শততম মঞ্চায়নের পথে থিয়েটার আর্ট ইউনিটের ‘আমিনা সুন্দরী’
- আপডেট সময় : ০১:৩১:৩৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ৩৬ বার পড়া হয়েছে
চট্টগ্রামের প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো লোককাহিনি ‘নছর মালুম ও ভেলুয়া সুন্দরী’ অবলম্বনে এস এম সোলায়মান রচিত নাটক ‘আমিনা সুন্দরী’ এবার অনন্য মাইলফলক অর্জনের অপেক্ষায়। থিয়েটার আর্ট ইউনিটের ৩৫তম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে আয়োজিত এই বিশেষ প্রদর্শনীগুলো আজ বৃহস্পতিবার ও আগামীকাল শুক্রবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে অনুষ্ঠিত হবে। নাটকটির যথাক্রমে ৯৯তম ও শততম প্রদর্শনী হবে এই দুই দিনে, যা প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটায় শুরু হবে। ২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়ার পর থেকে দীর্ঘ মঞ্চযাত্রায় এটি ঢাকার অন্যতম আলোচিত প্রযোজনা হিসেবে নিজের স্থান করে নিয়েছে। স্বামীর চোখে নিজের ভালোবাসার স্বীকৃতি খোঁজেন তিনি। ৩০০ বছরের পুরোনো গল্পের সঙ্গে আজকের জীবনের দূরত্ব যেন মুহূর্তেই ঘুচে যায়।
নাটকটির কাহিনি আবর্তিত হয়েছে আমিনার জীবন ও তাঁর দীর্ঘ প্রতীক্ষাকে কেন্দ্র করে। স্বামী নছর ছিলেন একজন জাহাজ নাবিক, যিনি বাণিজ্যের প্রয়োজনে মিয়ানমারে গিয়ে এখিন নামের এক তরুণীকে বিয়ে করেন। এদিকে দেশে আমিনা তাঁর জন্য দীর্ঘ ১০ বছর অপেক্ষায় থাকেন। অথচ নছর ফিরে এসে আমিনার প্রতি ভালোবাসা দেখানোর বদলে তাঁর সতীত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একদিকে পারিবারিক ও সামাজিক চাপ, অন্যদিকে প্রতারিত নছরের নতুন করে ফিরে আসা—সব মিলিয়ে আমিনার জীবন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে। নির্দেশক রোকেয়া রফিক বেবীর মতে, ‘আমিনা সুন্দরী’ কোনো নির্দিষ্ট সময়ের গল্প নয়, বরং এটি সর্বকালে এবং পৃথিবীর সব প্রান্তের নারীর অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। আমিনা চরিত্রে অভিনয় করা শিল্পীদের ছোট ছোট সংলাপের মাধ্যমে নারীর বাঁচার আকুতি ও নিজের জীবনের ওপর মালিকানার লড়াই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। যাঁর জন্য ১০ বছর অপেক্ষা, তাঁকে ফিরে পেয়েও আমিনার অপেক্ষা ফুরোয় না। অথচ নছরের কাছে স্ত্রীর দীর্ঘ প্রতীক্ষা, ত্যাগ কিংবা বেঁচে থাকার সংগ্রামের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে তাঁর সতীত্বের প্রশ্ন। নিজে ভিনদেশে আরেকটি সংসার পেতেছেন যে পুরুষ, তিনিই ফিরে এসে প্রশ্ন তোলেন স্ত্রীর জীবন নিয়ে। ‘আমিনা সুন্দরী’ দেখতে গিয়ে এ জায়গাটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে। পরিবার ও সমাজের নানা চাপ এড়িয়ে নিজের ভালোবাসাকে রক্ষা করতে চান আমিনা। অন্যদিকে প্রতারণার কথা জানতে পেরে এখিনও নছরকে প্রত্যাখ্যান করেন।
নাটকটির নির্দেশক রোকেয়া রফিক বেবী জানিয়েছেন, লোককাহিনিকে মঞ্চে জীবন্ত করে তুলতে তিনি জ্যামিতিক মঞ্চসজ্জা ও সমুদ্রতীরবর্তী মানুষের জীবনবোধ থেকে নেওয়া গাঢ় রঙের পোশাক ব্যবহার করেছেন। এছাড়া আলোর কারুকাজ এবং সাইক্লোরামার ব্যবহার দর্শকদের ভিন্ন এক আবহ উপহার দেয়। সংগীত এই নাটকের অন্যতম প্রাণশক্তি। এস এম সোলায়মানের লেখা গানের পাশাপাশি রামপ্রসাদ ও লালন ধারার সংগীত যোগ করা হয়েছে এই প্রযোজনায়। সংগীত পরিকল্পনা করেছেন সেলিম মাহবুব। নির্দেশক এই নাটকের হারানো সুর ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রয়াত জগলুল আলমের অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। এছাড়া মঞ্চ পরিকল্পনায় শাহীনুর রহমান, আলোক পরিকল্পনায় ফয়েজ জহির এবং কোরিওগ্রাফিতে অনিকেত পাল বাবু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
প্রযোজনাটির সফলতার পেছনে দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও জ্যেষ্ঠ সদস্যদের অবদান অনস্বীকার্য। এর আগে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে নাটকটির ৮০তম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এছাড়া দেশের বাইরে ভারতের ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামাতেও নাটকটির ৯টি প্রদর্শনী হয়েছে, যেখানে দর্শকরা এর সংগীত ও বিষয়বস্তুকে সাদরে গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে নাটকের আমিনা চরিত্রে অভিনয় করছেন পল্লবী মাতব্বর, ইন্দ্রাণী ঘটক ও সুকৃতি আজম শ্রেষ্ঠা। নছর চরিত্রে রয়েছেন মেহমুদ সিদ্দিকী লেনিন এবং ভোলা সওদাগর চরিত্রে কামরুজ্জামান মিল্লাত। এছাড়া তানিয়া চৌধুরী শিল্পী, রেজাউল আমিন সুজন, ফেরদৌস আমিন বিপ্লব, স্বাধীন শাহ ও সজল চৌধুরীর মতো শিল্পীরাও বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করছেন। দীর্ঘ সময়ের পথচলায় দলের জন্য এই শততম প্রদর্শনী এক আনন্দের উপলক্ষ হয়ে এসেছে। কিন্তু একসময় বন্দী হন ভোলা সওদাগরের ঘরে।

























