ব্যালন ডি’অর জয়ের পাশাপাশি মাঠের বাইরেও সাম্রাজ্য গড়েছেন হ্যারি কেইন
- আপডেট সময় : ০৭:০০:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ ১৪ বার পড়া হয়েছে
ফুটবল মাঠের গোলমেশিন হ্যারি কেইন এখন ব্যক্তিগত অর্জনের শিখরে। আর মাঠের বাইরে টাকা বানানোর জন্য আছে মাথা। একসময় তাঁকে নিয়ে একটা রসিকতা চালু ছিল। টটেনহামে থাকতে এই অপবাদ কিছুতেই ঘোচাতে পারেননি।
২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ের মাধ্যমে তিনি দীর্ঘ ২৫ বছর পর প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই ব্যক্তিগত পুরস্কারটি নিজের করে নিয়েছেন। সর্বশেষ সংযোজন ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর। জিতেছেন বর্ষসেরা স্ট্রাইকারের পুরস্কারও।
কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামালের মতো তারকাদের পেছনে ফেলে ৩৩ বছর বয়সী কেইন এখন সেরার মুকুটে ভূষিত।
২০২৫-২৬ মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে মোট ৭৩টি গোল করে তিনি বায়ার্ন মিউনিখের সাফল্যেও রেখেছেন অবিস্মরণীয় অবদান। বাভারিয়ানদের হয়ে ঘরোয়া ট্রেবল জয় এবং টানা দ্বিতীয় বুন্দেসলিগা শিরোপা জেতানোয় তিনি মূল ভূমিকা পালন করেছেন। গোল করেন, গোল্ডেন বুট জেতেন, কিন্তু ট্রফি জেতেন না। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে সব প্রতিযোগিতায় করেছেন ৭৩ গোল। ইংল্যান্ডের হয়ে তিনবার প্রিমিয়ার লিগের গোল্ডেন বুট জেতা কেইন ব্যবসার প্রথম বড় সাফল্য পেয়েছেন আবাসন খাতে।
তবে মাঠের এই সাফল্যের সমান্তরালে মাঠের বাইরেও কেইন গড়ে তুলেছেন বিশাল এক বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য। ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে তাঁর পথচলা শুরু হয়েছিল মাত্র ২১ বছর বয়সে, যখন ২০১৪ সালের অক্টোবরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি ‘এইচকে২৮ লিমিটেড’ বা ‘দ্য হ্যারি কেইন কোম্পানি’ প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের সব ফুটবল, বিনোদন, দাতব্য কার্যক্রম এবং ব্যবসায়িক চুক্তিগুলো তিনি নিজেই এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালনা করেন, যা অন্য তারকারা সাধারণত বাইরের এজেন্সির ওপর ছেড়ে দেন। শেষ পর্যন্ত উত্তর লন্ডনের মায়া ছেড়ে চলে গেলেন জার্মানির মিউনিখে। তারপর যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে গেলেন। তবে শুধু পরিবারের মধ্যেই ব্যবসা সীমাবদ্ধ রাখেননি কেইন।
কেইনের ব্যবসায়িক দূরদর্শিতার আরেকটি বড় দৃষ্টান্ত হলো রিয়েল এস্টেট খাত। ‘এডওয়ার্ড জেমস ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড’ নামের একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক তিনি, যা মূলত তাঁর বাবা, মা এবং ভাই চার্লির সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত হয়। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে তাঁদের এই প্রতিষ্ঠানের আবাসন সম্পত্তির বাজারমূল্য দেড় কোটি পাউন্ড ছাড়িয়েছে। এছাড়া, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও টিকিট বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ‘সিট ইউনিক’-এও তিনি বিনিয়োগ করেছেন, যার বর্তমান বাজারমূল্য ৫০ কোটি পাউন্ডের বেশি। এই উদ্যোগে তিনি সাবেক চেলসি কিংবদন্তি জন টেরির সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদার হয়েছেন। কেইনের দলবদল থেকে শুরু করে বড় অঙ্কের চুক্তি, সবকিছু সামলান। ভাইয়ের উপার্জিত অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করলে আরও বাড়বে, সেটাও দেখেন চার্লি। হাত মিলিয়েছেন একসময়ের মাঠের প্রতিপক্ষ চেলসির কিংবদন্তি জন টেরির সঙ্গেও।
বাণিজ্যিক চুক্তির ক্ষেত্রেও কেইন অত্যন্ত কৌশলী। তিনি অ্যামাজন, ক্যাডবেরি, টপসসহ আন্তর্জাতিক সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এছাড়া বায়োঅ্যান্ডমি, স্ট্যাটস্পোর্টস এবং জার্মান ওটস ব্র্যান্ড থ্রিবিয়ার্সের সঙ্গেও তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব রয়েছে। স্কেচার্সের সঙ্গে তাঁর বুট চুক্তি ফুটবল বিশ্বে বেশ চমক সৃষ্টি করেছিল। এই আজীবনের চুক্তির মাধ্যমে তিনি বছরে প্রায় ৮০ লাখ পাউন্ড আয় করেন বলে জানা গেছে।
বাচ্চাদের মতো খেলার মাঠে যেমন গোলের পর গোল করছেন, তেমনি আর্থিক ব্যবস্থাপনায়ও তিনি সমান মনোযোগী। বায়ার্ন মিউনিখের কাছ থেকে সপ্তাহে প্রায় ৪ লাখ পাউন্ড বেতন পান তিনি, যা বছরে দাঁড়ায় ২ কোটি ৮ লাখ পাউন্ডের কাছাকাছি। এমনকি ৩৩ বছর বয়স হওয়া সত্ত্বেও জার্মান ক্লাবটি কেইনকে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে আগ্রহী। ডেইলি মেইল স্পোর্টের খবর অনুযায়ী, বায়ার্নের সঙ্গে তাঁর নতুন চুক্তির আলোচনা চলছে, যা সফল হলে তাঁর আয় আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুই জায়গাতেই সমান দক্ষ ইংল্যান্ড অধিনায়ক। বয়স ৩৩ হলেও জার্মান চ্যাম্পিয়নরা নিজেদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে চায় ইংল্যান্ড অধিনায়ককে।
ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নিজের আর্থিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার যে পরিকল্পনা কেইন করেছিলেন, তা এখন এক বিশাল প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে। মাঠের গোল আর মাঠের বাইরের মুনাফা—উভয় ক্ষেত্রেই তিনি যেন এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজা। ক্যারিয়ারের শেষবেলার দুশ্চিন্তা না করে বরং ক্যারিয়ারের একদম শুরুর দিকেই তিনি তাঁর সাম্রাজ্যের ভিত গড়ে নিয়েছিলেন। আজও সেই দূরদর্শিতার সুফলই তিনি ভোগ করছেন, যেখানে মাঠের গোল উদ্যাপন আর করপোরেট বোর্ডের ব্যবসায়িক হিসাব—সবই তাঁর নিয়ন্ত্রণে।
























