত বিশ্বে লালনের অসাম্প্রদায়িক দর্শনকে জরুরি বলে অভিহিত করেন। তিনি এই দর্শনের আলোকে একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসান। স্বাগত বক্তব্য দেন লালন সাধক ফকির হৃদয় শাহ ও ফকিরানী আসমা খানম। আসমা খানম বলেন, মানুষের মধ্যেই সব সত্য নিহিত, তাই মানুষকে ভালোবাসা একান্ত প্রয়োজন। অনুষ্ঠানে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন, পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম এবং প্রাবন্ধিক অধ্যাপক রশিদুন নবীও বক্তব্য রাখেন। আলোচনায় দেশ-বিদেশে লালনের মরমি চিন্তা ও গানের প্রসার ঘটানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।

আলোচনা শেষে প্রবীণ সাধু-ফকিররা উদ্বোধনী গান ‘তোমার মতো দয়াল বন্ধু আর পাবো না’ পরিবেশন করেন। এরপর রাতভর চলে গানের আসর। ভক্তদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’, ‘জাত গেল জাত গেল বলে, এ কী আজব কারখানা’ ও ‘সময় গেলে সাধন হবে না’র মতো জনপ্রিয় সব গান। শনিবার সন্ধ্যা ছয়টায় আয়োজিত আলোচনা সভায় খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আবদুল্লাহ হারুন প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেন। এরপর গভীর রাত পর্যন্ত চলে শিল্পীদের গানের পরিবেশনা।

আখড়াবাড়ির পাশাপাশি কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে বসেছে জমজমাট মেলা। সেখানে অস্থায়ী দোকানে পসরা সাজিয়েছেন ব্যবসায়ীরা, যেখানে দর্শনার্থীরা ঘুরে ঘুরে কেনাকাটা করছেন। উল্লেখ্য, ১৮৯০ সালের ১ কার্তিক কুমারখালীর চাপড়া ইউনিয়নের ছেঁউড়িয়া গ্রামে ফকির লালন সাঁই দেহত্যাগ করেন। তাঁর সেই তিরোধান দিবসকে ঘিরে প্রতিবছরই এমন মিলনমেলা গড়ে ওঠে। তরুণ প্রজন্মের কাছে লালনের অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী দর্শন পৌঁছে দেওয়াই এই আয়োজনের অন্যতম মূল লক্ষ্য।