সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: কেন জানল না বাংলাদেশ?
- আপডেট সময় : ০৮:০৪:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ ৪০ বার পড়া হয়েছে
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বাংলাদেশের মিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে এখন প্রবল প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘ সময় বিচারপ্রক্রিয়া চলমান থাকার পরও কেন ঢাকা আগে থেকে এ বিষয়ে কোনো তথ্য পেল না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো বন্দিদের তালিকায় ওই দুই ব্যক্তির নাম ও তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের উল্লেখ থাকলেও, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কোনো উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়নি, সেই ব্যর্থতা এখন আলোচনার কেন্দ্রে। এরপরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ কেন কাজে লাগানো গেল না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালে বাংলাদেশিরা দোভাষী হিসেবে কাজ করেছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১৪ই অক্টোবর সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে সৌদি প্রেস এজেন্সি দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর প্রকাশ করে। নিহত দুই ব্যক্তি হলেন নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির এবং সুইটি আক্তার। এই খবর পাওয়ার পরদিন ১৫ই অক্টোবর জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কন্স্যুলেট বিস্তারিত জানতে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কূটনৈতিক পত্র পাঠায়। পরবর্তীতে ১৮ই অক্টোবর ঢাকায় সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়ার কাছে বিষয়টি উত্থাপন করা হয় এবং সোমবার জেদ্দায় সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন বাংলাদেশের কূটনীতিকরা। তবে এখন পর্যন্ত এর কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা মেলেনি। সৌদি কর্মকর্তারা এ প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি আগেও আলোচনায় এসেছিল। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই স্মারকলিপিতে বলা হয়, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের দূতাবাস কিংবা কন্স্যুলেটকে কিছু জানায়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০শে সেপ্টেম্বর জেদ্দাস্থ কন্স্যুলেটে বন্দিদের একটি তালিকা পাঠিয়েছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। সেই তালিকায় নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ এবং সুইটি আক্তারের বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগের উল্লেখ ছিল। তবে সেখানে তাদের সাজার ধরণ সম্পর্কে কোনো তথ্য ছিল না। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির স্বীকার করেছেন যে, এ বিষয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগে ঘাটতি ছিল এবং অভিযোগের ধরণ উল্লেখ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশের জন্য হতাশাজনক। তিনি জানান, ঘটনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে নতুন করে কূটনৈতিক পত্র পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে শিগগিরই বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানিয়েছে সূত্রটি।
২০২৩ সালের ১লা আগস্ট নজরুল ইসলাম এবং পরদিন সুইটি আক্তারকে গ্রেপ্তার করে সৌদি পুলিশ। নজরুলের পরিবারের দাবি, তার গ্রেপ্তারের বিষয়টি তারা জানলেও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরটি তারা গণমাধ্যম থেকেই জানতে পেরেছেন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বিদেশে কোনো নাগরিক গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত হলে তার মামলার আপিল, আইনি সহায়তা ও দোভাষীর ব্যবস্থা করার বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি কন্স্যুলার দায়িত্বের অংশ। কিন্তু এই দুই ক্ষেত্রে মিশন কেন অন্ধকারে ছিল, তা স্পষ্ট নয়। কন্স্যুলেটের ১৮ই অক্টোবরের এক গোপন স্মারকলিপি থেকে জানা যায়, পরিবারের পক্ষ থেকেও তাদের কাছে আইনি সহায়তা চেয়ে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা থাকলে আইনি সহায়তা, দোভাষীর ব্যবস্থা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের মতো বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া জরুরি।
সৌদি আরবের প্রচলিত বিচারব্যবস্থা অনুযায়ী, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের মিশনকে লিখিতভাবে জানানোর রীতি রয়েছে। এ ঘটনায় সৌদি পক্ষ দাবি করেছে, নিম্ন আদালতে সাজার পর আপিল আদালতের ১৩ বিচারকের প্যানেলে সেই দণ্ড বহাল রাখা হয়েছিল এবং আইনি প্রক্রিয়া মেনেই তা কার্যকর করা হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, বন্দি তালিকায় নাম থাকার পরও সাজার তথ্য গোপন রাখা বড় একটি ব্যর্থতা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় মিশন যদি শুরু থেকে তৎপর হতো, তবে পরিস্থিতির ভিন্নতা আসতে পারত।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো বন্দি হস্তান্তর চুক্তি না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত থাকলেও এ ধরনের আইনি সুরক্ষা কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ঈসা বিন ইউসুফ আল-দুহাইলানের সঙ্গে বৈঠকের পর দুই দেশের বিচার বিভাগের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছিল। সেই প্রক্রিয়া কতদূর এগিয়েছে বা নজরুল ও সুইটির ক্ষেত্রে এটি কোনো প্রভাব ফেলেছে কিনা, তা নিয়েও এখন নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সৌদি আরবের সঙ্গে বন্দি হস্তান্তর চুক্তি নেই বাংলাদেশের: স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সৌদি আরবের সঙ্গে বন্দি হস্তান্তর চুক্তি করেনি বাংলাদেশ। বিদেশে দণ্ডিত নাগরিকদের প্রত্যাবাসন ও আইনি সহযোগিতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভারতের সঙ্গে ২০১০ সালে এবং আমিরাতের সঙ্গে ২০১৪ সালে এ চুক্তি হয়। তবে সেই উদ্যোগের পর চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়েছে- এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।


























